SHARE

শেষটা বোধকরি ভালই হলো মাশরাফির জন্য। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সকল সদস্যের শরীরে শোভা পাচ্ছিলো মাশরাফি নাম সম্বলিত ২ নম্বর জার্সি। তার মানে দলপতিকে বিদায় জানাতে গিয়ে সকলেই এক একজন মাশরাফি হয়ে উঠেছিলেন। যেখানে তাকাই, যেদিকেই তাকাই মাশরাফি ছাড়া আর যেন কেউ নেই। অর্থাৎ আমিও মাশরাফি হবো এটাই ছিল সমবেত প্রার্থনা। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মাশরাফি বলেছেন, বিদায় বেলায় খারাপ তো লাগছেই। তবে সবার ভালোবাসা পেয়ে আমি অভিভূত। অশেষ কৃতজ্ঞতা সবার প্রতি।
এক অর্থে আমাদেরই উচিৎ মাশরাফিকে কৃতজ্ঞতা জানানো। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সফলতম অধিনায়ক তিনি। একটা দুইটা নয় শরীরে সাত সাতটা অপারেশন করার পরও দুর্দান্ত গতিতে ক্রিকেটে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৩ দফা বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যোগ্যতার গুণে মাশরাফি নামটি দেশবাসীর কাছে অনেক আদুরে নাম। বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণের আইডল হয়ে উঠেছেন মাশরাফি। তাই তার বিদায় বেলায় ভক্তÑ-অনুরাগীদের মন খুবই খারাপ।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে আর ক্রিকেট খেলবেন না মাশরাফি। অর্থাৎ ক্রিকেটে ক্যাপটেন মাশরাফির অধ্যায় শেষ। বিদায় বেলায় প্রচার মাধ্যমে মন খুলে কথা বলেছেন আমাদের ক্রিকেটের রাজপুত্র মাশরাফি বিন মোর্ত্তুজা। তারই চুম্বক অংশ আনন্দ আলোর পাঠকদের জন্য।
প্রশ্ন: অধিনায়কত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিজের না বোর্ডের?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: সিদ্ধান্তটা আমিই নিয়েছি। আজ (গতকাল) সকালেই মনে হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। কাল (পরশু) পর্যন্ত সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলাম।
প্রশ্ন: সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কতটা কঠিন ছিল?
মাশরাফি: অধিনায়কত্বের সুযোগ বিসিবি দিয়েছে, আমিও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সামনে ২০২৩ বিশ্বকাপ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হবে। আমার মনে হয়েছে, নতুন কেউ আসার এটাই ঠিক সময়। সে দলকে এখন থেকেই গুছিয়ে নিক। আমা করব, যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটি যেন স্থির থাকে। এই অধিনায়কই যেন ২০২৩ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হয়।
প্রশ্ন: কোনো আক্ষেপ বা হতাশা…
মাশরাফি: আমার ক্যারিয়ারটাই অনেক আগে শেষ হয়ে যেতে পারত। যতটুকু পেয়েছি তার জন্য আল্লঅহর কাছে হাজার শুকরিয়া। প্রাপ্তির বিষয়ে একজন খেলোয়াড়রে পক্ষে বলা খুব কঠিন। অপ্রাপ্তিটা সহজেই বলা যায়। অনেক অপ্রাপ্তি আছে, কিন্তু সেটাও দিন শেষে আমার কাছে প্রাপ্তি।
প্রশ্ন: অধিনায়কত্বের শুরুতে যে লক্ষ্য ছিল, সেটি কতটা পূরণ হয়েছে?
মাশরাফি: আমাকে যখন জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়, জানতাম দায়িত্বটা কত বড়। কত আবেগ জড়িয়ে আছে, কত মানুষ তাকিয়ে থাকে যখন বাংলাদেশ দল খেলে, খেলা দেখার জন্য বসে থাকে। সে জায়গা থেকে এতটুকু বলতেত পারি, আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন: অধিনায়কত্ব ছাড়ার পেছনে কোনো অভিমান কাজ করেছে কি না?
মাশরাফি: আপনারা সব সময় যদি এগুলো বের করতে চান, তাহলে খারাপ। এসব জিনিস থাকে না, তা নয়। তবে সত্যি কথা, এ রকম কিছু নেই। আমাকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আপনাদের সামনে এসে ঘোষণা দিলাম যে আমার দায়িত্বটা শেষ। ভালো-মন্দ নিয়েই এগিয়ে আসতে হয়েছে এই পর্যন্ত।
প্রশ্ন: শুধু খেলোয়াড় হিসেবে খেলা কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে?
মাশরাফি: ধরুন, আপনি ঘুম থেকে উঠলেন। খুব সুন্দরভাবে আপনার সামনে নাশতা রাখা হলো। নাশতা করে আবার বিছানায় শুয়ে থাকলেন, টিভি দেখলেন। দুপুরের খাবারটা রাখা হলো। বিকেলে একটু ঘুরে এলেন। সন্ধ্যায় আবার নাশতা দেওয়া হলো, রাতে ডিনার। এভাবেই চললে আপনার জীবনের মূল্য কী থাকল? আমি বেশি উপভোগ করি সব যখন বিপক্ষে থাকে তখন। সবকিছু পক্ষে থাকলে আমার কাছে মনে হয়, জীবনের মূল্য বুঝি কিছুই থাকল না।
প্রশ্ন: অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে ভালো স্মৃতি…
মাশরাফি: অনেক আছে। অধিনায়ক হিসেবে, দলের সদস্য হিসেবেও। খারাপ স্মৃতিও আছে। আমার পাশে সব সময় খেলোয়াড়েরা ছিল। কোচরা ছিলেন। আলাদা করা খুব কঠিন।
প্রশ্ন: সবচেয়ে কঠিন সময়…
মাশরাফি: যখন ভারতের কাছে ১ রানে হারলাম, (টি- টোয়েন্টি) বিশ্বকাপে। সেই রাতটা শুধু আমার নয়, পুরো দলের জন্যই বীভৎস ছিল। সবাই হোটেলে এসে করিডরে বসে ছিলাম। অধিনায়ক হিসেবে খেলোয়াড়দের দেখে খুবই খারাপ লাগছিল। তারপরও অনেক চ্যালেঞ্জিং সময় গেছে। শেষ বিশ্বকাপও অবশ্যই। ব্যক্তিগতভাবে বলব প্রত্যেকটা হারই আমার জন্য কঠিন ছিল।
প্রশ্ন: পরের অধিনায়ক কে হতে পারে?
মাশরাফি: কারও নাম বলা কঠিন। এটা বোর্ডের সিদ্ধান্ত। সাকিব তো এখন বাইরে, সিনিয়র আরও যে তিনজন আছে, তাদের মধ্য থেকে কেউ হতে পারে।
প্রশ্ন: তরুণ কাউকে দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না?
মাশরাফি: একজন তরুণ খেলোয়াড় যখন বাংলাদেশ দলের জার্সি পরে নামে, সেটাই তার জন্য অনেক বড় চাপ। মানুষ, মিডিয়া তাকিয়ে থাকে। হ্যাঁ, ক্রিকেট বোর্ড বা কোচিং স্টাফদের যদি মনে হয় যে এই (তরুণ) অতটুকু চাপ সামলানোর মতো, তাহলে কে নয়? কিন্তু আমার মনে হয়, অনেক ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ, দলে ১২/১৩ বছর যারা পার করেছে, তারা কিন্তু বাইরের চাপগুলো নিতে পারে।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ থেকে এ পর্যন্ত যাত্রা…
মাশরাফি: অবশ্যই কঠিন। কিন্তু আমি এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। কারণ, আমি মনে করি, হার মেনে নেওয়াটা কোনো সমাধান হতে পারে না।
প্রশ্ন: অধিনায়কত্ব মিস করবেন কি না?
মাশরাফি: অধিনায়কত্ব শুরুর সময়ও মনে করিনি আমি অনেক বড় কিছু। এখন আমার আরেকটা পরিচয় আছে, এমপি; এখনো ও রকম (নিজেকে বড় কিছু) ভাবি না। লাল পাসপোর্ট নিইনি, বাড়ি নিইনি, গাড়ি নিইনি। অধিনায়ক হিসেবে আমি এই চেয়ারটা (প্রেস কনফারেন্সের চেয়অর দেখিয়ে) পাওয়ার আগ পর্যন্ত চেয়ারটা পাওয়ার আকাক্সক্ষা ছিল। কিন্তু যখনই চেয়ারটা পেলাম, ওখানেই সব আকাঙ্খার শেষ লেখা হয়ে গেছে। তখন শুধু ভাবতাম, কীভাবে এই চেয়ারটাকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ দলের অধিনায়কত্ব করা কতটা কঠিন? এ দেশের প্রত্যেকেরই ক্রিকেট নিয়ে নিজস্ব মাতমত থাকে, বিসিবি থেকেও চাপ থাকে…
মাশরাফি: যেভাবেই হোক আমাকে তারা (বিসিবি) সহযোগিতা করেছে। আপনি যেটা বললেন, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখন যদি মাইকটা সরিয়ে দেন, তাহলে হয়তো কথার ঝুড়ি খুরে দিতে পারব। আমরা মাঠে নামি বাংলাদেশ নামটার জন্যই। যখন আমার ভুল ধরা হয়, আমি স্বাভাবিকভাবেই সেটা আর করতে পারি না। মনে হয় ভুলই তো করেছিলাম! এটা যদি হতো যে আমি পরিবারের জন্য মাঠে নামছি, তাহলে হয়তো তর্ক করতে পারতাম। নামটা যখন বাংলাদেশের, তখন তর্কের জায়গাটা থাকে না। দিন শেষে খেলোয়াড়দেরই মাথা নত করে থাকতে হয়। আবার একটা জিনিস দেখবেন, আমাদের ছোট ভাইয়েরা যারা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতে এল, এরা কি কেউ বলেছে যে সে খুব বড় কিছু করে ফেলেছে? কিন্তু ওরা যখন ব্যর্থ হবে, তখন আলোচনা শুরু হয়ে যাবে যে ওরা এ রকম হয়ে গিয়েছিল, ও রকম হয়ে গিয়েছিল। আমরা খেলোয়াড়েরা তো চাই না, আপনারা আমাদের খুব বড় করে ফেলেন, আমাদের বাবা-মায়ের সাক্ষৎকার নেন। এগুলো আপনারা করেন, মানুষজন দেখে। এরপর ওভাবেই প্রতিক্রিয়া দিতে থাকে।
প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা…
মাশরাফি: আমি আজ যা কিছুÑ সব ক্রিকেটের কারণে। ক্রিকেট না খেললে হয়তো মাছের ব্যবসা করতাম। পারিবারিক ব্যবসা আছে, ঘের আছে। সামনে আমার যত পরিকল্পনা, অবশ্যই তার প্রধান অংশে ক্রিকেটই থাকবে। যদি খেলোয়াড়েরা কখনো ব্যক্তিগতভাবে মনে করে, আমাকে যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় প্রয়োজন, অবশ্যই আমি থাকব।