Home প্রতিবেদন এই ঈদে আসুন না নিজের দেশেই থাকি!

এই ঈদে আসুন না নিজের দেশেই থাকি!

SHARE

রেজানুর রহমান
বিনোদনের আদৌ কি কোনো প্রয়োজন আছে? নাটক, সিনেমা, খেলাধুলা, বিতর্ক সহ সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্র যদি সচল না থাকে তাহলে কার কী এমন ক্ষতি হবে? অস্থির হয়ে উঠবেন কী দেশের মানুষ? এই প্রশ্ন করেছিলাম বেশ কিছু মানুষকে। একজন শিক্ষকের বক্তব্যÑ নাটক সিনেমা সহ সাংস্কৃতিক নানা মাধ্যম দেশের মানুষকে আনন্দে রাখে। জীবনের জন্য আনন্দ খুবই জরুরি। আপনি সারাদিন শুধু কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন একটুও বিশ্রাম নিবেন না এটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। নাটক, সিনেমা, গান মানুষের ব্যস্ত মস্তিস্কে সুখের পরশ এনে দেয়। ফলে মানুষ নতুন করে সৃর্ষ্টিশীল কাজ করার অনুপ্রেরণা পায়। কাজেই ভালো ভাবে বাঁচার জন্য নির্মল আনন্দের প্রয়োজন আছে। একজন চিকিৎসকের বক্তব্যÑ আমি তো গান ছাড়া চলতেই পারি না। অবসর পেলেই গান শুনি। নাটক সিনেমা দেখার সময় পাই না। তবে সুস্থ জীবনের জন্য আনন্দ চাই। নাটক সিনেমার মধ্যেই এই আনন্দ খুঁজে নেয়া সম্ভব।
একজন আইনজীবী বললেন, পেশাগত কাজে যতই ব্যস্ত থাকি সময় পেলেই গান শুনি। নাটক, সিনেমা দেখি। মঞ্চ নাটক আমার খুবই প্রিয়। মনের আনন্দের জন্যই নাটক, সিনেমা দেখি। গান শুনি। কারণ আনন্দ না থাকলে তো ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। একজন রাজনীতিবিদ বললেন, মানুষকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই দেশে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিস্তার প্রয়োজন। একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে যাবে। নানা কারণে সারাদিন ব্যস্ত সময় পার করেছেন আপনি। বাসায় ফিরে একটু রিলাক্স হতে চাইবেন। তখন গান শুনতে ইচ্ছা করবে। টিভিতে অনুষ্ঠান দেখে একটু আনন্দ পেতে চাইবেন। এমন পরিস্থিতিতে একটি ভালো টিভি নাটক অথবা চলচ্চিত্র আপনার মানসিক স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করবে।
একজন ব্যবসায়ী বললেন, দেশে নাটক, সিনেমা সহ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সচল না থাকলে মানুষ তো অস্থির হয়ে যাবে। আমার নিজের কথা বলি। সারাদিন নানা কাজে ব্যস্ত থাকি। গাড়িতে কোথাও যাবার সময় গান শুনি। যত রাতেই বাসায় ফিরি না কেন টিভি অনুষ্ঠান না দেখলে ঘুম আসেনা। প্রায়শই ইউটিউবে ভালো নাটক অথবা সিনেমা দেখে ঘুমাতে যাই। নাটক, সিনেমা, গান ছাড়া তো জীবনের আনন্দ খুঁজে নেওয়া মুশকিল। একজন রিকসাচালক বললেন, সারাদিন রাস্তায় রিকসা চালাই। রাইতে বাসায় ফিইর‌্যা টিভি চালু কইর‌্যা দেই। টিভি অনুষ্ঠান না দেখলে রাইতে ঘুম আসে না। একজন বেকার তরুণের মন্তব্যÑ এটা কী প্রশ্ন করলেন আপনি? গান, নাটক, সিনেমা না দেখে জীবন পার করা অসম্ভব। আমি বেকার মানুষ। নানান হতাশা আমাকে প্রতিদিনই বিপদে ফেলতে চায়। কিন্তু আমাকে বিপদ থেকে কে উদ্ধার করে জানেন? নাটক, সিনেমা আর গান। মন খারাপ হলেই আমি টিভিতে নাটক দেখি অথবা সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যাই।
মোটকথা, সবার অভিন্ন বক্তব্যÑ বিনোদন ছাড়া জীবন চালানো অসম্ভব। দেশে নাটক নাই, গান নাই, সিনেমা নাই… এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ সত্যি সত্যি অস্থির হয়ে উঠবে। যদি তাই হয় তাহলে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এতো দৈন্যদশা কেন? দেশে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর ১০/১৫ বছর পর হয়তো একটা প্রজন্মের কাছে সিনেমা হলের ছবি এঁকে বোঝাতে হবে এটা সিনেমা হল। এখানে একদা প্রতিদিন নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সিনেমা প্রদর্শন করা হতো। সিনেমা প্রদর্শনের আগে হলের আলো বন্ধ করে দেওয়া হতো। সবার সামনে বড় পর্দায় বাজতো জাতীয় সঙ্গীত। তারপর শুরু হতো সিনেমা। আহা! কী সেই দিন গুলি। হলের ভিতর সিনেমা দেখতে দেখতেই দর্শকদের কেউ কাঁদতো, কেউ হাসতো। বাড়ি ফিরে গিয়ে খাবারের টেবিলে, অফিসের আড্ডা, আলোচনায় নতুন দেখা সিনেমা নিয়ে কতো কথাই না হতো। ১০/১৫ বছর যেতে হবে না। বর্তমান সময়ের তরুণ-তরুণীদের অনেকেই সিনেমা হলে যায় না। সিনেমা হলটা আসলে কেমন? এব্যাপারেও অনেকের ধারনা নেই। কারণ তারাতো সিনেমা দেখে মোবাইল ফোনে। অনেকের কাছে মোবাইল ফোনই সিনেমা হল।

আতংকের বিষয় হলো এরা দেশীয় সিনেমার প্রতি মোটেই অনুরক্ত নয়। এদের ধারনাটাই এমন দেশের সিনেমা ভালো নয়। বেশ কয়েকজন তরুণকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, শেষ কবে বাংলাদেশের সিনেমা দেখেছো? সরাসরি উত্তর, বাংলাদেশের সিনেমা দেখি না। কেন দেখো না? প্রশ্ন করতেই উত্তর মিলেছে, বাংলাদেশের সিনেমা ভালো না। বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটক দেখো? প্রশ্ন করতেই কেউ কেউ সরাসরি উত্তর দিল, বাংলাদেশের টিভি নাটক দেখার মতো হয় নাকি? গৎবাঁধা কাহিনী। একই তারকার উপস্থিতি। ভালো লাগে না। কোন নাটক দেখে তোমার ভালো লাগেনি? প্রশ্ন করেছি। কিন্তু কেউই নাটকের নাম বলতে পারেনি। অনেকটা চিলে কান নেয়ার মতো অবস্থা। কেউ একজন বলেছে চিলে কান নিয়ে গেছে। সাথে সাথে সবাই কানের পিছনেই ছুটতে শুরু করলো। কার কান চিলে নিয়ে গেছে এব্যাপারে কারও ধারনা নাই। তবুও ছুটছে।
সেরকম আমরাও চিলে কান নিয়ে গেছে এই মানসিকতায় শুধুই ছুটছি। অভিযোগের পর আিভযোগ। আমাদের নাটক ভালো নয়, সিনেমা ভালো নয়, গান ভালো নয়। তাই অন্যের মানহীন নাটক, সিনেমা ও গানের দিকে ঝুকছি। একবারও ভাবছি না এতে করে নিজেদের কী ক্ষতিটা হচ্ছে! ধরে নিলাম, আমাদের নাটক, সিনেমা, গান কোনোটাই ভালো নয়। এব্যাপারে কী প্রতিবাদ করেছি আমরা? এফডিসি খা খা মরুভ‚মি হয়ে পড়ে থাকে। যেখানে এক সময় রাত দিন সিনেমা নির্মাণের ব্যস্ততা ছিল সেখানে এখন প্রকাশ্য দিবালোকেও খা খা মরুভ‚মির মতো অবস্থা বিরাজ করে। কেন করে? আমরা কি এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি। কত কিছুর জন্যই তো আমরা আন্দোলন করি। ভালো সিনেমা দেখতে চাই। এ নিয়ে কী কোনো আন্দোলন হয়েছে? এক সময় চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন বেশ জোরদার ছিল। এখনও দুই একটি সংসদ সক্রিয় আছে। তারা কি একবারও ‘ভালো চলচ্চিত্র চাই’ এই দাবী নিয়ে আন্দোলন করেছে?
ধরে নিলাম আমাদের টিভি নাটকও ভালো হয় না। কেন ভালো হয় না এব্যাপারে কেউ কি খোঁজ নিয়েছি? দেশের অধিকাংশ টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞানের মাঝে টিভি নাটক প্রচার করা হয়। যা বেশ বিরক্তিকর। বাংলাদেশের টিভি নাটকের অগ্রগতির ক্ষেত্রে এই প্রবনতা ভালো নয়। দর্শকদের কী এব্যাপারে কোনো দায় নাই? একবারও কী দাবী উঠেছেÑ টিভিতে ভালো নাটক দেখতে চাই। বিজ্ঞাপনের জন্য নাটক নয়, নাটকের জন্য বিজ্ঞাপন চাই। এই দাবী কি উঠেছে কোথাও? না উঠেনি। আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছি। নিজেদের নাটক না দেখেই বলি নাটক ভালো হয় না। সিনেমা না দেখেই বলি সিনেমা ভালো হয় না। গান না শুনেই বলি আমাদের গানও সুবিধের নয়। তাই বলে কী আমরা থেমে আছি? নাটক, সিনেমা দেখছি না? গানও কী শুনছি না? হ্যা নাটক, সিনেমা দেখছি। গানও শুনছি। তবে নিজেদেরটা নয়। অন্যেরটা দেখছি। পাশের দেশের নাটক, সিনেমা, টিভি অনুষ্ঠান আমাদের অনেকের কাছে অনেক প্রিয়। পাশের দেশের কোনো রিয়েলিটি শো নিয়ে আমাদের এখানে যে রকম তোলপাড় শুরু হয় তার ছিটেফোটাও হয় না নিজেদের কোনো কাজ নিয়ে। এ অবস্থা যদি চলতেই থাকে তাহলে আমাদের নাটক, সিনেমা, সঙ্গীতের ভবিষ্যৎ কী?
প্রিয় পাঠক, বিষয়টি ভাববেন আশাকরি। শেষে একটি নিবেদন করি। এই ঈদেও দেশের প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। ঈদে নাটক, সিনেমা, গানের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আরও অনেক বাহারী অনুষ্ঠান প্রচার হবে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। একটি অনুরোধ করি। এবারের ঈদে আমরা যদি অন্যদেশের টিভি চ্যানেলের দিকে না ঝুকি তাহলে খুব কী ক্ষতি হবে? আসুন না এবারের ঈদে নিজেদের টিভি চ্যানেল সমূহের অনুষ্ঠান দেখার জন্য নিজের দেশেই থাকি। তারপর না হয় ভালো-মন্দ সমালোচনা করব। অনুরোধটা রাখবেন আশাকরি।