Home আরোও বিভাগ আমাদের মিডিয়ায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা

আমাদের মিডিয়ায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা

SHARE

সৈয়দ ইকবাল
শিল্পী অনিমা রায় হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ তারকা সময়ের ব্যাপক আলোচিত শিল্পী কোনালের কান্নাও থামানো যাচ্ছিলো না। সঙ্গীতগুরু সুবীর নন্দীর মৃত্যুতে তারা মুষড়ে পড়েছেন। অনিমা রায় তো বুক চাপড়ে বলছিলেন আমাদের একজন প্রিয় অভিভাবক চলে গেল। কে এখন আমাদেরকে ধরে ধরে গান শেখাবে? গুরুর প্রয়ানে শোকে মুহ্যমান কোনাল তো ভালো করে কথাই বলতে পারছিলেন না।
সংস্কৃতি চর্চা যারা করেন তারা প্রথম জীবনে কারও না কারও হাত ধরে এগুতে থাকেন। বিশেষ করে সঙ্গীতে গুরুর দীক্ষা না পেলে তো কাজের কাজ কিছুই হয় না। নাটক, সিনেমার ক্ষেত্রেও তাই। প্রয়াত নায়করাজ রাজ্জাক সিনেমায় পা রেখেছিলেন মূলত জহীর রায়হানের হাত ধরে। জীবদ্দশায় তিনি বারবারই গুরু জহীর রায়হানের অবদানের কথা বলে গেছেন।
এইতো কয়েকদিন আগে চ্যানেল আই ভবনে গুরু শিষ্যের একটি চমৎকার সম্মিলন ঘটেছিল। একই অনুষ্ঠানে গুরু বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও শিষ্য আঁখি হালদারের অডিও সিডি প্রকাশ হলো। অনুষ্ঠানে গুরু রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা তাঁর শিষ্য আঁখির সঙ্গীত জীবনের অনেক সাফল্য কামনা করলেন। পাশাপাশি শিষ্য আঁখি হালদার তার গুরু রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সবার কাছে আশির্বাদ চাইলেন। গুরু-শিষ্যের এক মিলন মেলা হয়ে ওঠে সেদিনের অনুষ্ঠানটি।
প্রয়াত চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেনও গুরু মানতেন জহির রায়হানকে। জহির রায়হানের সঙ্গে সিনেমায় কাজ করেছেন আমজাদ হোসেন। সিনেমা পরিচালনার খুটিনাটি সবকিছুই শিখেছেন তিনি জহির রায়হানের কাছ থেকেই। জহির রায়হানের একাধিক ছবিতে আমজাদ হোসেন সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। সিনেমা পরিচালনা করা, সিনেমায় গল্প বলার ধরণÑ সবকিছুই আমজাদ হোসেন জহির রায়হানের কাছ থেকে শিখেছেন। আবার আমজাদ হোসেনের কাছ থেকে বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় নির্মাতা এসএ হক অলিক শিখেছেন অনেক কিছু। মূলত আমজাদ হোসেনের হাতেই নির্মাণ বিষয়ে হাতে খড়ি অলিকের। তাই তো এসএ হক অলিক আমজাদ হোসেনকেই গুরু মানেন। আর আমজাদ হোসেন গুরু মানতেন জহির রায়হানকে।
গুণী নির্মাতা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর দুই যোগ্য শিষ্য অনিমেষ আইচ ও নুরুল আলম আতিক। দুজনই পরিচালক হিসেবে দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। তারপরও তাদের গুরু নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু কোনো কাজে ডাকলেই ছুটে আসেন তারা। গুরুর সাথে সহকারী হিসেবে কাজ করেন এখনো। যেকোনো প্রয়োজনে গুরু তাদেরকে স্মরণ করলে নিজের সব কাজ বাদ দিয়ে এখনও গুরুর পিছনেই ছোটেন।
বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার এহতেশাম এর হাত ধরে অনেক অভিনয়শিল্পীর আগমন ঘটে ঢাকাই চলচ্চিত্রে। তাদের মধ্যে রয়েছেন শাবানা, নাঈম-শাবনাজ ও শাবনূর। গুণী এই চার অভিনয়শিল্পী ঢাকাই চলচ্চিত্রে শুধু ব্যবসা সফল ছবিই উপহার দেননি, তারা আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গণে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন এখনো ।
দুজনেই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা। তবে অনেকেই জানেন না জাহিদ হাসাস গুরু মানেন কাকে? সময়টা নব্বই দশক। জাহিদ হাসান তখন টগবগে তরুণ, বয়স তেইশ ছুঁই ছুঁই। অভিনয় করতে হবে, কিন্তু সুযোগ কে দিবে? অভিনয় তো শিখতে হবে, কে শেখাবে? এভাবেই একদিন চোখে পড়লো নাটকের দল নাট্যকেন্দ্রের কর্মশালার একটি বিজ্ঞপ্তি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা তারিক আনাম খান। জাহিদ হাসানের পছন্দের অভিনয়শিল্পী ও নির্দেশক তিনি। তার সঙ্গে দেখা হলো কর্মশালার প্রথম দিনে। মুখোমুখি বসে তারিক আনাম খান তার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। সেই থেকে শুরু। জাহিদ হাসান ‘বিচ্ছু’ নাটকের নাম ভূমিকায় অভিনয় করতেন। বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল নাটকটি। এরপর একে একে টিভি নাটক করতে থাকেন তিনি। একসময় টিভি নাটকের সাফল্যের শীর্ষে চলে যান তিনি। জাহিদ হাসানের হাত এখনো ছাড়েননি তারিক আনাম খান। এখনো দেখা হলে দুজন দুজনার সঙ্গে নিজেদের ভুল ত্রæটি শেয়ার করেন। এখনো জাহিদ হাসান গুরুর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘গুরু আমার কিছু হচ্ছে?’। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দুজনের মধ্যে আত্মার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পারিবারিক বিভিন্ন উপলক্ষে একে অপরকের স্মরণ করেন। এখনো শুটিংয়ের ফাঁক আড্ডা দেন। এই ‘বিচ্ছু’ নাটকে আরো অভিনয় করে রাতারাতি তারকা বনে গেছেন তৌকির আহমেদ ও মোশাররফ করিমও। মূলত এই ‘বিচ্ছু’ নাটক করেই ঢাকার নাটকে আলোচিত হন তারা। পরবর্তীতে তারা টিভি নাটকে অভিনয় করেন। তৌকির আহমেদ ‘রূপনগর’ ও মোশাররফ করিম ‘ক্যারাম’ নাটকটিতে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
টিভি ও মঞ্চনাটকে গুণী অভিনেতা ও নির্মাতা মামুনুর রশীদের হাত ধরে আজিজুল হাকিম, শান্তা ইসলাম, বন্যা মির্জা, চঞ্চল চৌধুরী, বৃন্দাবন দাস, আখম হাসান, ফজলুর রহমান বাবু, সালাহউদ্দিন লাভলুসহ একঝাক তারকার আগমন ঘটে মিডিয়ায়। তারা সবাই মামুনুর রশীদকেই গুরু বলে মানেন।
ঢাকাই ছবিতে বেশ চমক এবং আলোচিত জুটি সালামান শাহ ও মৌসুমীকে নিয়ে আসেন সোহানুর রহমান সোহান। মৌসুমী এখনো সোহানুর রহমান সোহানকেই গুরু মানেন। মৌসুমীকে অভিনয়ের নানান দিক নিয়ে সেই সময়ে টিপস দেয়া, নাচ শেখানো সহ সব বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলেন তিনি।
১৯৯৭ সালের গল্প। পূর্ণিমা তখন সবে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। পরিচালক জাকির হোসেন রাজু ‘এ জীবন তোমার আমার’ সিনেমার জন্য মিষ্টি চেহারা খুঁজছেন। পরিচালকদের একজন খবর দিলেন পূর্ণিমার। তারপর তো নায়িকা করে নিলেন নিজের সিনেমায়। পূর্ণিমাকে অভিনেত্রী বানানোর পেছনে রাজুর অবদান সবচেয়ে বেশি। প্রথম থেকে গ্রæমিং, নাচ শেখানো, অভিনয়ের ভাবভঙ্গি সবই তার তত্ত¡াবধানে হয়েছে। রাজুর পরিচালনায় পূর্ণিমা মাত্র তিনটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। একদিন ফেসবুকে জাকির হোসেন রাজু একটি গল্প শেয়ার করেছিলেন। ‘একদিন এফডিসির ৮ নাম্বার ফ্লোরে ‘চ্যানেল আই সেরা নাচিয়ে’ এর শুটিং করছিল পূর্ণিমা। আমি ভিড় ঠেলে এক কোণায় গিয়ে দাঁড়ালাম। স্টেজে তখন ফেরদৌসও। পূর্ণিমা আমাকে দেখতে পেয়েই ‘কাট’ বলে চিৎকার করে উঠল। ক্যামেরা বন্ধ হলে দৌড়ে এসে আমাকে স্টেজে নিয়ে গেল। সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বরল, ‘এই যে মানুষটিকে দেখছেন, এই মানুষটির জন্যই আমি আজকের পূর্ণিমা। তাঁর জন্যই আজ এই বিচারকের আসনে বসার সুযোগ পেয়েছি।’
চিত্র নায়িকা মাহিয়া মাহির ক্যারিয়ারের প্রথম দুটি ছবির পরিচালক শাহিন-সুমন। কিভাবে সংলাপ বলতে হয়, সহশিল্পীকে কিভাবে কাউন্টার দিতে হয়, লাইট-ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল কী- সব কিছুই শিখিয়েছেন শাহিন-সুমন। তাদের প্রতি মাহি এখনো কৃতজ্ঞ। কাজের বাইরেও গুরু-শিষ্যের আলাদা সম্পর্ক রয়েছে। কাজের বাইরে ভালো বন্ধু তারা। মাহি বলেন, ‘ শাহিন ভাই সবসময়ই অপেক্ষায় থাকেন আমাকে কিভাবে পঁচাবেন। আর আমি অপেক্ষায় থাকতাম সুমন ভাইকে কিভাবে জ্বালানো যায়। এখনো জন্মদিন বা বিশেষ দিনে শাহিন ও সুমন ভাই উইশ করেন। জোর জবরদস্তি করে নানা সময়ে অনেক দামি গিফটও নিয়ে নেই। সিনেমায় তারাই আমার গুরু।’
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে একঝাক অভিশিল্পীর আগমন ঘটে আমাদের শোবিজে। শুধু তাই নয় অনেক অভিনয়শিল্পী আগে থেকে কাজ করলেও নন্দিত এই নির্মাতার সঙ্গে কাজ করার পর থেকেই পরিচিতি পেতে শুরু করেন। এবং তাকেই গুরু মানা শুরু করেন। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, ডা. এজাজ আহমেদ, ফারুক আহমেদ, লুৎফর রহমান জর্জ, মাহফুজ আহমেদ, রিয়াজ, মনিরা মিঠু, স্বাধীন সহ আরো অনেক অভিনয়শিল্পীই হুমায়ূন আহমেদের কল্যাণে নাটকের ভ‚বনে নাম করেছেন।
জাকির হোসেন রাজু নতুন মুখ নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করলেন। সাইমন তখন টঙ্গীতে, ব্যবসা করেন। রাজুর সহকারীর সঙ্গে তাঁর দেখা। তিনি রাজুর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দিলেন সাইমনকে। প্রথম দেখায়ই পছন্দ হলো রাজুর। শুরু হলো ট্রেনিং।
সাইমন জানান, ‘আমাকে নিয়ে অনেক প্রযোজকের কাছে গেছেন। নতুন বলে অনেকের কাছ থেকে ফিরে আসতেও হয়েছে। তিনি হাল ছাড়েননি। প্রথম দিকে নতুনদের যেসব সমস্যা হয়, আমারও হতো। শিল্পকলা একাডেমির কর্মশালায় পাঠায়। অলরাউন্ডার অভিনেতা হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছিলেন।’ রাজুর পরিচালনায় এ পর্যন্ত তিনটি ছবিতে অভিনয় করেছেন সাইমন। ‘জি হজুর’, ‘পোড়ামন’ ও ‘এর বেশি ভালোবাসা যায় না’- এই তিনটি ছবিতে সাইমন অভিনয় করেন এবং তিনটি ছবিই ব্যবসায়িক সফলতা পায়। সাইমন গুরু হিসেবে তাকেই মানেন এবং তিনি কখনো নিরাশ করেন তাকে।
ছটকু আহমেদের হাত ধরেই চলচ্চিত্রে এসেছেন মিশা সওদাগর। নায়ক ও খলনায়ক- দুই ধরনের চরিত্রেই তাঁকে সুযোগ দেন ছটকু আহমেদ। তাদের সম্পর্কটা বাবা-ছেলের মতো। ১৯৮৬ সালে এফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ থেকে চলচ্চিত্রে আসেন মিশা। প্রতিযোগিতার নায়ক ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ন হয়েও বছর খানেক পরিচালক ও প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছিল মিশাকে। একদিন মিশাকে ডেকে ছটকু বলেন, ‘বসে না থেকে আমার ছবি ‘অত্যাচার’- এ একটি আইটেম গান আছে সেটাতে অভিনয় করো।’ ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন সোহেল রানা ও ববিতা। মিশা সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। মিশার নাচ দেখে বিস্মিত হলেন পরিচালক ছটকু আহমেদ। নতুন এই অভিনেতার মধ্যে কোন জড়তা নেই। সেই থেকে গুরু-শিষ্যর সম্পর্ক শুরু হলো। ছটকুর প্রতিজ্ঞা ছিল যে করেই হোক ছেলেটাকে তারকা বানাবেন। পরের বছর মিশা, অমিত হাসান, খালেক ও ফিরোজকে নিয়ে নির্মাণ করণে ‘চেতনা’ ছবিটি। কিন্তু ছবিটি ব্যবসয়িকভাবে সফল হলো না। ছটকু মিশাকে পরামর্শ দেন খল চরিত্রে অভিনয় করার জন্য। মিশার ভাগ্য ফেরে ছটকু আহমেদের ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ ছবিটি দিয়ে। এই ছবিতে তার সংলাপ ‘এই বাবা ডায়লগ কম’ সেই সময়ে বেশ আলোচিত হয়। এরপর রাতারাতি ব্যস্ততম খলনায়ক বনে যান মিশা। অবশ্য ছটকুকে এর প্রতিদানও দিয়েছেন মিশা। নিজের প্রযোজিত একমাত্র ছবি ‘একজন প্রতিবাদী মাস্টার’ এর পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন।
গুণী নির্মাতা ও নির্দেশক আফজাল হোসেনের হাত ধরে আমাদের নাটকের ভ‚বনে এসেছে একঝাক অভিনয়শিল্পী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সজল, অপি করিম ও তানভীন সুইটি। এই তিন অভিনয়শিল্পীর ক্যারিয়ারে অনেক ভালো ভালো কাজ পেয়েছেন তাদের গুরু আফজাল হোসেনের কাছ থেকে।
নির্মাতা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী একঝাক নির্মাতা উপহার দিয়েছেন আমাদের মিডিয়ায়। তার হাত ধরে রেদওয়ান রনি, মোস্তফা কামাল রাজ, ইফতেখার আহমেদ ফাহমি, শরাফ আহমেদ জীবন, ইশতিয়াক রুমেল, গোলাম কিবরিয়া ফারুকী, নূর ইমরান মিঠু, আদনান আল রাজীব, কচি খন্দকার, ইমরাউল রাফাত, হিমেল আশরাফ সহ বেশকিছু নির্মাতা দাপটের সঙ্গে মিডিয়ায় কাজ করে যাচ্ছেন। ফারুকীর হাত ধরে একঝাক অভিনয়শিল্পীও মিডিয়ায় কাজ করছেন। যারমধ্যে রয়েছেন মারজুক রাসেল, মুকিত জাকারিয়া, জামাল উদ্দিন সহ অনেকে।
ক্যারিয়ারের শুরুতে অপূর্ব যে দু’জন মানুষের হাত ধরে মিডিয়াতে আসেন তারা হচ্ছেন গাজী রাকায়েত ও অমিতাভ রেজা চৌধুরী। অমিতাভ রেজার নির্দেশনায় ২০০৪ সালে ‘নেসক্যাফে’র বিজ্ঞাপনে মডেল হওয়ার মধ্যদিয়ে মিডিয়াতে অপূর্বর অভিযেক হয়। প্রথম বিজ্ঞাপনেই দর্শকদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেন তিনি। পরে গাজী রাকায়েতের নির্দেশনায় তিনি ‘বিয়ের গল্প’ নাটকে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে অভিনেতা হিসেবে টিভি নাটকের অঙ্গনে পা রাখেন। তবে অপূর্বর নাটকের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি অবদান চয়নিকা চৌধুরীর। যদিও এখন আর এই দুজনের কাজ একদমই হয় না, তারপরও একসময় অপূর্ব চয়নিকা চৌধুরীর নির্দেশনায় প্রচুর কাজ করেছেন। মূলত অপূর্ব যে রোমান্টিক হিরো সেটা চয়নিকার কাজ করেই দর্শক তাকে গ্রহণ করে নেয়।
হাল সময়ের আরেক ক্রেজ আফরান নিশোরও নাটকে অভিনয় শুরু হয় গাজী রাকায়েতের হাত ধরে। গাজী রাকায়েতই প্রথম নিশোকে নিয়ে নাটক নির্মাণ করেন। আজকের নিশোর যে ভার্সেটাইল অভিনয় প্রতিভা সেটা অবশ্য নির্মাতা সুমন আনোয়ারের হাত ধরেই হয়েছে। এক সময় নিশোকে নাটকে কেউ নিতেই চাইতো না। তখন সুমন আনোয়ার নিশোকে নিয়ে নানান ধরনের এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করিয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন সব চরিত্রে নিশোকে দাঁড় করানোর ফলে দর্শক তা গ্রহণ করতে শুরু করেন। তারপরই আস্তে আস্তে আজকের নিশোর তৈরি হয়ে ওঠে।
মীর সাব্বির নি:সন্দেহে জনপ্রিয় একজন অভিনেতা। এই অভিনেতার শুরুর দিকের গল্প খুব কষ্টের। ঢাকায় আসার পর গাজী রাকায়েত মীর সাব্বিরকে অভিনয়ের ব্যাপারে সকল প্রকার সহযোগিতা করেন। একদিন গাজী রাকায়েতের গাড়িতে বসে মীর সাব্বির বলেছিল, ‘গুরু আমার এরকম একটা গাড়ি হবে না জীবনে?’ তখনো জানতেন না মীর সাব্বির যে এতো জনপ্রিয় অভিনেতা হবেন। মীর সাব্বির এখনো গাজী রাকয়েতকেই তার নাটকের গুরু মানেন।
এখনা কোনো অনুষ্ঠানে কিংবা কোনো লেখায় জনপ্রিয় নাট্যকার মাসুম রেজা তার গুরু সেলিম আল দ্বীনের কথা তুলবেনই। ক্যারিয়ারের শুরুতে মাসুম রেজাকে প্রয়াত এই নাট্যগুরু অনেক সহায়তা করেছেন। নাটক লেখার সকল কলা কৌশল শিখিয়েছেন তিনি। এটা অবশ্য মাসুম রেজা স্বীকারও করেন অকপটে।
মঞ্চনাটকে এসএম সোলায়মানের হাত ধরে অনেক অভিনয়শিল্পীর আগমন ঘটেছে। এই গুণী মঞ্চ ব্যক্তিত্বর হাত ধরে উঠে আসেন অভিনেতা মোহাম্মদ বারী, সেলিম মাহবুব, রোকেয়া রফিক বেবী সহ অনেকে। তাই তো নাটকে গুরু বলে তারা সবাই এসএম সোলায়মানকেই মানেন।
নির্মাতা আদনান আল-রাজীবের হাত ধরেই অভিনয়ে আসেন তৌসিফ মাহবুব। টেলিফিল্ম ‘অ্যাট এইটিন- অলটাইম দৌঁড়র ওপর’ নাটকে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পায় তৌসিফ। এরপরই একে একে নাটকে অভিনয় করতে থাকেন ্ই তরুণ তুর্কী। তৌসিফ বলেন, ‘মিডিয়ায় আমার গুরু আদনান আল রাজীব। তিনিই আমাকে অভিনয়ের নানান দিক শিখিয়েছেন। আমি চির কৃতজ্ঞ এই মানুষটির প্রতি।’ শিষ্য সম্পর্কে আদনানের মূল্যায়ন, ‘কঠোর পরিশ্রম করতে পারে তৌসিফ। সহজে ধৈর্য হারায় না। সব সময় পজিটিভ চিন্তা করে, এটা ওর সবচেয়ে ভালো গুণ।’
বিশিষ্ট নাট্যকার পরিচালক রেজানুর রহমান এখনও তার গুরু মানেন প্রয়াত নাট্য ব্যক্তিত্ব আতিকুল হক চৌধুরী ও আব্দুল্লাহ আল মামুনকে। আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় রেজানুর রহমানের প্রথম টিভি নাটক বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল। বিশিষ্ট চিত্রগ্রাহক মাহফুজুর রহমান গুরু মানেন গুণী চিত্র গ্রাহক আব্দুল লতিফ বাচ্চুকে। এখনও আড্ডা আলোচনায় প্রসঙ্গ এলেই মাহফুজুর রহমান অবলীলায় আব্দুল লতিফ বাচ্চুর কথা স্মরণ করেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরু-শিষ্যের এই মেলবন্ধন যত বাড়বে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ততই সমৃদ্ধ হবে। আনন্দ আলোর পক্ষ থেকে শোবিজ অঙ্গনের সকল পর্যায়ের গুরুদের প্রতি রইল অনেক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা।