Home এক্সক্লুসিভ কেমন হলো এবারের একুশে বইমেলা

কেমন হলো এবারের একুশে বইমেলা

SHARE
boimela

আবীর হাসান
একুশে বইমেলার ইতিহাসে বোধকরি প্রথম ঘটলো। ফেব্রæয়ারির বইমেলা মার্চ এসে শেষ হলো। এটাই সময়ের দাবী। দুইদিনের অব্যাহত বৃষ্টি এবং ২৮ ফেব্রæয়ারি ঢাকায় উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের প্রেক্ষিতে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় একুশে বইমেলা তার স্বাভাবিক গতি হারিয়েছিল। পাঠকের অভ্যাসগত কারনেই প্রতি বছরই একুশে বইমেলার শেষ দুই তিন দিন বেচাবিক্রি বেশ জমে ওঠে। কারণ পাঠকদের অনেকে মাস জুড়ে হয়তো প্রিয় লেখকের বইয়ের খোঁজ করেন তারপর মেলার শেষ সময়ে এসে বই কেনায় ব্যস্ত হয়ে যান। কিন্তু এবার প্রকৃতির বৈরী আচরণের ফলে বইমেলার নির্ধারিত দিনের শেষ পর্যায়ে এসে পাঠক-প্রকাশক সকলেই এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে পড়ে যান। পাঠক ভেবেছিলেন মেলার শেষ পর্যায়ে বই কিনবেন। প্রকাশকরাও আশায় ছিলেন প্রতি বছরের মতো এবারও শেষ পর্বের বইমেলায় বেঁচাকেনা বাড়বে। কিন্তু প্রকৃতির বিরূপ আচরণ বইমেলার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যহত করে। উপরুন্তু ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তরের মেয়র নির্বাচনের কারণে বইমেলার শেষ দিন শহরে যান বাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বইমেলা আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে প্রকাশকরা দাবী তোলেন বইমেলার সময়সীমা বাড়ানোর। ২৮ ফেব্রæয়ারি ছিল বৃহস্পতিবার। পরের দুইদিন অর্থাৎ শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। সঙ্গত কারনেই ছুটির দিনে বইমেলা জমবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং বইমেলার পরিস্থিতি পর্যাবেক্ষণ করছিলেন। প্রকাশকদের দাবীর প্রেক্ষিতে আমাদের সংস্কৃতিবান্ধব প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং বইমেলার সময়সীমা দুই দিন বাড়ানোর নির্দেশ দেন। ২৮ ফেব্রæয়ারি সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই বইমেলার শব্দযন্ত্রে ঘোষনা আসেÑ বইমেলার সময় দুইদিন বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ ১ ও ২ মার্চ শুক্র এবং শনিবার বইমেলা সারাদিন খোলা থাকবে। বইমেলার সময়সীমা বৃদ্ধির এই ঘোষনায় প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। উল্লেখ্য, ফেব্রæয়ারি মাস জুড়েই মূলত একুশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এবারই প্রথম ফেব্রæয়ারির বইমেলা মার্চে গিয়ে থামল।
একথা সকলেই মানবেন প্রতি বছর একুশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় বলেই দেশে বইয়ের কদর এখনও জিইয়ে আছে। অনেকে মনে করেন প্রতি বছর একুশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় বলেই বই পড়ার ক্ষেত্রে পাঠকের আগ্রহ থাকে। মানুষের মাঝে বই কেনার অভ্যাস গড়ে ওঠে। আর তাই একুশে বইমেলা বছরে বছরে আকারে আয়তনে বড় হচ্ছে। আজকের সময়ে কোনো শিশুর কাছে যদি বইমেলার ইতিহাস বলতে গিয়ে বলা হয়, তুমি কি জানো আমাদের এই বইমেলা এক সময় বাংলা একাডেমির খোলা চত্বরে ঘাসের ওপর চট বিছিয়ে শুরু হয়েছিল? শিশুটির হয়তো বিশ্বাসই হবে না। সে হয়তো ভাববে এরা বলে কি? এত বড় বইমেলা ঘাসের ওপর চট বিছিয়ে শুরু হয়েছিল? অবিশ্বাস্য!
হ্যা আজকের বইমেলা দেখে পেছনের ঘটনা গুলোকে অবিশ্বাস্যই মনে হবে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের ছোট আকারের সেই বইমেলা আজ আকার আয়তনে এতটাই বড় হয়েছে যে শুধু দেশে নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিস্ময় ছড়াচ্ছে। আমাদের একুশে বইমেলাই পৃথিবীর একমাত্র একক ভাষা ভিত্তিক বইমেলা যা দীর্ঘ একমাস ধরে চলে। পাশাপাশি ক্রেতা-দর্শকের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও আমাদের একুশে বইমেলা পৃথিবীতে অনন্য মর্যাদা পাচ্ছে। প্রতিদিন একুশে বইমেলায় যে পরিমান দর্শক আসেন তা সত্যি বিস্ময়কর। এবার ২৭ ফেব্রæয়ারি মেলার ২৭তম দিনে বৃষ্টি আক্রান্ত বইমেলায়ও কয়েক হাজার মানুষ উপস্থিত ছিল। বৃষ্টি হতে পারে জানা সত্বেও তারা বইমেলায় এসেছিল প্রাণের টানে।

পাঠকের আগ্রহ বাংলা একাডেমির বই

প্রতি বছরের মতো এবারও মাসব্যাপি একুশে বইমেলার শুভ উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেলার স্টল ও প্যাভিলিয়নের অবকাঠামোগত বিন্যাস এবার সবার দৃষ্টি কেড়েছে। স্টল ও প্যাভিলিয়নের নকসা দেখে সকলেই মুগ্ধ। বিশিষ্ট স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝরের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল এবার বইমেলার নকসা প্রণয়ন করেছেন। ‘লেখক বলছি’ শিরোনামে একটি নতুন আয়োজন এবার বইমেলায় বেশ আলোচনায় ছিল। ধারনা করা হচ্ছে অনুষ্ঠানটি বইমেলায় নিয়মিত অনুষ্ঠানে পরিণত হবে। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চ বেশ নান্দনিক রূপ পেয়েছিল। বইমেলায় খোলামেলা পরিবেশ ক্রেতা-দর্শকের পছন্দ কেড়েছে। শেষ পর্যায়ে বৃষ্টির বাগড়া না থাকলে এবারের বইমেলাকে বইমেলার ইতিহাসের একটি শ্রেষ্ঠ আয়োজন বললে মোটেও অত্যুক্তি হতো না।
বইয়ের মেলায় বইয়ের বিক্রি কেমন হলো সেটাই গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন। তার আগে বলে রাখা ভালো এবার একুশে বইমেলায় ৫ হাজারেরও বেশী নতুন বই বেরিয়েছে। বিক্রির পরিমান ৮০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তার মানে বইয়ের প্রতি কি পাঠকের আগ্রহ বেড়েছে? এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। বইমেলায় প্রতিদিন যে হারে মানুষ এসেছে সেই হারে বই বিক্রি হয়নি। তবে প্রকাশকদের মন্তব্য, অন্যান্য বছরের তুলনায় বইয়ের বিক্রি ভালো। মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ বেড়েছে।
কর্তৃপক্ষ ঘোষনা দিয়েছেন আগামী বছর থেকে বইমেলার পরিসর আরও বাড়ানো হবে। অর্থাৎ আকার আয়তনে আরও বড় হবে বইমেলা। এটি অবশ্যই খুশির খবর। তবে প্রতি বছরই বইমেলা চলাকালে বৃষ্টি আক্রান্ত হচ্ছে। এবার ২৭ ফেব্রæয়ারি বৃষ্টি আক্রান্ত বইমেলায় ক্রেতা-দর্শক অনেক বিড়ম্বনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। বইমেলা আরও বড় করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের চিন্তা ভাবনা এখনই শুরু করা উচিৎ।