SHARE

রেজানুর রহমান
সমুদ্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে কেউ যদি বলেন সমুদ্র বড় তাহলে বর্ণনাটা ঠিক হবে না। বড় বলতে কত বড়? হাতিও তো বড়। জিরাফ তার চেয়েও লম্বা। আমাদের ঢাকার রেসকোর্স ময়দান সেটাও তো বড়। পল্টন ময়দাও তো বেশ বড় ছিল। তার মানে বড় বললেই আকারটা ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু যদি বলি সমুদ্র বিশাল। তাহলে বোধকরি সমুদ্রের আকার-আয়তন সম্পর্কে একটা ধারনা পাওয়া যাবে। আমরা যখন বলি, বিশাল আকাশ জুড়ে সাদা সাদা মেঘের ভেলা ভাসছে। তখন কল্পনায় একটা ছবি ভেসে ওঠে। যে ছবি এতই বিশাল যে কল্পনা করার সাহস জাগে না। অন্য কথায় কল্পনা করার প্রয়োজন পড়ে না।
আমাদের এবারের একুশে বইমেলা নিয়ে এমন কথাই বলা যায়। কেউ যদি প্রশ্ন করে যে, এবারের বইমেলাটা কেমন হয়েছে? কত বড়..? তার সহজ উত্তর দেওয়া মুশকিল। কারণ এবারের বইমেলা আকার আয়তনে এতো বড় হয়েছে যে, শুধু বড় বললে অবস্থাটা বুঝানো যাবে না। বলতে হবে এবারের বইমেলা বিশাল…
সত্যি সত্যি এবারের বইমেলা বিশাল আকার নিয়েছে। যারা বাংলা একাডেমির আঙিনায় বইমেলা দেখে অভ্যস্থ, অথবা যারা ১০/১২ বছর পর একুশে বইমেলা দেখছেন তারা সহজেই চিনতে পারবেন না। কারণ একাডেমি প্রাঙ্গনের বইমেলা আর বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যাণের একুশে বইমেলার মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান।
আজকের বইমেলার বিশালত্ব দেখে কেউ যদি সেই ইতিহাসটা তুলে ধরেন যে, একদা বাংলা একাডেমির আঙিনায় চট বিছিয়ে মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা এই বইমেলার সূচনা করেছিলেন তাহলে অনেকেই তা বিশ্বাস করতে চাইবেন না। অথচ এটাই সত্য ইতিহাস। বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান মুক্তাধারার মালিক চিত্তরঞ্জন সাহাই প্রথম বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে চটের বস্তা বিছিয়ে বইমেলার ধারনাটা তুলে ধরেন। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে বইমেলা শুরু হয়। এতোদিন বইমেলা হতো বাংলা একাডেমির আঙিনায়। সেটাকেই এক সময় বড় বইমেলা মনে হতো। এখন সেই বইমেলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছেড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জায়গা জুড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ যেন এক বিশাল অর্জন।
ভদ্রলোক অবাক চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাংলা একাডেমির সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বইমেলা দেখছেন। জিজ্ঞেস করলাম কেমন দেখছেন? হঠাৎ যেন চমকে উঠলেন। পরক্ষনেই সামলে নিয়ে বললেন, এটা কি আমাদের বইমেলা? এতো বড়? সত্যি বলতে কী দেখে বিশ্বাস হচ্ছে না…
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়েছেন শরিফা বেগম। আমাদের একুশে বইমেলা যে এবার এতো বড় হয়েছে সে ধারনাই ছিল না তার। হাটতে হাটতে সামনে বসার জায়গা পেয়ে বসে পড়েন। হাফাতে হাফাতে বলেন, সত্যি আমি অভিভূত। আমাদের বইমেলা এতবড় হয়েছে?
ঠাকুরগাঁও থেকে একুশে বইমেলায় এসেছেন একজন স্কুল শিক্ষক। প্রতি বছরই একবার হলেও বইমেলায় আসেন। স্কুলের লাইব্রেরীর জন্য তাকে বই কেনার দায়িত্ব দেয়া হয়। এবারও সেই দায়িত্ব পেয়েছেন। কিন্তু বইমেলায় ঢুকেই তিনি অবাক। সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বললেন, হ্যা একেই বলে বইয়ের রাজ্য।
একজন তরুণ লেখক। এবারের বইমেলায় তার একটি বই বেরিয়েছে। বইমেলাটা এবার এতো বড় হবে সেটা তার কল্পনায়ই ছিল না। বইমেলা বড় হওয়ায় তার একটা সুবিধা হয়েয়েছ। বন্ধুদেরকে গর্ব করে সে কথা বলতে পারছে।
ঢাকায় থাকেন ভদ্রলোক। পেশায় ব্যাংকার। বই পড়তে ভালোবাসেন। প্রতি বছর বইমেলা থেকে প্রিয় লেখকের বই কিনেন। এবারও এসেছিলেন বই মেলায়। মেলার আকার-আয়তন দেখে তিনি যার পর নাই অবাক। প্রসঙ্গ তুলে বললেন, এ এবার আমরা গর্ব করে বলতেই পারিÑ পৃথিবীতে আমাদের বইমেলাই শ্রেষ্ঠ বইমেলা।
চলুন একবার মেলা থেকে ঘুরে আসি
প্রিয় পাঠক, জানেন নিশ্চয়ই এবারের বইমেলা চলবে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের কারণে ১ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু না হয়ে পরের দিন ২ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। তবে এবার ফেব্রুয়ারি মাস ২৯ দিন হওয়ায় মেলা ২৮ দিনই পাচ্ছে। প্রতিদিন বিকেল ৩টায় বইমেলা শুরু হয়। শেষ হয় রাত ৯টায়।
এবার বইমেলার প্রায় পুরো অংশই চলে গেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বাংলা একাডেমিতে আছে বইমেলার মূলমঞ্চ ও কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের স্টল। তবে বইমেলার মূল কার্যক্রম বিস্তৃত সোহরাওয়ার্দী উদ্যাণে। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন মঞ্জ, লেখক বলছি মঞ্চ, শিশু কর্নার সবকিছুই আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যাণ অংশে। খাবার-দাবারের দোকানও স্থান পেয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যাণ অংশে।
ছবির মতো বইমেলা
এবারের বইমেলাকে পটে আঁকা ছবির সাথেও তুলনা করছেন কেউ। সৌন্দর্যের দিক থেকেও এবারের বইমেলা সবার নজর কেড়েছে। পাঁচশরও অধিক প্রাকশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে এবারের বইমেলায়। ৩৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছে। পুরো বইমেলার ইন্টেরিয়র ডিজাইন করেছেন বিশিষ্ট স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর। ফলে বইমেলা এবার নতুন নান্দনিক চেহারা পেয়েছে।