Home আরোও বিভাগ টিভি গাইড আমাদের টিভি নাটক গন্তব্য কোথায়?

আমাদের টিভি নাটক গন্তব্য কোথায়?

SHARE

রাশেদ হুমায়ুন: দেশের একজন বিশিষ্ট নাট্যপরিচালক ও অভিনেতা আবুল হায়াত দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, আর টিভি নাটক বানাব না। কারণ এই কাজটার প্রতি কারই কোনো আন্তরিকতা নেই। আমি নিজে একজন অভিনেতা। তবুও অভিনেতা অভিনেত্রীদের ব্যাপারেই আমার অনেক ক্ষোভ। আমরা অনেকেই টিভি নাটক করতে গিয়ে নিয়ম মানছিনা। যে যার মতো সত্য-মিথ্যা আচরণ করে যাচ্ছি। অনেকেরই অভিনয়ের ব্যাপারে কোনো মনযোগ নাই। অনেকে ভালো করে নাটকের পান্ডুলিপি পড়েনও না। অনেকে মানসিক ভাবে তৈরি না হয়েই নাটকের সেটে দেরী করে আসেন। আবার এসেই ‘যাই যাই’ শুরু করে দেন। ভাবটা যেন আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। ফলে টিভি নাটকের মান দিন দিন কমে যাচ্ছে।
এবার ঈদের নাটক নির্মানের ক্ষেত্রে চরম একটা অভিজ্ঞতার বর্ননা দিলেন তিনি। ঢাকার বাইরে মানিকগঞ্জে নাটকের শ্যুটিং হবে। ইউনিট নিয়ে আগেই পৌছে গেছেন। অথচ নায়ক, নায়িকার দেখা নাই। ফোনেও তাদেরকে পাওয়া যাচ্ছিলো না। রিপোটিং টাইম ছিল সকাল ১০টা। অবশেষে দেড়টার দিকে শ্যুটিং স্পটে পৌছান নায়ক, নায়িকা। পরিচালক আবুল হায়াত আশ্বস্থ হলেন, যাক এবার শ্যুটিং শুরু করা যাবে। কিন্তু নায়ক-নায়িকার শরীর খারাপ। আগের রাতে ভোর পর্যন্ত শ্যুটিং করেছে। কাজেই একটু ঘুমিয়ে না নিলে শ্যুটিং করতে পারবেন না। কি আর করা? তাদেরকে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো। সকালের শ্যুটিং শুরু হলো বিকেলে। তখনও নায়ক, নায়িকার চোখে-মুখে ঘুম যায়নি…
পরের দিন ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ যাবার পথে পরিচালক আবুল হায়াতই ওই দুই নায়ক নায়িকাকে তাদের বাসা থেকে তুলে নিলেন। পাশাপাশি গাড়িতে চড়ে কল টাইমেই মানিকগঞ্জ পৌছালেন ঠিকই। কিন্তু সাথে সাথে শ্যুটিং শুরু করা গেল না। নায়িকার ঘুম পাচ্ছে। ঘুম শেষে মেকআপ নিতেও সময় লাগল। ব্যস যেই লাউ সেই কদু… শ্যুটিং যখন শুরু হলো তখন সুর্য ‘যাই যাই’ করছে…
ঈদের নাটক নির্মাণের এমন ‘সুখকর’ বর্ননা দিয়ে বিশিষ্ট নাট্য পরিচালক, অভিনেতা আবুল হায়াত বললেন, এভাবে আর নাটক বানাব না। তাছাড়া এভাবে নাটক বানিয়ে কি লাভ?
প্রিয় পাঠক, আবুল হায়াতের মতো দেশ বরেণ্য একজন নাট্য পরিচালক ও অভিনেতাকে যদি নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন ‘মধুর অভিজ্ঞতার’ মুখোমুখি হতে হয় তাহলে আমাদের টিভি নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রটা কতটা জটিল অবয়ব পেয়েছে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আমরা কথায় বিটিভি যুগের নাটকের কথা বলি। আহা! কী সুন্দরই না ছিল সেই দিন গুলো। বিটিভির একঘণ্টার নাটক দেখার জন্য সন্ধ্যার পর দেশে প্রতিটি শহরের রাস্তাঘাট খালি হয়ে যেত। ঈদের নাটকের ক্ষেত্রে দর্শকের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। সেই সময় কলকাতার দর্শকরাও বিটিভির নাটক দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। তখনকার দিনে বিটিভির একটি নাটক নির্মাণের আগে পরিচালক অথবা প্রযোজকের নেতৃত্বে কম করে হলেও ৩দিন নাটকটির রিহার্সেল হতো। ফলে নাটকটির সকল অভিনেতা অভিনেত্রী পরস্পরের সাথে দেখা সাক্ষাতের সুযোগ পেতেন। কে কোন চরিত্র করবেন তা সহজেই বুঝে নিতে পারতেন। তারপর নির্ধারিত সময় ধরেই শ্যুটিং শুরু হতো এবং নির্ধারিত সময়েই সেদিনের শ্যুটিং শেষ হতো। ফলে পরের দিন কল টাইমে শ্যুটিং এ আসার ক্ষেত্রে কারই কোনো সমস্যা হতো না।
দেশের একজন বিশিষ্ট অভিনেতা বললেন, যেদিন থেকে আমাদের টিভি নাটকের ক্ষেত্রে রিহার্সেল অর্থাৎ মহড়ার প্রচলনটা উঠে গেছে সেদিন থেকেই মূলতঃ টিভি নাটকের অধঃপতন শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু টিভি নাটক নয় যে কোন দলবদ্ধ কাজ করার আগে এক বা একাধিক বৈঠক হওয়া জরুরি। পরস্পরকে জানা ও বোঝার জন্যও তো এটা করা দরকার। টিভি নাটকের বেলায় তো বিষয়টি আরও গুরুত্বপুর্ণ। নাটকের শ্যুটিং শুরুর আগে কমপক্ষে একঘণ্টার জন্য হলেও যদি একটি মহড়ার ব্যবস্থা করা যায় তাহলে নাটকটি নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেক সুফল পাওয়া সম্ভব। অথচ আমরা কোনো প্রকার মহড়া ছাড়াই টিভি নাটকে অভিনয় করছি। অনেকে পান্ডুলিপি না পড়েই শ্যুটিং এ হাজির হচ্ছি। স্পটে এসেই হয়তো বাবা মা’র সাথে ছেলে-মেয়ে অথবা তাদের স্বামী-স্ত্রীর ভ‚মিকায় অভিনয়কারী অভিনেতা-অভিনেত্রীর সাথে পরিচয় ঘটছে। বুঝে না বুঝে কোনো রকমে অভিনয় করে চলে যাচ্ছি। অনেকে নিজের অীভনীত নাটক দেখার ক্ষেত্রেও খুব একটা আগ্রহ দেখান না। ফলে অভিনয়ে একটা নাটক থেকে আরেকটা নাটকে উতরে যাবার তাড়নাও কারও মাঝে দেখা যায় না। এবারের ঈদে অধিকাংশ টিভি নাটক দেখে মনে হয়েছে নাটকের কাহিনী ফুরিয়ে গেছে। যোগ্য অভিনেতা-অভিনেত্রীর বড়ই অভাব। তা নাহলে প্রায় প্রতিটি নাটকের কাহিনীকে কেন একই রকম মনে হয়েছে? পাশাপাশি ঘুরে ফিরে একই মুখ। অধিকাংশ নাটকে তথাকথিত নায়ক নায়িকাই মুখ্য। সাথে রয়েছে ভিলেন জাতীয় দুই একটি চরিত্র। আমাদের টিভি নাটকে বাবা-মা, চাচা-চাচী, মামা-মামী, খালা-খালু, দাদা-দাদী, নানা-নানী এমনকি ভাই-বোনকেও তেমন দরকার পড়ে না। নায়ক-নায়িকাকে ঘিরেই নাটকের কাহিনী। সেখানেও ঘুরে ফিরে একই মুখ। যেন একটা তেলেসমাতি কারবার চলছে আমাদের টিভি নাটকে।
বর্তমান সময়ে পরিচালকের চেয়ে নাটকের সহকারী পরিচালকদের অবস্থা আরও করুণ। তাদেরকে অনেক কিছু ম্যানেজ করতে হয়। নাম প্রকাশে একজন সহকারী পরিচালক বললেন, ইদানিং চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয়ের ব্যাপারে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীই মনযোগ দেখান না। বিশেষ করে তথাকথিত নামকরা আর্টিস্টরাতো পরিচালকের কথা শুনতেই চান না। অনেকে তরুণ নাট্য পরিচালকদেরকে ডিকটেড করেন। একবারের বেশি শর্ট দিতে রাজি হন না। মুড নাই বলে হঠাৎই হয়তো শ্যুটিং ছেড়ে বেড়িয়ে যান। তাছাড়া মোবাইলের যন্ত্রনাতো আছেই।
সাম্প্রতিক সময়ের একটি অভিজ্ঞতার কথা বর্ননা করে তিনি বললেন, একটি নাটকে কাহিনীর প্রয়োজনে নায়িকাকে কাঁদতে হবে। শ্যুটিং শুরু হলো। নায়িকাকে কাঁদতে বলা হচ্ছে। তিনি অবাক হয়ে বললেন, এটা কান্নার দৃশ্য নাকি? আমিতো ভাই কাঁদতে পারব না। আমাকে দিয়ে কান্না আসে না। তাকে যখন প্রশ্ন করা হলো আপনি কি এই স্ক্রীপ্টটা পড়েছেন? তার সহজ সরল উত্তরÑ স্ক্রীপ্ট পড়ার সময় কোথায়? গত রাতে ৪টায় শ্যুটিং থেকে বাসায় ফিরেছি। ঘুমাতে ঘুমাতে ভোর পাঁচটা। পরের দিন সকাল ১১টায় তো শ্যুটিং এ চলে এলাম। স্ক্রীপ্ট পড়ব কখন?

শিল্পীর এই সহজ-সরল স্বীকারোক্তিকে শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি, তার কথায় যথার্থ যুক্তি আছে। রাত ৪টায় শ্যুটিং থেকে ফিরে পরের দিন সকাল ১১টায় শ্যুটিং এ পৌছানো টাই তো ‘টাফ’ ব্যাপার। সেখানে পান্ডুলিপি পড়ার সময় কোথায়? বিনীত ভাবেই পাল্টা একটি প্রশ্ন করতে চাইÑ একটি নাটকে অভিনয়ের আগে তো পান্ডুলিপি পড়াটা জরুরি। তা নাহলে ক্যারেকটার তৈরি হবে কি করে? ক্যারেকটার অনুযায়ী পোশাক, কস্টিউমের ব্যাপারটাও জরুরি। অথচ অনেকেই আগের দিনের শ্যুটিং এর ব্যস্ততার কারনে পরের দিনের নাটকের পান্ডুলিপি না পড়েই শ্যুটিং এ হাজির হন! অসহায় পরিচালকের তখন আর করার কিছুই থাকে না।
অনেকে হয়তো খেয়াল করেছেন এতদিন দর্শকের পক্ষ থেকে টিভি নাটকের নানা সমালোচনা শোনা গেছে। এবার কিন্তু অভিনেতা, অভিনেত্র, পরিচালকদের মধ্যেই কঠোর সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশিষ্ট অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত দেশের একটি জনপ্রিয় দৈনিকে মন্তব্য করেছেন ‘টিভি নাটক’ দেখার আগ্রহ এখন শূন্যের কোঠায়। ঈদে আমাদের টেলিভিশন নাটক নিয়ে সারাদেশে দর্শকের মাঝেও ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ঈদে দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সব মিলিয়ে কয়েকশ নাটক ও টেলিফিল্ম প্রচার হয়েছে। বেশ কয়েকটি নাটক দর্শক পছন্দও করেছেন। কিন্তু বস্তা পচা টিভি নাটকের ভীড়ে ভালো নাটকের ঔজ্জ্বল্য সবার চোখে পড়েনি।
দেশে টিভি নাট্যকার, পরিচালক, প্রযোজকদের একাধিক সংগঠন রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে অভিনয় শিল্পীদেরও সংগঠন। এই যে এবারের ঈদে টিভি নাটকের ক্ষেত্রে এক ধরনের চরম অস্থিরতা প্রকাশ হলো তা নিয়ে কেউ কি ভাবছেন? নাকি এব্যাপারে কারই কোনো চিন্তা ভাবনা নাই। তাহলে আমাদের টিভি নাটকের ভবিষ্যৎ কি? কে বলতে পারবেন দয়া করে হাত তুলুন…