Home শীর্ষ কাহিনি প্রচ্ছদ মুখ একক ভাবে যৌথ জীবন!

একক ভাবে যৌথ জীবন!

SHARE

রেজানুর রহমান
টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠান। একজন তারকা অন্যএকজন তারকাকে জিজ্ঞেস করছে ‘প্রেম করেছো কয়টা? তারকা গর্বের ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বললেন, অসংখ্য… গুণে শেষ করা যাবে না। আমাকে যে-ই দেখতো প্রেম করতে চাইত। বড় ভাইয়ের দু’জন বন্ধুও ছিল আমার প্রেমিকের তালিকায়। একজন কবিও আমার প্রেমে পড়েছিল। রোজ একটা করে কবিতা লিখে খামে ভরে আমাকে পাঠানোর চেষ্টা করতো। বানান ভুলের কবিতা। একদিন আমার বাবার কাছে সে ধরা পড়ে যায়। বাবা হৈ চৈ করে সারা বাড়ি গরম করে ফেলেনÑ যে ছেলে শুদ্ধ বানানে একটা বাক্য লিখতে পারে না সে কোন সাহসে আমার মেয়েকে চিঠি লিখে? বাবার ধমক খেয়ে ওই কবি আমাকে আর কবিতার ভাষায় চিঠি লিখেনি। আরেকটা মজার ব্যাপার বলি। আমাদের পাড়ার এক মাস্তান আমার প্রেমে পড়েছিল। অনেক কষ্টে সেই প্রেম থেকে বেরিয়ে এসেছি আমি… বলেই বিজয়ীর হাসি ছুড়ে দিলেন ওই তারকা। অনুষ্ঠান দেখছি আর ভাবছি আজকাল এমন বিষয়ও কি টেলিভিশনে আলোচনা হয়? একটা সময় রেডিও টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে ‘প্রেম’ শব্দটাই নিষিদ্ধ ছিল। একটি মেয়ে একটি ছেলের সাথে প্রেম করছে আবার সেটা প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছে এদৃশ্য তো কল্পনাই করা যেত না। আর এখন শুধু বড়রাই নয় বাচ্চারাও প্রেম করতে শিখেছে। এবং সে কথা জনে জনে বলেও বেড়ায়। যেন প্রেমের কথা বলা গর্বের। হ্যা প্রেমের কথা বলা অবশ্যই গর্বের। প্রেম করেছি, বেশ করেছি, কবরই তো… এই গানের সূত্র ধরে বলতে হয় প্রেম দোষের কিছু নয়। কিন্তু প্রেমের নামে নষ্টামি অথবা ভন্ডামিই দোষের।

আবার ওই সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে আসি। উপস্থাপক এবং সাক্ষাৎকার দাতা দু’জনই মহিলা। প্যান্ট শার্ট পরেছেন দু’জনই। প্যান্ট শার্টে দোষের কিছু নাই। কিন্তু আমরা বোধকরি মাঝে মাঝে ভুলে যাই টেলিভিশন প্রতিটি পরিবারের ড্রয়িংরুমের অলংকারও বটে। টেলিভিশন পারিবারিক ভাবে সব চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিনোদন মাধ্যম। রাস্তায় ভিক্ষা করে যে সংসার চালায় তার বস্তির কুটিরেও দেখবেন হয়তো একটি টেলিভিশন সেট শোভা পাচ্ছে। এক কথায় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলে না। টেলিভিশন দেখেই আমরা খাই, কাজকর্ম করি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যেও টেলিভিশন দেখি। ফলে টেলিভিশনে যা দেখানো হয় সেটাই অতিদ্রæত ছড়িয়ে যায় মানুষের মনে। হতে চাই তার মতো? কার মতো? ঐ যে টেলিভিশনে দেখেছি প্যান্ট শার্ট পরা দুই আপুকে… তাদের মতো… একথা ভাবতে গিয়ে একটু অবাকই হলাম। ভয়ও পেলাম বটে। ধরা যাক আমাদের মেয়েরা সবাই টিভি পর্দায় দেখা ওই দুই আপুর মতো হতে চাচ্ছে। তাদের মতোই পোশাক পরেছে… তাদের মতোই ভাব ভঙ্গি। পথে ঘাটে, বিপনী বিতানে যাকেই দেখি তারাই প্যান্ট শার্ট পরা… কেমন হবে তখন?


না, এই দৃশ্যটা কল্পনাও করতে চাই না। বরং সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে আসি। সাক্ষাৎকার চলছে। হঠাৎ অতিথি তারকাকে প্রশ্ন করা হলো, তুমি কি তোমার বয়সের চেয়ে ছোট কোনো ছেলের প্রেমে পড়েছিলে? সাথে সাথেই তারকার গর্বিত ভঙ্গি প্রকাশ পেলÑ হ্যাঁ… অনেক। এব্যাপারে একটি মজার ঘটনার কথা বলি। আমাদের পাড়ার একটি ছেলে, আমার চাচাতো ভাইয়ের বন্ধু… আমাকে আপু বলে ডাকে। একদিন আমার হাতে সে একটা চিঠি ধরিয়ে দিল। চিঠি খুলে দেখি লাভ লেটার। হা: হা: হা: আমার জীবনে এ ধরনের কত ঘটনাই ঘটেছে। কয়টা বলব?
অনুষ্ঠান চলছে। বাকিটা দেখার ব্যাপারে মনযোগ পেলাম না। আমার ধারনা আমি মনযোগ না পেলেও অন্যরা হয়তো পেয়েছে। প্রেমের কথা শুনতে বেশ মজাই লাগে। কিন্তু তাই বলে এত খোলামেলা প্রেমের কথা। একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তার প্রেমের কথা বলতেই পারেন। তাই বলে অসম প্রেমের কথাও শোনাবেন? এর ফলে কি বার্তা দেই আমরা? পরিবারের কোমলমতি শিশুরা আসলে কি বার্তা পায়? এক সময় ছাপা অক্ষরের পত্রিকার বিরুদ্ধে অশ্লীলতা ছড়ানোর অভিযোগ তোলা হতো। নায়ক নায়িকার দুয়েকটা খোলামেলা ছবি ছাপা হলেই হই চই পড়ে যেত। আর এখন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠানে কোনো কোনো তারকা এমন ভাবে হাজির হচ্ছেন এমন ভাবে খোলামেলা কথা বলছেন যে ছাপা অক্ষরের পত্রিকাকেও হার মানায়। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে ছাপা অক্ষরের পত্রিকা গুলো যেন একটু ‘ব্যাকডেটেড’ হয়ে যাচ্ছে।
সত্যি কি তাই? সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। একথা মানতেই হবে যুগের একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে। বিশ পচিশ বছর আগের বাংলাদেশ আর বর্তমান সময়ের বাংলাদেশ এক নয়। পঁচিশ বছর আগে বাংলাদেশে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল সিনেমা। আর এখন সিনেমার জগতে হাহাকার চলছে। কিছুদিন আগে এক সময়ের দাপুটে চিত্র পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর সাথে কথা বলছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ভাই আর সিনেমা বানাবেন না? সরাসরি উত্তর দিরেনÑ না, আর সিনেমা বানাব না। কারণ এই দেশে সিনেমা চলে না। আসলেও তাই বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে সিনেমার দুর্দিন চলছে। ছাপা অক্ষরের পত্রিকার ক্ষেত্রেও একটা পরিবর্তন লক্ষ্যনীয়। সবকিছুই যেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে জানা এবং বলার জায়গাটা খুবই সহজ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেকের দৃষ্টি ভঙ্গিই পাল্টে যাচ্ছে। গোপন কথা আর গোপান থাকছে না। কখনও কখনও মনে হয়, আমরা অতি মাত্রায় সাহসী হয়ে উঠছি।
পাঠক, ক্ষমা করবেন একটি ছোট্ট বিষয়ের অবতারনা করি। মহিলাদের ‘ব্রা’ অর্থাৎ অন্তর্বাস নিশ্চয়ই গোপনীয় বিষয়? অনেকেই হয়তো আমার সাথে তর্ক শুরু করতে চাইবেন। বলবেন পুরুষের আন্ডারওয়্যারও তো গোপনীয় বিষয়। হ্যা দুটি পোশাকই গোপনীয়। কিন্তু কেউ যদি এই পোশাক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ট্রল’ করার আনন্দে মেতে ওঠেন তাহলে তা কি সমর্থন যোগ্য? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই দেখলাম একজন জনপ্রিয় তারকা তার ব্যবহার করা ‘ব্রা’ বারান্দায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন। ওই ব্রা’র মধ্যে বাবুই পাখি বসে দোল খাচ্ছে…. ছবির নীচে একটি ক্যাপশন লেখা হয়েছে। যা প্রকাশ করতেও দ্বিধা হচ্ছে। জানি না ওই তারকা কোন যুক্তিতে এমন একটি ছবি তার টাইম লাইনে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই খুব বাহবা পেয়েছেন এজন্য? যারা তাকে বাহবা দিয়েছেন তারা কি সত্যিকার অর্থে মন থেকে বাহবা দিয়েছেন।

এবার আনন্দ আলোর এবারের শীর্ষ কাহিনীর মূল প্রসঙ্গে আসি। একথা সকলেই মানবেন তারকাদের ভালো-মন্দের অনেক কিছুই তাদের ভক্তদের মাঝেও প্রভাব ফেলে! হতে চাই তার মতো? এমন ভাবনায় অনেকেই জীবন সাজায়। অর্থাৎ তারকারা অনেকেরই আইডলে পরিণত হয়। সে ক্ষেত্রে অনেক সময় তারকার ব্যক্তিগত জীবনও তাদের মাঝে প্রভাব ফেলে। দেশের একজন গুণী অভিনেত্রীর কথা বলি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করেছেন। তার অভিনয়ে মুগ্ধতা ছড়ায় প্রতিদিন। কিন্তু তার জীবনের গল্প খুব একটা আনন্দের না। তাকে ঘিরে কতই না কল্প-কাহিনী ছড়িয়ে আছে আমাদের মিডিয়ায়। এমন কথাও শোনা যায় তিনি নাকি একজন জনপ্রিয় নাট্য নির্মাতার সাথে লিভ টুগেদার করেন। ‘লিভ টুগেদার’ শব্দটি আমাদের দেশে খুবই নিন্দনীয়। তা সত্বেও আমাদের এই প্রিয় অভিনেত্রী কেন তার সম্পর্কের রসায়নটা খোলাসা করছেন না। এই প্রশ্ন অনেকের!
আরেকজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও নাট্য পরিচালক বলা যায় দীর্ঘ দিন ধরেই প্রকাশ্যেই স্বামী-স্ত্রীর মতো চলাফেরা করছেন। তারা নিজেদেরকে ভালো বন্ধু বলে দাবী করেন। তবুও তাদেরকে ঘিরে আমাদের শোবিজে নানা কথা ঘুরে বেড়ায়? তবুও তারা কেন তাদের সম্পর্কের রসায়নটা পরিস্কার করছেন না এই প্রশ্নও অনেকের। এতক্ষণ যে দু’টি জুটির কথা উল্লেখ করা হলো তাদের বাইরে আরও অনেকে আছেন যারাও তাদের সম্পর্কের রসায়নটা পরিস্কার করছেন না। যেমন এখনকার শীর্ষ একজন নাট্য অভিনেতা তার বিপরীতে সবসময় একজন অভিনেত্রীকে কথা বলে থাকেন। নির্মাতারা তার কাছে নাটকের ডেটের জন্য গেলেই বলে থাকেন তার বিপরীতে সেই অভিনেত্রীকে নিতে। এমনকি সেই নায়িকার কবে কোথায় শুটিং সেটাও জানান সেই অভিনেতা। এদের মধ্যে একটা গোপন সম্পর্কের কথাই বলে থাকেন অনেকে। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আধুনিক দৃষ্টি ভঙ্গি ছড়ানোর নামে এমন কিছু ছবি প্রকাশ করেন তা নিয়েও মাঝে মাঝে প্রশ্ন দেখা দেয়।

আমরা মনে করি কে কিভাবে জীবন যাপন করবেন সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবুও কথা থেকে যায়। তারকাদেরকে সাধারন মানুষ খুবই পছন্দ করে। আর তাই অনেকে তারকাদের মতো হতে চায়। সেকারণে তারকাদের উচিৎ এমন কিছু না করা যাতে ভক্তদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মানছি যুগ পাল্টেছে। এখন আর ঘোমটা দেওয়ার যুগ নেই। তাই বলে ঘোমটা খুলে যা ইচ্ছে তাই করব এমনটাও তো মেনে নেওয়া যায় না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমাদের সমাজ জীবনে। যার ফলে আমরা অনায়াসেই পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধন আলগা করে ফেলছি। যে যাই বলুক, শেষ পর্যন্ত পরিবারই হলো বেঁচে থাকার আসল ঠিকানা। সাথে আছি অথচ নিজেদেরকে পরিবার বলতে পারছিনা এমন সুখের ঠিকানায় যারা বসবাস করছেন, কী তারকা, কী সাধারন মানুষ সবার ক্ষেত্রেই বলি ভুল করছেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারকেই লাগে। পরিবারই হলো সুখের আসল ঠিকানা। প্লিজ, পরিবার ভাঙ্গবেন না। বরং পরিবার গড়ে তুলুন।