Home প্রতিবেদন ইফতারের আগে হাত ধুয়ে হও নিরাপদ

ইফতারের আগে হাত ধুয়ে হও নিরাপদ

SHARE

আরাফ খুবই চঞ্চল। এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। একটি অংক কষতে পড়ার টেবিল থেকে কম করে হলেও দশবার উঠে। খাবার খাওয়ার সময়তো কতবার এদিক ওদিক দৌঁড়ে পালায় তার হিসেব নেই। ইদানিং আরাফ নিজের হাত দিয়ে খেতে শুরু করেছে। নিজের হাতে খাওয়া শুরু করার পর থেকে প্রায়ই সে অসুস্থ থাকে। মা বাবা এর কারণ খুঁজে পান না। প্রতিদিনতো আরাফকে ঘরে বানানো বিশুদ্ধ খাবার দেয়া হয় তবে কেন ওর কখনও জ্বর, সর্দি, কাঁশি, আবার কখনও পেট ব্যথা, ডাইরিয়া দেখা দিচ্ছে? মা আরাফকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার আরাফকে জিজ্ঞেস করলেন- খাবার খাওয়ার আগে কি তুমি হাত পরিস্কার করে ধুয়ে নাও? আরাফ বলে হ্যাঁ।

হাত কি দিয়ে পরিস্কার কর?

কেন পানি দিয়ে।

কোনো এন্টিসেপ্টিক সাবান ব্যবহার করো না?

এবার আরাফ একবার মায়ের দিকে, একবার ডাক্তারের দিকে তাকায়। ডাক্তার মুচকি হেসে বলেন, বুঝতে পেরেছি। ওর ঘন ঘন অসুখের একমাত্র কারণ হলো খাওয়ার আগে এন্টিসেপ্টিক সাবান দিয়ে হাত পরিস্কার না করা। খেলাধুলা করার সময় অথবা স্কুলের অপরিস্কার টেবিল চেয়ারে হাত রাখা অথবা কুকুর বিড়াল সহ পোষা প্রানীর সংস্পর্শে জীবানু হাতে লেগে যায়। এন্টিসেপটিক সাবান দিয়ে হাত না ধোয়ার কারনে সেই জীবানু হাত হয়ে চলে যায় পেটে। তারপর শুরু হয় নানা অসুখ।

মা বলেন, ডাক্তার সাহেব আমি আরাফকে খাওয়া শুরুর সময় থেকে সাবান দিয়ে হাত পরিস্কারের অভ্যাস করিয়েছি কিন্তু…।

এবার ডাক্তার বললেন, আপনারা স্বামী-স্ত্রী চাকরি করার কারনে আরাফকে কাজের লোকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়। কাজের লোক ব্যসৱ থাকায় খাবারের সময় আরাফ সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে খায় কিনা এটা ওরা খেয়াল করে না। আপনার করণীয় হলো বাসায় থাকলে খাবারের আগে ওর হাত ধুয়ে দিবেন। অফিসে থাকলে খাওয়ার সময় ফোন করে হাত ধোয়ার কথা বলবেন। আরাফ যাতে কখনো সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে খাবার খায় সেই ব্যাপারে আপনাকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শে গত দুটি মাস মা নিয়মিত খাবারের আগে আরাফকে হাত ধোয়ার বিষয়ে সচেতন করেছেন। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকাসহ নানান বিষয়ে উদ্ধুদ্ধ করেছেন। এই দুই মাসে আরাফ একটি বারের জন্যও অসুস্থ হয়নি। তাই আরাফের মা এখন ছেলেকে নিয়ে বেশ নিশ্চিনৱ।

প্রতি বছর রমজান মাসে আরাফদের বাসায় ইফতার পার্টি হয়। এবারও জমজমাট এক ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। বাবার সঙ্গে আরাফ মেহমানদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল। টেবিলে সবাই ইফতারের জন্য বসার পর আরাফ হঠাৎ চেয়ারে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বলতে শুরু করে। আপনারা নিশ্চয় জানেন, খাবারের আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া খুবই জরুরি। ডাক্তার আংকেল বলেছেন, সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে খাবার খেলে অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৯৯ ভাগ। তাই আসুন ইফতারের আগে আমরা সবাই সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেই। আরাফের এমন আহ্বানে সবাই করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানায় এবং সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ইফতার করে।

প্রিয় পাঠক, আরাফের মতো এমন সচেতনতা যেন পবিত্র এই রমজানে সবার মাঝে গড়ে উঠে। দেশের সব শিশু কিশোররা যেন সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠে। আসুন জেনে নেয়া যাক সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে এই গরমে খাবার খেলে এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন না থাকলে কি ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। সেই সঙ্গে জেনে নিন এর সঠিক সমাধানও।

সাবান দিয়ে হাতনা ধুয়ে খাবার খাওয়ার ফলে শিশুর যে সব মারাত্মক অসুখ হতে পারে তার মধ্যে আছে ডাইরিয়া, জ্বর, কাশি, গলা ব্যাথা, পেট ব্যাথা সহ নানান অসুখ। যেমন এই গরমে সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে খাবার খেলে শিশুর মারাত্বক ডাইরিয়া হতে পারে। আমাদের দেশে গরম কালে ডাইরিয়ার প্রকোপ দেখা দেয় সবচেয়ে বেশি। ডাইরিয়ার জীবানু ঘরবাড়ি আসবাব পত্রসহ নানান জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। শিশুরা খেলা ধুলা করতে গিয়ে হাতে ধুলাবালির সাথে ডাইরিয়ার জীবানু হাতে লেগে যায়। সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে খাবার খাওয়ার ফলে ডাইরিয়ার জীবানু সরাসরি চলে যায় পেটে। শুধু কি শিশুরা এই সমস্যা ভোগে? ঠিক তা নয়। বড়দেরও এই সমস্যা হতে পারে।

হাত না ধুইয়ে খাবার খেলে মারাত্বক জ্বর হতে পারে। জ্বরের সঙ্গে হতে পারে খিচুনি। জ্বর বেশি হলে ঠান্ডাও লেগে যেতে পারে। ঠান্ডার প্রকাপে কাঁশি, গলা ব্যাথা হতে পারে। নরম ও লিকুইড খাবার না খেলে পেট ব্যাথা হতে পারে। এসব সমস্যা হলে খুব তাড়াতাড়ি শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিৎ।

অনেক সময় ডাইরিয়া, গলা ব্যাথা, কাশি পেটের ব্যথা, জ্বর না হয়ে অবসাদগ্রন্থ হয়ে পড়ে। মুখে অরুচি, শরীর দুর্বল, স্কুলে যেতে অনীহা এমন কী শিশুরা খেলাধুলাও করতে চায়না। আগামীর ভবিষৎ শিশুরা মারাত্বক এই সব রোগ থেকে যাতে পরিত্রান পেতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এখনই নেয়া উচিৎ।

রোজার এই সময়ে শিশুরা বাবা মার সঙ্গে ইফতার করতে সবচেয়ে বেশি আনন্দবোধ করে। তাই সাবধান থাকতে হবে যাতে শিশুরা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে যেন খাবার না খায়। শুধু শিশুরা কেন বড়দেরও উচিত ইফতারের সময় হাত সাবান দিয়ে ভালো ভাবে ধুয়ে নেয়া।

বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু হাত ধোয়ার ফলে পেটের পীড়া কমে ৩৯ ভাগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগবালাই কমে ৫০ ভাগ।  অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, খাবার ও পানির মাধ্যমে যেসব রোগ ছড়ায়, তার প্রতি চারজনের একজন আক্রানৱ হন শুধু মাত্র সময়মতো হাত না ধোয়ার কারণে। হাত না ধুলে জীবাণুরা আমাদের নাজুক দেহে হামলা শুরু করে আর আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দপতন ঘটে নেমে আসে ভোগানিৱ। তার চেয়ে হাত ধোয়ার মতো সহজ অভ্যাসটুকু গড়ে তুললে সব ভোগানিৱ আর রোগবালাই থেকে মুক্ত থাকতে পারি আমরা।

হাত ধোয়া এত জরুরি জেনেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় মুহূর্তে মানুষের হাত ধোয়ার হার শূন্য থেকে ৩৪ শতাংশ। হাত ধোয়া শিশুদের জন্য খুবই জরুরি। প্রতিবছর পাঁচ বছরের নিচের ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন শিশু ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় মারা যায়। শিশুরা যদি হাত ধোয় এবং শিশুদের খাবার তৈরি করতে যদি অভিভাবকরা হাত ধুয়ে নেন, তবে এ মৃত্যু ২৫ শতাংশ কমানো যায়। পাকিসৱানে এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাত ধোয়ার ফলে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের রোগ অর্ধেক কমে গেছে। হাত ধোয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয় ডায়রিয়া পরিস্থিতির। বিশ্বজুড়ে সঠিক নিয়মে হাত ধুলে ডায়রিয়াজনিত শিশুমৃত্যু অর্ধেকে নেমে আসবে। শুধু সময়মতো হাত ধুলেই শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার উদ্যোগ সফল হবে।

নিয়মিত হাত ধুলে কৃমি, বিশেষ করে এসকেরিয়াসিস ও ট্রাইচুরিয়াসিসের সংক্রমণ কম হয়। হাত ধুলে চোখের রোগ গ্লুকোমা এবং ত্বকের রোগ ইমপেটিগো কম হয়। যাঁরা খাদ্য বিক্রি, সরবরাহ ও রান্না করেন, তাঁদের হাত পরিষ্কার রাখা খুবই দরকার। কারণ, তাঁদের মাধ্যমে রোগ জীবানু ছড়াতে পারে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবিকাদেরও হাত ধোয়া খুবই জরুরি। হাত ধোয়া বেশি প্রয়োজন, যখন আমরা শিশুর জন্য খাবার বানাই ও খাবার খাই তার আগে। যখন আমরা কোনো অসুস্থ মানুষের কাছে যাই, তার পরিচর্যা করি, শিশুদের পরিচর্যা করি, সেখান থেকে এসে খাবারের আগে অবশ্যই হাত ধুতে হবে। আবার মলমূত্র ত্যাগের পর, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার, বাইরে বেড়াতে যাওয়া, অফিস থেকে আসা, হাঁচি-কাশি দেওয়া, অসুস্থ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসার পর হাত ধোয়া অতি জরুরি। ক্ষত ধোয়া, জীবজন্তু ঘরে পোষা হলেও তাদের ধরার পর হাত ধুতে হবে। শিশুদের মলমূত্র পরিষ্কারের পরও হাত ধোয়া জরুরি। হাত ধোয়ার কিন্তু কিছু নিয়ম আছে। শুধু পানি দিয়ে হাত ধুলে বাহ্যিকভাবে পরিষ্কার হয় সত্যি, কিন্তু জীবাণুমুক্ত হয় না। জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর সাবান, লিকুইড সোপ ও হ্যান্ড রাব বেশি কার্যকর। হাসপাতাল ছাড়া সাধারণ গৃহস্থালি, অফিস-আদালতে হাত জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য সাবান বা লিকুইড সোপ দিয়ে হাত ধুলেই চলে। লিকুইড সোপ নিলে প্রতিবার হাত ধোয়ার সময় অনৱত তিন মিলিলিটার নেওয়া উচিত। প্রথমে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে হাত ভিজিয়ে এর পর সাবান বা লিকুইড সোপ হাতের কব্জি পর্যনৱ মাখানো উচিত। এর পর হাতের উভয় পাশে, আঙুলের ফাঁকে, নখের চারপাশে ও ভেতরে অনৱত ১০ সেকেন্ড ঘষা উচিত। এর পর পানির স্রোতধারায় (জমানো পানির চেয়ে প্রবহমান পানি বেশি কার্যকর) হাত দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা উচিত। হাত ধোয়ার পর পরিষ্কার টাওয়াল দিয়ে হাত আলতো করে মুছতে হবে। মোছার সময় ঘষামাজা না করাই ভালো, এতে ত্বকের ক্ষতি হয়। আসলে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া হলো সুস্থ থাকার সবচেয়ে সহজ উপায়। আমরা সুস্থ থাকার জন্য অনেক নিয়ম মানি, অনেক কিছু খাই, চিকিৎসকের কাছে যাই। অথচ সুলভ মূল্যের একটি সাবান কিনলে আর একটু সচেতন হলে আমরা অনেক নীরোগ থাকতে পারি।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়রিয়া কমাতে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা স্থাপন, রোটা ভাইরাস ভ্যাকসিন কার্যক্রম পরিচালনা এবং শিশু ডায়রিয়া আক্রানৱ হলে সরকারের যে চিকিৎসা ব্যয় হয়, তার চেয়ে অনেক অর্থ কম খরচ হবে যদি জাতীয়ভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়া যায়। তাই যেকোনো দেশের সরকারের জন্যই হাত ধোয়ার ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করা এবং এ-সংক্রানৱ পদক্ষেপ নেওয়া একটি জরুরি, কার্যকর ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থা।

সমাজের সর্বসৱরের মানুষের উচিত সঠিক নিয়মে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারে নিজে সচেতন হওয়া এবং অন্যদের সচেতন করা।

হাত না ধুলে যে বিভিন্ন অসুখ হয় তাই নয়, অসুখে ভুগলে শারীরিক ভোগানিৱ তো আছেই, তার সঙ্গে মানসিক কষ্ট, ক্লানিৱ ভাব, স্কুল কামাই, কাজে ব্যাঘাত, ডাক্তার দেখানো, ওষুধ খাওয়া, এতে প্রচুর অর্থের অপচয় এগুলোও আছে। তার চেয়ে স্বল্প টাকায় একটি সাবান কিনে হাত ধোয়ার অভ্যাস করলে কী বা এমন ক্ষতি!