Home প্রতিবেদন আমাদের বইমেলা

আমাদের বইমেলা

SHARE

রেজানুর রহমান, জাকীর হাসান ও সৈয়দ ইকবাল: বোধকরি বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশে শুধুমাত্র বইয়ের মেলা নিয়ে এতো আয়োজন, হৈচৈ আর আনন্দ হয় না। মেলায় হৈচৈ আর আনন্দ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মেলার ব্যাপারে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে দেশের একজন সাধারণ নাগরিকও সমান আগ্রহ দেখান এ ধরনের নজীর পৃথিবীর আর কোথাও একটিও নাই। শুধু কী সাধারণ মানুষের আগ্রহই আমাদের চোখে পড়ে? না, ঠিক তা নয়। এই একটি মেলার প্রতি দেশের প্রচার মাধ্যমেরও আগ্রহ অনেক বেশি। পত্র-পত্রিকাতো বিশেষ আয়োজন নিয়ে হাজির হচ্ছে প্রতিদিন। পাশাপাশি টিভি চ্যানেলগুলোতে চলছে এই মেলাকে ঘিরে নানামুখী অনুষ্ঠান প্রচারের প্রতিযোগিতা। মেলামাঠ থেকে সরাসরি অনুষ্ঠান তো আছেই। আরোও আছে বইয়ের খবর, কবি লেখকের সাক্ষাৎকার, টকশোসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠান প্রচারের প্রতিযোগিতা। যেন কেহ কারো নাহি ছাড়ে সমানে সমান… অবস্থা।

প্রিয় পাঠক, নিশ্চয়ই এতোক্ষণে বুঝে ফেলেছেন আমরা কোন মেলার কথা বলছি। হ্যাঁ, প্রাণের মেলা জ্ঞানের মেলা আমাদের ঐতিহ্যের অহংকার একুশে বইমেলার কথা বলছি। আয়োজনের দিক থেকে এবারের একুশে বইমেলা অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং গোছানো। ভাবতে অবাক লাগে যে মেলাটি একদিন বাংলা একাডেমীর আঙিনায় চটের ওপর কিছু বই বিছিয়ে শুরু হয়েছিল সেই মেলাটিই এখন আকার আয়তনে বিশাল হয়ে উঠেছে। যে মেলা এক সময় বড়জোর এক ঘণ্টার ব্যবধানে দেখা শেষ হয়ে যেত সেই মেলার পুরোটা দেখতে এখন সময় লাগবে কয়েক ঘণ্টা। একদিনে পুরো মেলা দেখা সম্ভব নয়। যারা মেলা দেখেন পাশাপাশি বইও কিনেন তাঁদের জন্য আরোও সময়ের প্রয়োজন। এতোটাই বড় ও বর্ণাঢ্য হয়ে উঠেছে এবারে আমাদের একুশে বইমেলা।

প্রতিবারের মতো এবারও মাসব্যাপী একুশে বইমেলার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবারও বিভিন্ন দেশের ভাষা বিজ্ঞানী, লেখক ও প্রকাশক বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে যথারীতি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি লেখকের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। মেলার তৃতীয় দিন অনুষ্ঠিত হয় আনত্মর্জাতিক কবিতা উৎসব। বিদেশী অতিথিরাসহ বাংলাদেশের কবি সাহিত্যিকরা দিনব্যাপী এই উৎসবে অংশ নেন। বিদেশী কবি, গবেষক ও অতিথিরা বাংলা একাডেমী আয়োজিত মাসব্যাপী একুশে বইমেলার বর্ণাঢ্য আয়োজন ও বইমেলায় দেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছেন। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন আনত্মর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাঁরা দুজনই একুশে বইমেলার আয়োজন দেখে অভিভূত। আনত্মর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থার সভাপতি বললেন- পৃথিবীর আর কোন দেশে মাসব্যাপী এতবড় বইমেলা হয় না। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। গুডলাক বাংলাদেশ।

শুধু বিদেশি অতিথিরা নয় এবার বই মেলার জন্য শুভ কামনা জানাচ্ছেন সবাই। মেলার আয়োজন নিয়ে লেখক, প্রকাশক, পাঠক সকলেই খুশী। এবারই প্রথম বাংলা একাডেমী ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশাপাশি দুই অংশ জুড়ে বিশাল পরিসরে একুশে বইমেলা হচ্ছে। বিগত সময়ের চেয়ে এবারের বইমেলার অঙ্গসজ্জা বেশ আধুনিক। বইমেলায় বিভিন্ন প্রকাশনীর প্যাভিলিয়ন স্থাপনের ধারণা খুব বেশি দিনের নয়। এবার মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে দৃষ্টিনন্দন একাধিক প্যাভিলিয়ন যথার্থ অর্থে বইমেলার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। প্যাভিলিয়ন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার আনত্মরিকতাও এবার বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো।

আনত্মরিকতার কথা যখন উঠলো তখন বাংলা একাডেমির ভূমিকার প্রশংসা করতেই হচ্ছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ এবার বইমেলাকে সাজিয়েছে অনেক বেশি আনত্মরিক স্পর্শে। পাশাপাশি প্রকাশকদের আনত্মরিকতাও বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। তবে সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করতে হবে মেলায় আসা হাজার হাজার ক্রেতা দর্শককে। প্রতিদিনই হাজার হাজার ক্রেতা দর্শক বইমেলায় আসছেন। মেলা ঘুরে দেখছেন। আড্ডা দিচ্ছেন। বই কিনছেন। আবার আনন্দ নিয়েই ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। আর তাই প্রতিদিন বইমেলার সর্বত্রই অভাবনীয় আনত্মরিক দৃশ্যের সূচনা হচ্ছে। একুশে বইমেলাকে আমরা আদর করে বলে থাকি জ্ঞানের মেলা, প্রাণের মেলা। সত্যিকার অর্থে আমাদের বইমেলা প্রাণের মেলা হয়ে উঠছে প্রতিদিন।

প্রিয় পাঠক, এখনও যদি একুশে বইমেলায় না গিয়ে থাকেন তাহলে আর দেরি করবেন না। একবার হলেও বাংলা একাডেমীতে একুশে বইমেলা থেকে ঘুরে আসুন।