Home প্রতিবেদন কাকুর কিচেন এবং বিরিয়ানির গল্প!

কাকুর কিচেন এবং বিরিয়ানির গল্প!

SHARE

সৈয়দ ইকবাল: পরিবেশটাই অন্যরকম! প্রচলিত রেস্টুরেন্টগুলোর মতো ইন্টেরিয়র ডিজাইনে তেমন চাকচিক্য নেই। নেই বিলাসবহুল ফার্নিচারও। তাহলে এটির আলাদা বিশেষত্ব কী? নগরীর ফার্মগেটস্থ গ্রীনরোডে অবস্থিত ‘কাকুর কিচেন’ রেস্টুরেন্টটি সম্পর্কে যদি এমন মনত্মব্য ছুঁড়ে দেয়া হয়, তাহলে প্রথমেই যে উত্তরটি আসবে তা হলো- এই রেস্টুরেন্টে খেতে এলেই নদীমতৃক বাংলাদেশের কিছুটা আবহ পাওয়া যাবে। পাঠক চমকে উঠলেন তো? ভাবছেন, রেস্টুরেন্টের সাথে নদীর কিভাবে সম্পর্ক হয়! এই রহস্যের  জট খুলে যাবে খানিকবাদেই। ‘কাকুর কিচেন’-এ প্রবেশ করতেই সিঁড়ির দেয়ালজুড়ে গ্রাম্য বাড়ির বাঁশের দেয়ালের ডিজাইন যে কারোরই গ্রাম বাংলার কথা মনে করিয়ে দিবে। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় প্রবেশ করতেই কানে ভেসে আসবে নদী নিয়ে আলোচিত গান-কবিতার শব্দ। দোতলায় মোট চারটি কক্ষ দেশের নামকরা নদী পদ্মা, সুরমা, যমুনা, কর্ণফুলীর নামে নামকরণ করা হয়েছে। একটু এগিয়ে যেকোনো কক্ষে টেবিলে বসতে গেলেই চোখে পড়বে প্রতিটি টেবিলের উপর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের লেখা বই। আর প্রতিটি রুমে সারিবদ্ধভাবে থাকা ছোট ছোট গাছ মুহূর্তেই প্রশানিত্মর ছোঁয়া এনে দিবে।

‘কাকুর কিচেন’ এর এমন পরিবেশে ঢুকলে নিঃসন্দেহে মনে হতে পারে যেন নগরীর ব্যসত্মতম সড়ক ফার্মগেট থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও এসে পরেছেন। টেবিলে বসলেই মেনুকার্ড এর পাশে পেয়ে যাবেন বই। খাবার অর্ডার করে তা আসার সময়টাতে মোবাইল ফোনে চোখ না ডুবিয়ে সাহিত্যের রাজ্যে ঢুকে যেতে পারেন। বাঙালিয়ানা ভুলে যাওয়া আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে ‘কাকুর কিচেন’ কর্তৃপক্ষ  প্রাধান্য দিয়েছে সবুজ পরিবেশ আর বই পড়ার অভ্যেসকে।

‘কাকুর কিচেন এর প্রধান উদ্দেশ্য ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে সেবা নয়, বরং সেবার উদ্দেশ্যেই ব্যবসা- এমনটিই চিনত্মা-ভাবনা জানালেন রেস্টুরেন্টটির জেনারেল ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম (জামি)। তা যে শুধু কথাতেই সীমাবদ্ধ নয় সেটি বোঝা গেল রেস্টুরেন্ট-এর পরিবেশ দেখে। রেস্টুরেন্টটির প্রচারের উদ্দেশ্যে ভিন্নধর্মী কিছু লিফলেট করা হয়েছে। আমেরিকান ডলার এর আদলে ডিজাইন করা এই লিফলেটে রয়েছে বাংলাদেশের নদী বাঁচাও আন্দোলনের নানান চিত্র। এমনকি পুলিশ জনগণের বন্ধু এবং জরুরি প্রয়োজনে রক্তের জন্যও যোগাযোগের বিষয়ে নানা তথ্য যুক্ত করা হয়েছে এসব লিফলেটে।

রেস্টুরেন্টটিতে খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রেও রয়েছে সেবামূলক আরো কিছু বিষয়। যেমন প্রতিদিন রাত ১০টায় কাকুর কিচেন এর পক্ষ থেকে বিনামূল্যে গরীব-দুখীদের মাঝে  খাবার পরিবেশন করা হয় যার নাম দেয়া হয়েছে ‘বন্ধু খাবার’। মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ বাড়ানো, মানবতা আর সৌহার্দ্যের হাত বাড়িয়ে দিতেই এই আয়োজন থাকে কাকুর কিচেন-এ। মোট চারটি কক্ষ- পদ্মা, সুরমা, যমুনা, কর্ণফুলীতে ৮০ জনের আসন ব্যবস্থা রয়েছে কাকুর কিচেনএ। কক্ষের এমন নামকরণের কারণ জানতে চাইলে জেনারেল ম্যানেজার জামি বলেন, ‘এই চারটি নদী যেমন বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে একই মোহনায় মিশে সাগরে চলে যায়। ঠিক তেমনি কাকুর কিচেনেও বিভিন্ন এলাকার মানুষজন এসে একত্রে মিশে যায়। এই একাত্মতা বোঝাতেই এমন নাম বেছে নেয়া হয়েছে।’

কাকুর কিচেন এর আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী তরুণ তরুণীদের দিয়ে খাবার পরিবেশনা। সেখানে আবার কেউ নিজেদের নামে পরিচত নয়, বরং মিঃ ওয়ান, মিঃ টু এভাবেই পরিচিত। নিজেদের কাজের যোগ্যতার মাধ্যমে ওয়ান, টু, থ্রি পর্যায়ক্রমে নামকরণ করা হয়ে থাকে। কাজের যোগ্যতা সবার আগে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারটি প্রবলভাবে গুরুত্ব পায় এখানে।

এতো গেলো রেস্টুরেন্টটির নানান বিষয় নিয়ে গল্পস্বল্প। কিন্তু একটি রেস্টুরেন্টের নাম ‘কাকুর কিচেন’- কেন? এমন প্রশ্নে জামি বলেন ‘মামা’ নিয়ে আমাদের দেশে কম জলঘোলা হয়নি। ‘ভাই’ নিয়েও হয়েছে। এই যেমন ভাই ভাই অমুক, ভাই ভাই তমুক…। এই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে অন্যধারা তৈরি করতে চেয়েছি আমরা। একটি পরিবারে কাকু মানে চাচা অতি আপনজন এবং শ্রদ্ধার পাত্র। তাছাড়া আজকের ছোট্ট পরিবারে বেড়ে উঠা নতুন প্রজন্ম চাচা-চাচী, মামা-মামী কিংবা খালা-খালুর মতো মধুর সম্পর্কগুলো থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। নতুন প্রজন্ম জানেই না এমন সম্পর্কের গভীরতার কথা। অথচ আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদেরকে পৃথিবীর নতুন নতুন বিষয়ের সাথে পরিচয় করিয়েছেন চাচা, মামারা। শুধু তাই নয় এমনও হয়েছে যে কথা বাবা-মাকে বলা যায়নি, তা আমরা চাচাদের সাথে শেয়ার করেছি। তাই বাবা-মায়ের সাথে যখন আমাদের এই রেস্টুরেন্টে আজকের একটি শিশু আসবে তখন তার মনে ‘কাকু’ সম্পর্কটির গুরুত্ব বোঝাতেই এই নামকরণ করা হয়েছে।

Kakur-Kicthenকী পাঠক, ভাবছেন যে রেস্টুরেন্টের নামকরণ, সাজসজ্জা এবং বিশেষত্বে এতোকিছু সেই রেস্টুরেন্টের খাবার জানি কেমন হবে! কেউ কেউ আবার এমনও ভাবতে পারেন সাজসজ্জা এবং সামাজিক সচেতনতামূলক কাজ করার পর হয়তো খাবারের দিকে নজর দেয়া কর্তৃপক্ষের সম্ভব হয়ে উঠে না। খুব অবাক করা হলেও সত্য যে, মাত্র তিনটি প্রধান আইটেম, দুই রকমের কাবাব ও গুটিকয়েক ড্রিঙ্কস নিয়ে কাকুর কিচেন এর খাবারের আয়োজন। দম বিরিয়ানি, দম তেহারি আর দম মোরগ পোলাও- এই তিনে সাজানো রসনার আয়োজন। তবে খাবারের বিশেষত্ব আরেক জায়গায়। প্রতিটি রান্নাই হয় কাঠ কয়লার চুলায় দম দিয়ে। সাথে থাকে সুস্বাদু আচার, পছন্দমতো কাবাব আর সালাদ। আর রান্নায় ব্যবহৃত হয় ‘কাকুর কিচেন’-এর সাতক্ষীরায় নিজস্ব ডেইরী ফার্ম থেকে উৎপাদিত ঘি, রপ্তানীকৃত বাসমতি চাল ও উৎকৃষ্ট মানের সব মশলা। স্বাদেও একেবারেই ভিন্ন কাকুর কিচেন এর খাবার। প্রথাগত বিরিয়ানি ও তেহারির স্বাদকে একেবারেই বদলে দিয়েছে এই রেস্টুরেন্টটি। পরিবেশনায় কোনো রকমের চামচ ব্যবহার না করে হাতে খাওয়ার মজাটাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে যা খাবারের স্বাদকে আরো বেশি বাড়িয়ে তোলে। দামটাও একেবারেই হাতের নাগালে। দম বিরিয়ানি ও দম মোরগ পোলাও পাওয়া যাবে ১৯০ টাকায়, আর দম তেহারী ১৭০ টাকা। আর চিকেন জালি কাবাব ও বিফ জালি কাবার পাওয়া যাবে যথাক্রমে ৬৫ ও ৫৫ টাকায়। সাথে রয়েছে বোরহানি ও নানা রকমের সফট ড্রিংকস।

কাকুর কিচেন এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে জামি বলেন, ‘আমরা অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছি এই আয়োজন। আমরা যেনো সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি সেই  কারণে জায়গা নির্ধারণ থেকে শুরু করে খাবারের মূল্য নির্ধারণ, সবকিছুতেই প্রথাগত ধারণার বাইরে এসে কাজ করছি এবং সেবাটাকেই প্রাধান্য দিয়েছি। আমরা ব্যবসা করবো তবে তা সত্যিকারের সেবার মাধ্যমে। ফরমালিন এবং ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে আমাদের নীরব আন্দোলন। আমরা বিশ্বাস করি জেল-জরিমানা করে বিষযুক্ত খাবার তৈরির উদ্যোগ দমানো সম্ভব নয়। মানুষের মধ্যে সচেতনতা এবং বিশুদ্ধ খাবার পরিবেশনের মাধ্যমেই এ ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো সম্ভব। তিনটি বিরিয়ানি দিয়েই সারা দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজি খোলার পরিকল্পনা রয়েছে  ‘কাকুর কিচেন’ এর। ইতোমধ্যেই আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে দেশের ৮টি বিভাগ এবং ৪২ টি জেলায়  কাকুর কিচেন’কে ছড়িয়ে দেয়ার।’

সকাল ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যনত্ম খোলা থাকা ‘কাকুর কিচেন’-এ খাবার পার্শ্বেল এবং রেস্টুরেন্টে কেউ চাইলে যেকোনো অনুষ্ঠানের আয়োজনও করতে পারেন।

মডেল: অভিনয়শিল্পী তানভীর ও সোমা।