SHARE
Ariful-Hoque-1

হাসিখুশি মানুষটি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। হাতের রুমালে চোখ মুছলেন কয়েকবার। আমাদের দিকে তাকাতেও পারছিলেন না। দেখে মনে হচ্ছিল বুকে তার হাজারো কষ্টের পাথর চাপা পড়ে আছে। সেটা তিনি কাউকে বলতে পারছেন না। তাই কেঁদে কেঁদে হালকা হতে চাইছেন। বেশ অনেকক্ষণ পর হাসলেন, হাসি-কান্না মিশিয়ে বললেন বুড়ো মানুষ আবার কাঁদে নাকি। বুড়ো মানুষের চোখে কান্না থাকে না, পানিও থাকে না কিন্তু আমার আছে। এই বলে তিনি আবারও চোখ মুছলেন। নাটক সিনেমার অনৱঃপ্রাণ এক মানুষ তিনি। প্রাণ খুলে অভিনয় করতেন। কখনো বাবা, কখনো শান্ত স্বভাবের শিক্ষক, কখনো দুর্দান্ত ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দর্শকদের। এই মানুষটি তার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে সুদূর কানাডায় চলে গেছেন ১৬ বছর আগে ছেলে-মেয়ের কাছে। সেখানে এখন তিনি একাকী অবসর জীবন যাপন করছেন। তার অবসর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে নাটক, সিনেমা থেকে দূরে থাকার বেদনা ও কষ্টে। প্রাণবন্ত এই প্রবীণ অভিনেতা কিছুদিন আগে কানাডা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ব্যক্তিগত কাজে। ব্যস্ত সময়ের মধ্যে চ্যানেল আই-এর আমন্ত্রণে তারকাকথন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে তার সঙ্গে কথা হয় আনন্দ আলোর। প্রিয় পাঠক, নাটক ও সিনেমার এক সময়কার জনপ্রিয় এই অভিনেতা আরিফুল হকের সঙ্গে কথপোকথনের চুম্বক অংশ পত্রস্থ হলো। লিখেছেন জাকীর হাসান

আনন্দ আলো: নাটক, সিনেমার অন্তঃপ্রাণ মানুষ আপনি। দীর্ঘদিন অভিনয় থেকে দূরে আছেন। সুদূর কানাডায় কেমন কাটছে আপনার জীবন।

আরিফুল হক: খুব হাসি খুশি, আনন্দ আর প্রশান্তিতে যে কাটছে তা নয়। কাটছে সাদামাটাভাবে। কারন আমিতো নাটকের মানুষ কিন্তু নাটকে অভিনয় করতে পারছি না। এজন্য মনটা খুব কাঁদে। প্রচণ্ড একা একা লাগে। স্মৃতি হাতড়াই, কখনো বসে বসে কাঁদি। দুঃখ করি, মনের ভেতরটা মোচড় দেয়। ঠিক বোঝাতে পারছি না কীভাবে, কেমন করে আমার প্রতিটি দিন কেটে যাচ্ছে। বুকের মধ্যে চাপা ব্যথা নিয়ে ঘরে ফিরি-শুয়ে-বসে থাকি। কানাডার সুন্দর পরিচ্ছন্ন শহর ঘুরে ফিরে দেখি। পরিচিত কাউকে কাছে পেলে কথা বলা শুরু করি, তা যেন আর শেষ হয় না। যখন বুকটা ভারি হয়ে উঠে তখন কেঁদে হালকা হই। এভাবেই কাটছে। নিজের দিন গুজরান করছি।

আনন্দ আলো: হঠাৎ আপনি কানাডা চলে গেলেন কেন? কি এমন সমস্যা হয়েছিল?

আরিফুল হক: আমি কিন্তু হঠাৎ করে কানাডা চলে যাইনি। বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয়েছে। আমার ছেলে ও মেয়ে থাকে কানাডায়। আমি স্ত্রীকে নিয়ে একা বাসায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতাম। এটা সন্তানদের কানে যাওয়ার পর তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। তাছাড়া আমার বয়স হয়েছে। আমাদের দেখাশোনা করার মতো লোক নেই। তাই বাধ্য হয়ে সন্তানদের অনুরোধে কানাডায় চলে যেতে হয়। আজ ১৬ বছর হয়ে গেল কানাডায় বসবাস করছি। মন কোনোভাবে চায় না বিদেশ বিভূঁইয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে, তবুও থাকছি। গত ১৬ বছরে আমি মাত্র দুইবার দেশে এসেছি জরুরি কাজে। কারো সঙ্গে তেমন দেখা- সাক্ষাৎ হয়নি। তাছাড়া আমিও ইচ্ছা করে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করিনি দুঃখে, ক্ষোভে, বেদনায়। আমি ঢাকায় এ খবরটি কীভাবে যেন পেয়ে যায় চ্যানেল আই। তারা আমাকে চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় একটি লাইভ অনুষ্ঠান তারকাকথন-এ অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে উপস্থিত হয়ে অনেক পুরনো মানুষের সঙ্গে কথা হয়। অনেকে আমাকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে। আমি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে খুবই আনন্দ পেয়েছি। এজন্য চ্যানেল আইয়ের প্রতি আমার অনেক কৃতজ্ঞতা।

আনন্দ আলো: তারকাকথন অনুষ্ঠানের পর নাটক বা সিমেনায় আপনার বন্ধুবান্ধবরা বা পুরনো নির্মাতারা যোগাযোগ করেনি?

আরিফুল হক: ঐ অনুষ্ঠান থেকে বের হওয়ার পর চ্যানেল আই ভবনে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। তারা আমাকে নিয়ে কাজ করবে বলে জানায়। কেউ কেউ আবার ফোন নম্বর নিয়ে রাখে-পরে যোগাযোগ করবে বলে। আমি সবাইকে শুধু বলেছি আমার হাতে এবার সময় নেই, তাই কিছু বলতে পারছি না। স্যরি, আমাকে ক্ষমা করবেন।

আনন্দ আলো: নাটকে সিনেমায় কাজ না করতে পারায় আপনার অনেক অভিমান কিন্তু দেশে এসে কাজ করার সুযোগ পেয়েও কেন করলেন না?

Ariful-Hoque-2আরিফুল হক: আসলে আমিতো অভিনয়কে গত ১৬ বছর আগে বিদায় জানিয়েছি। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। সেটাকে স্বল্প সময়ের জন্য সচল করতে চাইনি। মনটাতো আমার ভেঙে গেছে। মন স্থির করে কাজ করাতো সময়ের ব্যাপার। অভিনয়তো এমন কোনো বিষয় নয় যে, মন চাইল ছেড়ে দিলাম আবার বলা নেই কওয়া শুরু করলাম। অভিনয় একজন মানুষের মনের বিষয়। আমি আর অভিনয়ে ফিরে যেতে চাই না। তাই অভিনয় নিয়ে আলাপ আলোচনাও করি না।

আনন্দ আলো: কানাডায় বসে বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান, নাটক, সিনেমাতো দেখেন নিয়মিত?

আরিফুল হক: কানাডায় আমার বাসায় বাংলাদেশি কোনো চ্যানেল নেই। বাংলাদেশি চ্যানেল দেখতে চাইলে অপারেটরদের বলতে হয়। কিন্তু আমি ইচ্ছে করে বাংলাদেশি চ্যানেল দেখতে চাই না। কারণ আমার দেশের চ্যানেল দেখলে ঠিক থাকতে পারব না। নাটকে সিনেমায় পুরনো বন্ধুবান্ধব আমার পরম আপন নাট্যকর্মীদের মুখগুলো পর্দায় ভেসে উঠলে এমনিতে কান্না রোধ করতে পারি না। বুকটা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে। আমি ছটফট করতে থাকি। এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশি চ্যানেল বন্ধ রেখেছে আমার ছেলে-মেয়েরা।

আনন্দ আলো: মনে কি পড়ে সত্তর ও আশির দশকের বিটিভির সোনালী দিনের নাটকের কথা?

আরিফুল হক: সেই অসাধারণ দিনগুলোর স্মৃতি এখনো মনের মধ্যে জ্বল জ্বল করছে। আমি সেই স্মৃতিগুলো নিয়ে বেঁচে আছি। নাটকে অভিনয় করার জন্য কি কষ্টই না করতে হতো শিল্পীদের। নিয়মিত রিহার্সেল করার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে হতো। নাটকের সম্মানী দিয়ে সংসার চলতো না, তবুও টাকাটা পেলে কি যে আনন্দ হতো সেটা বুঝিয়ে বলা মুশকিল। আর এখন শুনেছি তরুণ ছেলে-মেয়েরা অভিনয়ে এসে এক বছরের মাথায় নতুন একটি গাড়ি কিনে এবং ফ্ল্যাট বুকিং দেয়। আমাদের সময় অভিনয়ের পাশাপাশি চাকরি বা ব্যবসা করতে হতো। এই সময় আমরা প্রায়ই কলকাতা যেতাম মঞ্চ নাটকের দল নিয়ে। ওখানে তখন দারুণ কদর ছিল আমাদের টিভি ও মঞ্চ নাটকের। একবার নাটকের দলের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলাম। ট্যুর শেষ করে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি তখন বলেছিলেন, অবসরে আমি শুধু বাংলাদেশের টিভি নাটক দেখি। নাটক দেখার পর নিজেকে বাঙালি বলতে গর্ব অনুভব করি। ঐ সময় নাটক মানেই ছিল বাড়তি আকর্ষণ। একঘণ্টার নাটকই বেশি উজ্জ্বল ছিল। বিশেষ করে বন্ধের দিন ও এ মাসের নাটক বেশি আকর্ষণীয় ছিল। অসাধারণ গল্প, সৃজনশীল ও মেধাবী নাট্য পরিচালক, প্রতিভাবান তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রবীণ বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীদের সমন্বয়ে কী দারুণ প্রোডাকশন হয়েছে। পত্রপত্রিকাতেও এই নাটক নিয়ে বিজ্ঞজনেরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন কী দারুণ ছিল ঐ সোনালী সময়। এখন সেসব শুধুই স্মৃতি।

আনন্দ আলো: ঢাকায় এসে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিবেশ কেমন দেখলেন?

আরিফুল হক: ঢাকায় ১৫ দিন অবস্থান করার পর যা দেখলাম তা হলো- নাট্যাঙ্গনে বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। আগে যেসব অনুসঙ্গ নাটকের বিষয়বস্তু ছিল, এখন আর তা নেই। আগের নাটকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, দেশ, সমাজ পরিবার ছিল নাটকের বিষয়বস্তু। এখন নাটকের বিষয়বস্তু শুধুই বিনোদন। তাই ভয় হয় এই বিনোদন বিষয়ক নাটকতো বেশিদিন টিকবে না। টেকার কথাও নয়। কারণ বিনোদন হলো- সাময়িক-এর কোনো স্থায়িত্ব নেই। আমাদের সমাজ, দেশ, রাজনীতি এবং পরিবারের গল্প নিয়ে যে নাটক নির্মিত হয়েছে সেগুলোর কথা মানুষ ভুলতে পারে না। কারণ সত্তর ও আশি দশকে নির্মিত সকাল সন্ধ্যা, সংশপ্তক, সময় অসময়, ভাঙনের শব্দ শুনি, এখনই সময়, এইসব দিনরাত্রি, ধারাবাহিক নাটকগুলো পরিবার ও সমাজকে কেন্দ্র করে। নাটকগুলো যেমন অভিনয় সমৃদ্ধ ছিল, তেমনি সুনির্মিত ছিল। যে কারণে নাটকগুলোর কথা মানুষের মনে গেঁথে আছে। এখন নাটকের মান ও উন্নয়ন কতটুকু হয়েছে সেটা আমি খুব ভালো বলতে পারব না। তবে অভিনয় শিল্পীদের উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শুনেছি কোনো এক অভিনেতা মাসে পনের লাখ টাকা রোজগার করেন। এটা শুনে ভালো লাগছে যে অভিনয় শিল্পীরা অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয়ার অধিকার অর্জন করেছে।

আনন্দ আলো: আপনি ভার্সাটাইল অভিনেতা হিসেবে পরিচিত। কখনো ভিলেন, কখনো পজেটিভ চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পেতেন কোথায়?

Ariful-Hoqueআরিফুল হক: অভিনয় শিল্পীদের আলাদা করে কোথাও দেখে না। যখন যে যেমন চরিত্র ভালোভাবে করতে পারবে, প্রশংসা পাবে সেটাই তার করা উচিত। তাই টাইপড হওয়ার ভয় সব শিল্পীর থাকে আমারও ছিল। তবে আমি কমপ্লিট একজন অভিনেতা হওয়ার চেষ্টা করেছি।

আনন্দ আলো: মনে আছে কী আব্দুল্লাহ আল মামুনের সারেং বউ ছবির সেই দুর্দান্ত ভিলেন আরিফুল হকের কথা। সেই গল্পটা কেমন, শুনতে চাই?

আরিফুল হক: আমারতো সারেং বউ ছবির ভিলেন হওয়ার কথা ছিল না। ঐ সময় আমাদের সিনেমার অসাধারণ ভিলেন অভিনেতা ছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান। এখনও তিনি আগের মতোই আছেন শুনেছি। আব্দুল্লাহ আল মামুন সাহেবের সঙ্গে স্ক্রীপ্ট করতেন তিনি। তার অভিনয় করার কথা থাকলেও তিনি বললেন, আমি যেহেতু স্ক্রীপ্ট করছি তাই এ ছবিতে অভিনয় নাইবা করলাম। পরে মামুন সাহেব আমাকে ডাকলেন এবং চরিত্র বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, আপনাকে এই চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। আমি একটু ভেবেচিনেৱ রাজি হলাম। রিহার্সেল করার সময় মামুন সাহেব একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন মনে হলো। কারণ আমিতো সিনেমার প্রথাগত ভিলেন নই। তাছাড়া ফারুক ও কবরীর মতো বিশাল বড় মাপের শিল্পীর সঙ্গে ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করা সব মিলিয়ে কেমন যেন লাগছিল। পরে ছবির প্রযোজক বললেন, সারেং বউতো প্রথাগত বাণিজ্যিক ধারার নয়। এটা অত্যন্ত সৃজনশীল, আমাদের বাস্তব জীবনের একটি গল্প। এতে আরিফুল হক সাহেব ভালোই করবেন। ছবি শেষ হলো। মুক্তি পাওয়ার পর অনেকে আমাকে অভিনন্দন জানালেন। দেশ-বিদেশে ছবিটির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। আজ এসব কথা বলতে গিয়ে হৃদয়টা ভেঙে যাচ্ছে আমার প্রিয় মানুষ, প্রিয় নির্মাতা আব্দুল্লাহ আল মামুনের কথা খুউব মনে পড়ে।