Home শীর্ষ কাহিনি আমরা হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের জন্যই ছবিটি বানিয়েছি

আমরা হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের জন্যই ছবিটি বানিয়েছি

SHARE

-মেহের আফরোজ শাওন, পরিচালক

রেজানুর রহমান: বাসাটা ঠিক আগের মতোই আছে। পরিবেশ এতটুকুও বদলায়নি। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকতে যেমন ছিল তেমনই আছে। বিশেষ করে বাসার মানুষ গুলোর আচার আনত্মরিক আচরণও তেমনি আছে। বহুবার এসেছি এই বাসায়। প্রতিবারই হুমায়ূন আহমেদ ব্যসত্ম হয়ে বলতেন- ও, রেজানুর এসেছো? পাঁচ মিনিট… অ্যাই… রেজানুরকে চা দাও! আজও কণ্ঠটা যেনো মনে হলো হুমায়ূন আহমেদরই নাকি? না, হুমায়ূন আহমেদের কণ্ঠ নয়। শাওনের কণ্ঠ। মেহের আফরোজ শাওন। হুমায়ূন আহমেদের প্রিয়তমা স্ত্রী। মনে হলো যেন হুমায়ূন আহমেদই সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ও, রেজানুর ভাই? পাঁচ মিনিট… অ্যাই রেজানুর ভাইকে চা দাও…

পাঁচমিনিটের মধ্যেই এলেন মেহের আফরোজ শাওন। হুমায়ূন আহমেদ হলে বলতেন- হ্যা বলো কি জানতে চাও? শাওনও তেমনি করে বললেন- হ্যা ভাই বলেন… আপনাকে চা দিয়েছে তো…

চা এসেছে অনেক আগেই। চা খেতে খেতে ভাবছিলাম প্রসঙ্গটা কি ভাবে শুরু করা যায়। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস নিয়ে প্রথমবারের মতো ছবি বানালেন প্রিয়তমা স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। এই মুহূর্তে আপনার অনুভূতি কী? এই টাইপের প্রশ্ন দিয়েই কী শুরু করব?

নিনিতের কথায় চমক ভাঙ্গলো। মায়ের কাছে কিছু একটা আবদার তুলেছে। মা শাওনের মুখের কাছে মুখ নিয়ে কিছু একটা বলছে। শাওন আদরে ভরিয়ে দিলেন ছোট ছেলেকে-বাবা আমি এখন তোমার আংকেলের সাথে কথা বলছি… একটা ইন্টারভিউ দিচ্ছি…

কী লক্ষী ছেলে নিনিত। মায়ের কথা শুনে শানত্ম সুবোধ চেহারায় পাশের ঘরে চলে গেল। শাওন মৃদু হেসে বললেন- ও ইদানিং ছবি আঁকতে শুরু করেছে। আঁকা ছবি দেখাতে চায়। বললাম-যাও নিয়ে আসো।

নিনিত এলো একটু পরে। আমরা কৃষ্ণপক্ষ নিয়ে কথা শুরু করেছি। প্রশ্নের ফর্মটা কেন যেন ভাঙ্গতে ইচ্ছে করল না। কমন প্রশ্ন দিয়ে শুরু হলো আমাদের ‘কৃষ্ণপক্ষ’ আড্ডা।

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস নিয়ে প্রথম বারের মতো ছবি বানালেন। পরিচালক হিসেবে আপনার জীবনের প্রথম সিনেমা। কেমন লাগছে? আমার কেন যেন মনে হচ্ছিলো শাওন বলবেন- জীবনের প্রথম সিনেমা তাও আবার হুমায়ূন আহমেদের কাহিনী নিয়ে। তাই আমি খুব এক্সসাইটেড। কী যে আনন্দ হচ্ছে… ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।

krisnopokkho-picকিন্তু শাওন মোটেই সে রকম কিছু বললেন না। প্রশ্ন শুনে একটু যেনো ভাবলেন। এবং মুহূর্তে তার দু’চোখ ছলছল করে উঠলো। কেঁদে ফেলবেন কী! কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলেন শাওন। বাম হাত দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে মৃদু হেসে কথা শুরু করলেন এভাবে- এই মুহূর্তে আমার মধ্যে একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। শুধু আমার বেলায় নয় যারাই এরকম প্রথম কিছু করে তাদের সবার মাঝেই একটা বিশেষ অনুভূতি কাজ করে। প্রথম গল্প প্রকাশ, প্রথমবার মঞ্চে গান করা, প্রথমবার টিভিতে অভিনয় করা, প্রথমবার চলচ্চিত্র পরিচালনা করা… প্রথম কাজের ব্যাপারে সবাই একটু এক্সসাইটেড থাকে। সনত্মান জন্ম হলে নিজে কোলে নেয়ার পর একটা অপরূপ আনন্দ কাজ করে। মানুষকে দেখাতেও ইচ্ছে করে- এই যে দেখ আমার সনত্মান… এই আনন্দের কোন তুলনা হয় না। প্রথম ছবির ব্যাপারটাও সেরকম। কিন্তু আমার মাঝে কেন যেন একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। কৃষ্ণপক্ষ নির্মাণের পর কোথায় যেন একটা ভয়ংকর ডিপ্রেশন কাজ করছে…

এটা কী এক ধরনের শূন্যতা? আমার প্রশ্ন শুনে শাওনের তাৎক্ষনিক জবাব- না, না… ঠিক শূন্যতা নয়। একে আমি ডিপ্রেশনই বলব। আমাকে বুস্টআপ করার জন্য পিছন থেকে কাউকে ধাক্কা দিতে হয়। আমি যখন ছোট ছিলাম, গানের অনুষ্ঠান করতাম, নতুনকুঁড়ি করতাম (হুমায়ূন আহমেদের সাথে পরিচয়ের আগের কথা বলছি) তখন মাঝে মাঝে ডিপ্রেশনে পরলে আমার মা আমাকে বুস্টআপ করতেন। বলতেন হতাশ হয়ো না… তুমিই পারবে…

তারপর একসময় এই দায়িত্বটা তো হুমায়ূন আহমেদ নিলেন এবং তিনি একসময় আমাকে এমন ভাবে বুস্টআপ করলেন যে আমি প্রতিদিনই একটা না একটা ভালো কাজ করার চেষ্টায় থাকতাম। কারণ আমার ভালো কাজ মানেই হুমায়ূন আহমেদের আনন্দ! হাসছেন মানুষটা। বলছেন- ওয়েলডান!

আপনারা ভাবতে পারেন হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস নিয়ে আমি প্রথম বারের মতো ছবি বানালাম। ছবি কেমন হয়েছে, কতটা ভালো হয়েছে এটা নির্ধারণ করবেন দর্শক। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে কী করতেন? আনন্দে হয়তো সারা বাড়ি মাথায় তুলতেন। অভিনব সব আনন্দ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতেন। বলতেন… দ্যাখো শাওন সিনেমা বানিয়েছে! সিনেমাটা সুন্দর হয়েছে না?

কথা বলতে বলতে শাওন এবার আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। কেঁদে ফেললেন। পরক্ষনেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে চোখ মুছতে মুছতে বললেন- না, আমি এখনও ভাবতে পারি না হুমায়ূন আহমেদ আমাদের মাঝে নেই। তবে হ্যা কৃষ্ণপক্ষ বানানোর সময় আমাদের কখনই মনে হয়নি হুমায়ূন আহমেদ আমাদের মাঝে নেই। আমরা হুমায়ূন আহমেদের সেই টীমই ছবিটি নির্মাণের সময় জড়িত ছিলাম। স্যুটিং করার সময় সারাক্ষণ মনে হয়েছে- ঐতো হুমায়ূন আহমেদ বসে আছেন। ফাইভ ফোর থ্রি টু ওয়ান জিরো… অ্যাকশন বলছেন। আমরা আসলে হুমায়ূন আহমেদের শেখানো পথেই হাঁটছি। কৃষ্ণপক্ষকে নিয়ে খুব বেশী ভারী ভারী কথা বলতে চাই না। আমাদের ছবি এই হয়েছে, ওই হয়েছে… এসব আমি কিছুই বলতে চাই না। আমরা একটি ভালো ছবি বানাতে চেয়েছি। হুমায়ূন  আহমেদের দর্শকদের জন্য এটা আমাদের নতুন উপহার। আশাকরি দর্শক কৃষ্ণপক্ষে হুমায়ূন আহমেদকেই খুঁজে পাবেন।

কথায় কথায় ছবির কলাকুশলীদের প্রসঙ্গ উঠলো। শাওন অভিভূত কণ্ঠে বললেন- আমি আমার সকল অভিনেতা-অভিনেত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ। প্রথমে মাহিয়া মাহীর কথা বলতেই হয়। কৃষ্ণপক্ষের মতো সাহিত্য নির্ভর ছবিতে সে প্রথমবারের অভিনয় করেছে। তার আনত্মরিকতায় আমি মুগ্ধ। আমার বিশ্বাস কৃষ্ণপক্ষে মাহিকে দর্শক নতুন ভাবে আবিস্কার করবেন। আর রিয়াজ ভাই, ফেরদৌস ভাইয়ের কথা কী বলব? তাদের আনত্মরিক সহযোগিতায় আমি মুগ্ধ। কুষ্ণপক্ষে অভিনয় করার সময় রিয়াজ ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপরও ছবিটির ব্যাপারে তার যে আনত্মরিকতা লক্ষ্য করেছি… সত্যি অসাধারণ। তানিয়া আহমেদ ও এস আই টুটুলের কথাও বলতে হয়। তারা আমাকে সারাক্ষণ অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। কৃষ্ণপক্ষে অনেক নামকরা শিল্পী খুবই ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা। আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা চ্যানেল আই ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর প্রতি। ফরিদুর রেজা সাগর ও ইবনে হাসান খান সত্যিকার অর্থে হুমায়ূন আহমেদকে ভালোবাসেন। কৃষ্ণপক্ষ নির্মাণের ক্ষেত্রে তারা দু’জনই আমাকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন। একজন নবীণ পরিচালকের জন্য যা ছিল অনেক আনন্দের ও উৎসাহের।

হুমায়ূন আহমেদের ধানমন্ডির বাসায় আমরা যখন কৃষ্ণপক্ষ নিয়ে কথা বলছিলাম তখন স্কুল থেকে ফিরল নিষাদ হুমায়ূন। তাকে দেখে ছোটভাই নিনিত হুমায়ূন দৌড়ে এলো। মাকে বলল- মা আইয়া বাবা এসেছে। নিনিত নিষাদকে আইয়া বাবা বলে ডাকে। তার যত আবদার বড় ভাই অর্থাৎ আইয়া বাবার কাছে। দুই ভাইয়ের মধ্যে অসম্ভব রকমের মিল। প্রসঙ্গ তুলে শাওন বললেন- নিষাদ, নিনিতের মতো দুটি সনত্মান আমার কাছে এই ভেবে আমি প্রতিদিন কাজের প্রেরণা পাই। জানেন, কৃষ্ণপক্ষের স্যুটিং চলাকালে আমি ওদেরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারিনি। ওরা আমার মায়ের বাসায় ছিল। দু’জনের একজনও কোন ঝামেলা করেনি। বরং আমাকে সারাক্ষণ সহযোগিতা করেছে। একদিনের কথা বলি। স্যুটিং শেষ করে গভীর রাতে মায়ের বাসায় ফিরেছি। ঘুমিয়ে আছি। সকালে মনে হলো নিনিত আমার কাছে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু বড় ভাই নিষাদ ওকে বোঝাচ্ছে- এখন মায়ের কাছে যেও না। জানো না মা খুব টায়ার্ড। ঘুমাচ্ছে… দুই ভাইয়ের মধ্যে এমনই বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তিন বছর আগে একদিন নিষাদ নিনিতকে ডেকে নিয়ে বলেছে- শোন, আমি তোমার আইয়া বাবা! তোমার যা কিছু আবদার সব আমাকে বলবে… বুঝেছ…

সেই থেকে নিনিত বড় ভাইকেই অভিভাবক মনে করে। দুই ভাইয়ের সারাক্ষণ চেষ্টা থাকে মাকে কিভাবে খুশি রাখা যায়।

Krisna-Posha-1কথায় কথায় ‘কৃষ্ণপক্ষ’ আড্ডা শেষ হয়। শাওন আবার বলেন, হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের জন্য আমার একটি আরজি আছে। কৃষ্ণপক্ষে আমরা হুমায়ূন আহমেদকে অনুসরণ করেছি। একটা ভালোছবি নির্মাণের চেষ্টা করেছি। হলে গিয়ে ছবিটা দেখবেন। আর আশির্বাদ করবেন আমি যেন হুমায়ূন আহমেদের দেখানো পথে সততার সাথে হাঁটতে পারি।

আড্ডায় শেষ প্রশ্ন ছিল শাওনের কাছে। গান, অভিনয়, নাটক পরিচালনার পর চলচ্চিত্র বানালেন। ভবিষৎ পরিকল্পনা কী?

শাওন বললেন- আমি মূলতঃ পরিচালনার সাথেই থাকতে চাই। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে আরও বেশী সময় দিতে চাই।