SHARE
Mashrafee

সারা দেশে উদ্বেগ-রোগমুক্তি কামনা

ক্রীড়া প্রতিবেদক
নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য বাংলাদেশের সফলতম অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তার শরীরে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে গতকাল শনিবার। কিংবদন্তি এই ক্রিকেটার নিজে খবরটি নিশ্চিত করেছেন।
‘আজকে আমার কভিড-১৯ রেজাল্ট পজিটিভ এসেছে। সবাই আমার জন্যে দোয়া করবেন যাতে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারি।’ গতকাল বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেজে এ খবর জানিয়ে মাশরাফী বলেছেন, ‘আক্রান্ত সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের সবাইকে এখন আরও সতর্ক হতে হবে। সবাই ঘর থেকে বিনা প্রয়োজনে বের না হই।’ রাজধানীর মিরপুরে নিজের বাড়িতে নিজেকে আলাদা করে রেখেছেন মাশরাফী। ফেইসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘আমি বর্তমানে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিয়ে যাচ্ছি এবং প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ মেনে চলছি। করোনা নিয়ে আতঙ্ক নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।’
মাশরাফীর গত দুদিন ধরে জ্বর। শরীর ও মাথাব্যথা আছে। তিনি আক্রান্ত হলেও তার স্ত্রী সুমনা হক সুমি ও দুই সন্তান হুমায়রা মোর্ত্তজা ও সাহিল মোর্ত্তজার মধ্যে করোনার কোনো উপসর্গ নেই। মিরপুরের বাসায় আছেন সবাই।
সম্প্রতি মাশরাফীর শাশুড়ি, শ্যালিকা ও শ্যালিকার মেয়ে করোনায় আক্রান্ত হন। তাদের চিকিৎসা চলছে ঢাকার একটি হাসপাতালে। তার আগে তারা ছিলেন নড়াইলে। তবে মাশরাফী আক্রান্তদের সংস্পর্শে যাননি। তেমন একটা বাইরেও বের হননি সম্প্রতি। তাই তিনি ঠিক কীভাবে করোনায় আক্রান্ত হলেন তা বোঝা যাচ্ছে না।
নিজের জায়গা থেকে মানুষের জন্য করোনাভাইরাস মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মাশরাফী। সেই লড়াই নড়াইল-২-এর সাংসদ এবং ক্রিকেটারের দায়িত্বের জায়গা থেকে। এর মধ্যে নিজে আক্রান্ত হয়ে গেলেন।
দুই হাঁটুতে সাতটি মেজর অস্ত্রোপচার নিয়ে এবং আরও অনেক ইনজুরির সঙ্গে লড়ে এখনো জাতীয় দলে খেলে চলা মানুষটি এই লড়াইয়ে জিতে ফিরে আসার দৃঢ় প্রত্যয় জানিয়েছেন।
‘উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর থেকেই নিজেকে আলাদা করে রেখেছিলাম। এখনো বাসায়ই থাকছি।’ নিজের কভিড-১৯ পজিটিভের খবর প্রসঙ্গে মাশরাফী বলছিলেন, ‘জ্বর ও গা ব্যথা ছাড়া আপাতত কোনো সমস্যা নেই। গুরুতর কিছু নেই। আমি ঠিক আছি।’
করোনাভাইরাসের এখনো কোনো ভ্যাকসিন নেই। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত দুনিয়াজুড়ে ২১৫ দেশ ও অঞ্চলের ৮৭,৮৯,৪৪৩ জন মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। নতুন যে ৩৮,৪৫৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন তাদের একজন মাশরাফী। এখন পর্যন্ত কভিড-১৯-এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন ৪,৬৩,২০২ জন। আরও ১,৩৮২ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে গতকাল। তবে আশার কথা হলো ৪৬,৪৯,৩১৪ জন মানুষ করোনার সঙ্গে লড়ে সুস্থতায় ফিরেছেন। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১,০৮,৭৭৫ জন আক্রান্ত হলেও সেরে উঠেছেন ৪৩,৯৯৩ জন। মারা গেছেন ১,৪২৫ জন।
এই পরিসংখ্যান খুব ভয়ংকর হলেও মাশরাফী ভিন্ন ধাতুতে গড়া মানুষ। সব সময় পজিটিভ। লড়াকু। খেলার মাঠে তার লড়াইয়ের ইতিহাস শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে অনেকের নতুন করে লড়ার প্রেরণা। সেই মানুষটি পারলে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চাইতেন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবরটাকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে, ‘তেমন কিছু না’ বলে। তবে প্রবল সাহসী মানুষটির দৃপ্ত উচ্চারণ, ‘অনেক ইনজুরি হলো জীবনে। ডেঙ্গু হলো। এবার কভিড। এসব ধাক্কা আমার সয়ে গেছে।’ তাকে নিয়ে গোটা দেশ এখন দুশ্চিন্তায়। কিন্তু বরাবরের মতো স্বাভাবিক কণ্ঠেই মাশরাফী বললেন, ‘মনোবল চাঙ্গা আছে। সবাই দোয়া করবেন।’
দেশে করোনা হানা দেওয়ার শুরুতেই মানুষের জন্য লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন মাশরাফী। জাতীয় দলকে নিয়ে তহবিল গড়েন। নিজের এলাকা নড়াইলে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। খুব কাছাকাছি সময়ে তিনি নড়াইলে অবশ্য যাননি। শুরুর দিকে দুবার গিয়ে কিছু কাজ নিজ হাতে করে এসেছেন। ঢাকায় ফিরে ভিন্ন বাসায় দুই সপ্তাহ ছিলেন কোয়ারেন্টাইনে। তখন থেকে রাজধানী থেকেই নির্দেশনা দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলেন। সাংসদ হিসেবে বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগেও করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত বহু মানুষের ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন মাশরাফী।
ক্রিকেটার মাশরাফীর নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনও দেশজুড়ে অসহায় মানুষদের পাশে থাকছে। তহবিল গড়তে নিজের দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের সঙ্গী ব্রেসলেট তুলেছিলেন নিলামে। সেটি বিক্রি হয় ৪২ লাখ টাকায়। সেই টাকাও খরচ হচ্ছে মানুষের জন্য।
৩৬ বছর বয়সী মাশরাফী খুব সতর্ক ছিলেন। তারপরও এড়ানো গেল না করোনাকে। বাংলাদেশের বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে মাশরাফী হলেন প্রথম কভিড-১৯ পজিটিভ মানুষ। সাবেকদের মধ্যে কিছুদিন আগে আশিকুর রহমান আক্রান্ত হয়ে লড়াইয়ে জিতে সুস্থ হয়েছেন। বাংলাদেশের ওয়ানডে দলের অধিনায়ক তামিম ইকবালের বড় ভাই নাফিস ইকবাল কয়েক দিন আগে পজিটিভ হয়েছেন। এখন তিনি সুস্থতার পথে। গতকাল খবর এসেছে জাতীয় দল থেকে বাইরে থাকা বাঁহাতি স্পিনার নাজমুল ইসলাম অপুও করোনায় আক্রান্ত।
নড়াইলে উদ্বেগ-রোগমুক্তি কামনা : মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার করোনায় আক্রান্তের খবরে নড়াইলের রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, ক্রীড়ামোদী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। তারা সবাই তার আশু রোগমুক্তি কামনা করেছেন।
মাশরাফী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে অবহেলিত নড়াইল জেলাকে একটি মডেল জেলায় রূপান্তরের স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেন। জেলার অবকাঠামো ও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নসহ সর্বক্ষেত্রেই তিনি সফল জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর থেকে নড়াইলের চিকিৎসকসহ সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন মাশরাফী। প্রথম দিকেই ব্যক্তিগত অর্থায়নে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী ও মাঠ পর্যায়ে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে ৬৪০টি পিপিই বিতরণ করেন। সদর হাসপাতালে প্রবেশদ্বারে জীবাণুনাশক কক্ষ স্থাপন এবং চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের সুরক্ষার জন্য স্থাপন করেন ‘ডক্টরস সেফটি চেম্বার’। করোনা আতঙ্কে যখন রোগীরা হাসপাতালে এসে চিকিৎসাসেবা নিতে ভয় পাচ্ছিলেন তখন মাশরাফী ‘ডাক্তারের কাছে রোগী নয়, রোগীর কাছে ডাক্তার’Ñ এ স্লোগানে নড়াইলে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা চালু করেন। নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অন্তত ২ হাজার রোগীকে চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ দিয়েছে। এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনে মাশরাফীর দেওয়া অ্যাম্বুলেন্সটি মানবতার সেবায় সব সময় নিয়োজিত রয়েছে।
শুধু ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিমের চিকিৎসাসেবায় থেমে থাকেননি মাশরাফী। রোগীরা যাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন সেজন্য চালু করেছেন ‘টেলি-মেডিসিন সেবা’। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মোবাইলের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করছেন রোগীরা। এ ছাড়া তার উদ্যোগে করোনার লক্ষণ নিয়ে কোনো রোগী হাসপাতালে এলে যাতে সঠিকভাবে চিকিৎসাসেবা পান সে ব্যবস্থাসহ হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য ১০টি বেড নিয়ে করোনা ইউনিট চালু রাখা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নড়াইল জেলা থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে নড়াইল সদর হাসপাতালে একটি আইসিইউ চালু ও করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের খাদ্য নিরাপত্তায় বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানান মাশরাফী। কারাবন্দিদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি নড়াইল কারাগারের ১৪৪ বন্দির মাঝে ওয়াশেবল মাস্ক, হ্যান্ডওয়াশ, সাবান, হ্যান্ড গ্লাভস বিতরণ করেছেন। করোনার কারণে দিনমজুর, মোটরশ্রমিক, ভ্যানচালক, কৃষিশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দরিদ্র মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকে সেজন্য ১৫ হাজার মানুষের মাঝে উপহারসামগ্রী ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন মাশরাফী। এ ছাড়া দলীয় নেতাদের মাধ্যমে চার হাজার পরিবারকে উপহারসামগ্রী, নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিন হাজার পরিবার, জেলা ক্রীড়া সংস্থার মাধ্যমে এক হাজার অসচ্ছল সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়, বাস, মিনিবাস, ট্রাক, মোটরযানের ৮০০ শ্রমিকের মাঝে উপহারসামগ্রী বিতরণ করেছেন। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনদের খাবার ও নগদ অর্থ প্রদান, প্রতিটি এতিমখানা-মাদ্রাসায় ৫০ কেজি করে চাল উপহার, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের মাধ্যমে ৫০ জন পুরোহিতকে খাবার ও নগদ টাকা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগের অসচ্ছল নেতাকর্মীদের মাঝেও গোপনে উপহার পাঠিয়েছেন। পবিত্র রমজান মাসে রাস্তাঘাটে কোনো রোজাদার যাতে ইফতারি করতে কষ্ট না পান সেজন্য ভ্রাম্যমাণ ইফতার বিতরণ কার্যক্রম চালু করেন তিনি। সম্প্রতি মাশরাফী নড়াইলে এসে কয়েকটি ইউনিয়নের ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের খোঁজ নেন এবং নিজে উপহারসামগ্রী পৌঁছে দেন। ভ্যানচালকদের নগদ অর্থ সহায়তা করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপহার, সরকারি ত্রাণের তালিকা প্রস্তুতি ও বিতরণে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তদারকি অব্যাহত রেখেছেন মাশরাফী। করোনা সংকটে এই সংসদ সদস্য তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ধান কাটার চারটি কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন ক্রয় করে দিয়েছেন। তাতে শ্রমিক সংকটের এই সময়ে কৃষকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ করে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিয়ে করোনা মোকাবিলা ও জনসেবা অব্যাহত রেখেছেন মাশরাফী।