Home শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমি আমানতঃ একজন শিক্ষাবিদ ও পূরকৌশলীর কথা

আমানতঃ একজন শিক্ষাবিদ ও পূরকৌশলীর কথা

SHARE

অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত। বাংলাদেশের খ্যাতিমান একজন শিক্ষাবিদ ও স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বিশেষজ্ঞ। দীর্ঘ তিন দশক ধরে শিক্ষাবিদ হিসেবে পাঠদান ও গবেষণার পাশাপাশি ভৌত স্থাপনার নকশা, নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষানবেক্ষণে পরামর্শক হিসাবে কাজ করে চলেছেন। ১৯৯১ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করার পর পরই তিনি লেকচারার হিসেবে বুয়েটের সিভিল

ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যোগ দেন। ১৯৯৩ সালে বুয়েট থেকে তিনি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স সম্পন্ন করেন । ১৯৯৭ সালে তিনি জাপানের নাগোয়া ইউনিভার্সিটি থেকে কংক্রিট টেকনোলজির ওপর গবেষণা করে পিএইডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। যুক্তরাজ্য এবং কানাডা থেকে তিনি পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ করেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের তিনি আজীবন ফেলো। এছাড়াও এদেশে বাজারজাত ও উৎপাদিত বিভিন্ন পন্যের মান নিয়ন্ত্রনকারী জাতীয় সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (BSTI) এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করছেন। এবার শাহ সিমেন্ট সুইট হোমে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক
অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানতের জন্ম ঢাকায় হলেও স্কুল জীবন কেটেছে মূলতঃ পৈত্রিক নিবাস খুলনায়। বাবার নাম আমান উল্লাহ খান। তিনি পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। মা মাহমুদা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। দুই ভাইয়ের মধ্যে আমানত বড়। ছোট ভাই খান মাহমুদ হাসানাত একজন স্থপতি। ছোটবেলা থেকেই আমানত প্রকৌশলী হবার স্বপ্ন দেখতেন। হয়েছেনও সফল। নিজের আগ্রহ থেকেই প্রকৌশলী হওয়া তার। খুলনা সেন্ট জোসেফ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন ১৯৮২ সালে। ১৯৮৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৯১ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করেই লেকচারার হিসেবে যোগ দেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৯৩ সালে বুয়েট থেকেই মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দেন জাপানে। ১৯৯৭ সালে জাপানের নাগোয়া ইউনিভার্সিটি থেকে কংক্রিট প্রযুক্তির উপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর দেশে ফিরে এসে তিনি আবার শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নানা বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিচ্ছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্য এবং কানাডায় গবেষণা কার্যক্রমে অংশ গ্রহন করেছেন। কংক্রিটের পুনর্ব্যবহার যোগ্যতা, পুরাতন কংক্রিট স্থাপনার পর্যাপ্ত সুরক্ষার মান নির্ণয়, ভুমিকম্প সহনীয় স্টিল ও কংক্রিট স্থাপনা নির্মাণ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় ধরনের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ তিন দশকের কর্ম জীবনে অধ্যাপক আমানত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে কংক্রিট এবং ইস্পাত স্থাপনা সম্পর্কিত আশিটিরও বেশী বিভিন্ন গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। যার মধ্যে কয়েকটি আইইবি বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ডস লাভ করে। তিনি তিরিশটিরও অধিক স্নাতকোত্তর থিসিস তদারকি করেছেন – যার মাধ্যমে মাস্টার্স এবং পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাঠ্যক্রমের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে তিনি অত্যন্ত সক্রিয়। তার উদ্যোগ ও সক্রিয়তায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রথম ও দ্বিতীয় কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়। এছাড়া বিভাগীয় বিভিন্ন কোর্সে কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তি অন্তর্ভূক্ত করার ব্যাপারে তিনি অবদান রেখেছেন। কংক্রিট এবং স্টিল উভয় ধরনের কাঠামোযুক্ত ভবন ও স্থাপনা ডিজাইনে তিনি পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। এক দশক আগেও বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পাঠ্যক্রম ছিল মূলতঃ কংক্রিট স্থাপনা কেস্ট্রিক। উন্নত বিশ্বের ন্যায় এদেশে স্টিল স্থাপনা নির্মাণ শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি বিভাগীয় পাঠ্যক্রমে স্টিল স্ট্রাকচার এর উপর পূর্নাঙ্গ কোর্স সংযোজনে অগ্রনী ও উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন যা ২০১২ সাল থেকে পড়ানো হচ্ছে। এই বিষয়ে তার তৈরী লেকচার নোট বুয়েট সহ বাংলাদেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুসৃত হয়। স্নাতকোত্তর পর্যায়েও তিনি স্টিল স্ট্রাকচার ডিজাইনের উপর আধুনিক ও বিশেষায়িত কোর্স সংযোজন করেছেন। এছাড়া সেতু ও অনুরূপ স্থাপনা বিষয়েও তিনি লেকচার দিয়ে থাকেন।

অধ্যাপক আমানত বর্তমানে জাতীয় মাননিয়ন্ত্রক সংস্থা বি,এস,টি,আই এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে অনেক প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ত্ব পালন করছেন। যেমন, ২৪ কিলো মিটার দীর্ঘ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপেসওয়ে, ঢাকা সাবওয়ে প্রকল্প, ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প ইত্যাদি। এছাড়াও বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরামর্শক হিসেবে ছোট-বড় প্রায় ১২৫টির মতো প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বি,এন,বি,সি ২০২০) হল এদেশের সকল সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও নির্মাণ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য একটা অতীব গুরুত্ত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক ভাবে অনুসরনীয় দলীল। আধুনিক, পরিবেশ বান্ধব, ভূমিকম্প সহনীয়, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই ভবন ডিজাইন ও নির্মাণের জন্য এর কোনো বিকল্প নাই। বি,এন,বি,সির হাল নাগাদ ও পুর্নলেখনের কাজে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যত অবকাঠামোগত উন্নয়নে বি,এন,বি,সির গভীর ও সুদূর প্রসারী প্রভাব বিবেচনায় এর হালনাগাদ ও পুর্নলেখনের কাজ তার পেশা জীবনে একটি অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়। এছাড়া বঙ্গবন্ধু সেতুর ফাটলের কারণের অনুসন্ধান এবং প্রতিকার নিরূপন, ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কের মেঘনা ও মেঘনা গোমতি সেতুর মেরামত ও পুর্নবাসন, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্পের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পঞ্চবটী-মুক্তারপুর সেতু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকায় অবস্থিত ৩৭ তলা সিটি সেন্টার ভবন, ২০ তলা পিপলস ইন্সুরেন্স ভবন, ২০ তলা নির্মাণধীন পিকেএসএফ ভবন, চট্টগ্রামে ৩২ তলা আজিজ কোর্ট ইম্পোরিয়াল ভবন, ২০ তলা মেঘনা ভবন সহ আরো বহু তল ভবন, বিভিন্ন মোবাইল সেবা দাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত সূউচ্চ মাইক্রোওয়েভ টাওয়ার, পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ডের অধীনে নির্মিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সূউচ্চ রিভার ক্রসিং টাওয়ার, সড়ক ও জনপথ বিভাগ নির্মিত শেখ লুৎফর রহমান সেতু (পাটগাতি সেতু), সুনামগঞ্জে সুরমা সেতু, বরিশাল-পটুয়াখালি সড়কে পায়রা সেতু, কক্সবাজারে এলজিইডি নির্মিতব্য বাকখালি সেতু, রূপগঞ্জে মুরাপাড়া সেতু, পটুয়াখালিতে লোহালিয়া সেতু সহ আরো অনেক প্রকল্প।

একজন দেশ প্রেমিক প্রকৌশলী হিসাবে ড. আমানত মনে করেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য এদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং এর পরিচালনে অধিকতর শৃংখলা আনা আবশ্যক। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে বিরাজমান সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি রেল যোগাযোগেও অনেক উন্নয়ন আবশ্যক। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে। তিনি মনে করেন সরকারের এই বিষয়ে আরো গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি রেল যাত্রী সেবার মান উন্নয়নেও আরো বেশী নজর দেয়া দরকার। তিনি বিশ্বাস করেন, এ ব্যাপারে যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহন করলে, অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাতাল রেলে আধা ঘন্টার মধ্যেই নিশ্চিত ভাবে পৌছে যাওয়া যাবে, দ্রুত গতির ট্রেনে ঢাকা থেকে দেশের যে কোন দূর প্রান্তে তিন/চার ঘন্টার মধ্যেই পৌছানো যাবে। অনুন্নত দেশের তকমা ঝেড়ে ফেলে বাংলাদেশ এখন আনুষ্ঠানিক ভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশের পথে আছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতে সেটাও পার হয়ে এক সময় বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে যাবে।

অধ্যাপক আমানত ১৯৯৫ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম সুমানা জামান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এই দম্পতি দুই কন্যা সন্তানের জনক-জননী। বড় মেয়ে আমান্তা বুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে ও ছোট মেয়ে আরিথা দ্বাদশ শ্রেনীতে অধ্যয়নরত। এই শিক্ষাবিদ ও প্রকৌশলী তার কাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করতে ভালোবাসেন। নিজের পেশায় দায়বদ্ধ থেকে সেটাকে সততার সঙ্গে শেষ করতে চান।