Home এক্সক্লুসিভ আপস করতে করতে আমি এখন ক্লান্ত!- মোশাররফ করিম

আপস করতে করতে আমি এখন ক্লান্ত!- মোশাররফ করিম

SHARE

শুধুমাত্র তাকে একনজর দেখবে বলে দূর দুরান্ত থেকে ছুটে এসেছে মানুষ। তাকে সামনাসামনি একনজর দেখতে চাই এমনই আকুতি সবার। তাই তো একজন খবরটা জানা মাত্র আরো দশজনকে জানিয়ে দেয়। শুধুমাত্র তাকে একটু দেখবেন বলে, মুঠোফোনে একটা সেলফি তুলবেন বলে সবার যতো ব্যস্ততা…। সবমিলিয়ে তিনি যেখানে শুটিং করছিলেন সেখানে লোকে লোকারণ্য বলা যায়। একটা ব্যারিকেড দিয়ে উৎসুখ হাজার হাজার মানুষকে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। তাতেও যেনো তাদের ধরে রাখা যাচ্ছে না। দূর থেকে তার নাম ধরে ডাকা শুরু করেছেন অনেকেই। হ্যাঁ, পাঠক এই অভিনেতা আর কেউ নন- তিনি সবার প্রিয় মোশাররফ করিম। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় একজন অভিনেতা তিনি। সম্প্রতি একটি নাটকের শুটিংয়ে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে ঘিরে রীতিমত একটা উৎসব মুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় একটি পালবাড়িতে শুটিং করেন জনপ্রিয় এই অভিনেতা। এরইমধ্যে শুটিং স্পটে আনন্দ আলো টিম হাজির। পুরো শুটিং লোকেশন ঘুরে এবং জনপ্রিয় এই অভিনেতার সঙ্গে কথা বলেছে আনন্দ আলো টিম। শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে আনন্দ আলোর সাথে কথা বলেন মোশাররফ করিম। লিখেছেন সৈয়দ ইকবাল

আনন্দ আলো: এই যে এতো এতো জনপ্রিয়তা, কেমন উপভোগ করেন?
মোশাররফ করিম: এক কথায় উত্তর হলে বলবো- ভালো। তবে এই ভালোর পরও কথা আছে। অনেক সময় এমন এমন পরিস্থিতি হয় যে, সত্যিই খুব খারাপ লাগে। দেখা গেছে একটি সিরিয়াস দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছি কিংবা আমার প্রিয় কোনো মানুষ মারা গেছে সেই দৃশ্যে অভিনয় করে মাত্র একটু বসলাম। তখুনি কেউ এসে দাঁত কেলিয়ে কেলিয়ে হেসে নানান কথা বলতে শুরু করলো অথবা হাসি দিয়ে সেলফি করুণ দৃশ্যে তুলতে বললো। কেমন লাগে তখন? ঐ মানুষটিও কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে দেখলো সবেমাত্র আমি অভিনয় করেছি। কিন্তু তারপরও ঐ মানুষটির একটুও কমনসেন্স হয় না যে, এখন কথা না বলি বা পরে ছবি তুলি। অনেকে মনে করেন আমি কমেডি চরিত্রে অভিনয় করেছি মানে আমি মানুষটাই বুঝি কমেডিয়ান।
একবার আমি রাঙামাটি কিংবা বান্দরবান থেকে শুটিং করে ফিরছিলাম। রাস্তায় একজন মানুষ আমাকে দেখে কাছে এসে এমনভাবে কথা বলছিল এবং এমন আচরণ করছিল মনে হচ্ছিলো আমি যেন একটা চিড়িয়াখানার প্রাণী। তিনি ধরেই নিয়েছেন আমি মানুষটা তার পর্দার সেই মানুষ। কিন্তু আমি যে তার মতোই একজন মানুষ এবং তিনি যেমন ক্যারিয়ারে ব্যাংকে চাকরি করেন কিংবা ব্যবসায়ী কিংবা অন্যকিছু… সেটা যেমন তার পেশা। আমার পেশা হচ্ছে- আমি অভিনয় করি। আরেকটি কথা ক্লিয়ার করে বলি।
অনেক সময় অনেককে দেখেছি- মাত্র পর্দায় কান্না কিংবা সিরিয়াস কোনো চরিত্রে অভিনয় করে এসেই স্বাভাবিক হয়ে আবার মানুষদের সাথে কথা বলেন, ছবি তোলেন আবার গল্পও করেন। কিন্তু আমি এটা পারি না। আমি চরিত্রের মধ্যে এতো সিরিয়াসভাবেই ঢুকে যাই- যে সেখান থেকে স্বাভাবিক জীবনে আসতে আমার সময় লাগে। এজন্য আমি সেটে কাজের বাইরে খুব একটা কথা বলি না। আবার কখনো শুটিং বাদে আড্ডা হলে কিন্তু সেখানে আমি আড্ডা দিতেই থাকি।
আনন্দ আলো: এই যে চরিত্রের মধ্যে ডুব দেয়া, সেখানে হারিয়ে যাওয়া কিংবা চরিত্রটা লালন করা, একটি চরিত্র নিয়ে আপনার প্রস্তুতিটা কেমন থাকে?
মোশাররফ করিম: আমি যতক্ষণ পর্যন্ত চরিত্রটা ধারণ করতে না পারি, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই না। অনেক সময় এমনও হয়েছে আমার সকাল নয়টা কিংবা দশটায় কোনো নাটকের কলটাইম ছিল। দেখা গেছে আমি গিয়েছিও সময় মতো। কিন্তু ঐখানে যাওয়ার সময় নিজের মনের মধ্যে কোনো বিষয়ে একটা দোদুল্যমান অবস্থা শুরু হয়েছে অথবা অস্থির লাগছে। আমি তখন আমাকে আগে বুঝে নেই। আমি বুঝে ফেলি- চরিত্রে আমি এখনো সেট হইনি। আমার এমনও হয়েছে সকাল সকাল অনেক সময় সেটে যাওয়ার পরও শুধুমাত্র কোনো চরিত্র নিয়ে কনফিউজড থাকার কারনে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াইনি। এরকম অনেক ঘটনা আছে। তাই আমি আমার চরিত্রের প্রস্তুতিটা ঠিকমতো নিয়েই কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
আনন্দ আলো: যে নাটকটিতে অভিনয় করছেন তা নিয়ে একটু বলুন-
মোশাররফ করিম: পুজা উপলক্ষে এটি একটি বিশেষ নাটক। এই নাটকে আমার চরিত্রটি একটু ভিন্ন। এখানে আমি পাল বংশের একটা ছেলে। যে কিনা মূর্তি বানায়। এই মূর্তি বানানো আর নিজের মধ্যে একটা সাইকোলজিক্যাল দ্বন্দ্ব নিয়েই নাটকে গল্প এগিয়ে যায়। ভালোবাসা পাওয়া আর না পাওয়া নিয়ে গল্প এগিয়ে গেলেও গল্পের মধ্যে একটা দর্শন আছে। এতে আমি ছাড়াও আরো অভিনয় করেছেন নুসরাত জান্নাত রুহী, মিম মানতাসা, ওয়াহিদ ইকবাল মার্শাল সহ আরো অনেকে।
আনন্দ আলো: অনেকেই বলেন- আপনি নাকি ইদানিং কিছুটা বেছে বেছে কাজ করছেন?
মোশাররফ করিম: মাঝে কিছু অনুরোধ রাখতে গিয়ে নি¤œমানের কাজ তো করা হয়েছেই। আজ থেকে প্রায় এক বছর আগে বলেছিলাম- আমি কিছু পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছি। সেটা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছি। গত দুই ঈদে আমার কাজগুলো দেখলেই বোঝা যায়। এখন যে কাজগুলো করছি সেগুলো প্রচারে আসলেও দর্শক বুঝতে পারবেন- মোশাররফ করিম নিজেকে বদলে ফেলেছেন।
আনন্দ আলো: তারকা হওয়ার আগে মোশাররফ করিম কেমন ছিল? আগেকার কথা কী মনে পড়ে?
মোশাররফ করিম: প্রায়ই আমাকে অনেকে একটা কথা বলতে চায়, আমি অনেক স্ট্রাগল করে বড় হয়েছি। এটা ঠিক নয়। আমি আসলে স্ট্রাগল করা ছেলে নই। আমার যা ভালো লাগে আমি তাই করি। যেমন আমাকে ছোটবেলায় কখনো বাজারে পাঠাতে পারত না কেউ। দর-কষাকষি আমার ভালো লাগে না। এখনো যে এসির মধ্যে বাজার, সেখানে গিয়েও বাজার করতে ভালো লাগে না। কিন্তু আমি যখন নাটকের দলে যোগ দিই, তখন থাকতাম খিলগাঁওয়ে। দলের মহড়া হতো নীলক্ষেতে। অনেক দিন আমি হেঁটে হেঁটে গিয়েছি সেখানে। যদি কেউ বলে এই হেঁটে যাওয়া স্ট্রাগল, তাহলে সেটা আমি মানব না। হেঁটে যেতেই আমার আনন্দ লাগত।
আমি কিন্তু ছোটবেলা থেকেই অভিনয় জীবন শুরু করি। বাবা যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। আমি কখনো তার অভিনয় দেখিনি। আমার রক্তে অভিনয়। একটা সময় ঢাকায় থিয়েটারের সাথে সম্পৃক্ত হই। আমার কাছে থিয়েটার হচ্ছে এমন জায়গা, যেখানে অভিনয় করতে, এমনকি যেকোনো কাজ করতেই ভালো লাগত। আমার মনে হতো, আমি একটা দারুণ কাজ করছি। একজন কবি বা লেখক একটা লাইন বা কবিতা লেখার পর যে আনন্দটা পান, মঞ্চ তো আমাকে প্রতিদিন সে আনন্দ দিত। ১৯৯০ সালে থেকে সেই অনুভূতি নিয়ে আমি বড় হয়েছি। মনে আছে নাট্যকেন্দ্রের নাম তখনো ঠিক করা হয়নি। শুরু হয়েছে ফরম বিতরণ। প্রায় চৌদ্দ-পনেরো শ ছেলেমেয়ে ফরম সংগ্রহ করেছিলেন সেবার। সবাইকে ধাপে ধাপে ডাকা হলো। আমিও যাই সেখানে। তাদের মধ্যে আমার সাথে জাহিদ হাসানও ছিলেন। আমাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন হুমায়ুন ফরীদি ও তারিক আনাম খান ভাই। ফরীদি ভাই জানতে চাইলেন, ঢাকায় আমি কী কী নাটক দেখেছি। প্রিয় লেখক কে? যত দূর মনে পড়ে প্রিয় লেখকের নামের জায়গায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম বলেছিলাম। এভাবেই আমার থিয়েটারে অভিনয় শুরু হয়। আমি মঞ্চে প্রথম ‘বিচ্ছু’ নাটকে অভিনয় করি।
পুরোদস্তুর অভিনেতা হওয়ার আগে শিক্ষকতা করেছিলাম। সেটা ছিল টিউশনি ও কোচিং সেন্টারের শিক্ষক। এর আগে খ-কালীন জরিপের কাজও করেছিলাম। কতো কিছুই না করেছিলাম জীবনে। মনে পড়ে এইডস বিষয়ক ক্যাম্পেইনিংয়ের একজন সমন্বয়কারী ছিলাম। আবার চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনী পোস্টারও ডিজাইন করেছি। আমি মাঝেমধ্যে এখন ভাবি, তখন কী আমি খুব কষ্টে ছিলাম, খারাপ সময় যেত আমার? আমি উত্তর খুঁজে পাই না। আমার কাছে তো মনে হয় ওটা একটা দুর্দান্ত জীবন ছিল আমার। অনেক বেশি মুক্ত ও স্বাধীন জীবনযাপন ছিল। অর্থ মানুষের জীবনে জরুরি, কিন্তু খুব যে জরুরি, এটা বলব না। বেঁচে থাকার জন্য যতটা জরুরি, সেটা হলেই তো যথেষ্ট। টাকা থাকলে খরচ হবে এটাই স্বাভাবিক। টাকার জন্য জোরজবরদস্তির কিছু নেই।
আনন্দ আলো: এই যে টাকার কথা বললেন, আপনাকে নিয়ে একটা অভিযোগ আছে, নাটকে সবচেয়ে বেশি সম্মানী আপনি নেন। নাটকের অর্ধেক বাজেট আপনাকে সম্মানী হিসেবে দিতে হয়…

মোশাররফ করিম: আমার সম্মানী কিন্তু আমি বাড়াইনি। আমি কোনো দিনই বলিনি আমাকে এত টাকা দাও। আমার সম্মানী বাড়িয়েছেন প্রযোজক ও পরিচালকেরা। এটাও তো সত্য, আমার অভিনীত নাটক বেশি দামে বিক্রিও হয়। সবকিছুরই একটা ব্যালেন্স করতে হবে। সব প্রোডাকশনের মূল্যও তো একরকম হয় না।
আনন্দ আলো: কোনো কিছুর জন্য আফসোস হয়?
মোশাররফ করিম: আমার ব্যক্তিগত পাওয়া না পাওয়ার চেয়েও মনে হয়, আমাদের সংস্কৃতি বিশেষ করে নাটকের অবকাঠামোগত অবস্থাটা আজও ঠিকঠাক হলো না। এটাই আমার কাছে বড় অপ্রাপ্তি। প্রায়ই মনে হয়, ঠিকমতো কাজ করতে পারলাম না। আমাদের সিস্টেমটা আজও হয়নি। ১০টা মানুষ যখন একটা কাজ করে, তখন স্বাভাবিকভাবে একটা সিস্টেম দাঁড় করাতে হয়। না হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অথচ একটা নাটকের পেছনে কমপক্ষে ২৫-৩০ জন মানুষ পরিশ্রম করে। কিন্তু কোনো সিস্টেম নেই। আমার প্রায়ই মনে হয়, আমি আরও অনেক কিছু করতে পারতাম, করা হয়নি। ওই সিস্টেমটা ঠিকঠাক থাকলে একটা চরিত্রকে অসাধারণ স্তরে নিয়ে যাওয়ার সাধনাটা করতে পারতাম। এমন হয়, আমাকে না জানিয়েই টেলিভিশনে আমি অভিনয় করছি এমন নিশ্চয়তা দিয়ে নাটক পাস করিয়ে আনা হয়। আমরা আসলে বিভিন্নভাবে শিকার হয়ে যাই। আমার করতে ইচ্ছে হয় না, চাচ্ছি না, কিন্তু কাজটি করছি কিংবা কখনো কখনো করতে বাধ্যও হয়েছি। এখন অবশ্য অনেকক্ষেত্রে তা কমিয়ে এনেছি।
আনন্দ আলো: এগুলো নিয়েও তো মনের মধ্যে একটা খারাপ লাগা কাজ করে, তাই না?
মোশাররফ করিম: হ্যাঁ, করে। আমি বাজার করতে ভালোবাসি না, সংসারধর্ম পালন করি না- শুধু অভিনয় করতেই ভালোবাসি। এটাও যদি ঠিকমতো করতে না পারি, তাহলে সেটা ভীষণ কষ্ট দেয়। আপস করতে করতে আমি এখন ক্লান্ত। একটা উদাহরণ দিই। চরিত্রের জন্য একটা চেয়ারে বসতে হবে। বসতে গিয়ে মনে হলো, এটা নাটকের গল্প, সময়, চরিত্র- কোনো কিছুর সঙ্গে চেয়ারটা মানানসই নয়। তাহলে হবে কী, আমি ওই চেয়ারটায় বসে সেই চরিত্রের ফিলিংসটা পাব না, যেটা ওই চরিত্রের পাওয়া উচিত। প্রপস তো একটা অনুভূতি দেয়। তাহলে কী করা উচিত আমার? সুটিং প্যাকআপ করে চলে যাওয়া। এটাই হয়তো স্মার্ট কাজ। কিন্তু আমরা সেটা পারি না। আমাদের দুর্বলতাই এটা। পরিচালক এসে অনুরোধ করেন। তখন মন না চাইলেও কাজটা করতে হয়।
প্রায়ই ভাবি, আমরা যখন থিয়েটার করতাম, তখন একটি টাকাও ওখান থেকে পেতাম না। সেটা প্রফেশনাল জায়গা না। কিন্তু আমরা কাজটা করতাম খুব প্রফেশনালের জায়গায় থেকেই। টেলিভিশনে টাকা পাচ্ছি কিন্তু কাজটা প্রফেশনালি করছি না। বলতে হবে করতে পারছি না। করতে না পারার পেছনে অন্তরায় হলো থিয়েটারে একটা দলে ৩০-৪০ জন সদস্য থাকে। সব কটি সদস্যের মধ্যে একটা দলগত দর্শন কাজ করে। কিন্তু টেলিভিশন নাটকের বেলায় সেই দর্শনটা গড়ে ওঠেনি। নাটকের প্রতি যে ভালোবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা থাকার কথা, তা নেই। থিয়েটার করার সময় আমরা ভাবতাম ‘আমরা একটা মহৎ কাজ করছি’ এবং সেটা সবার অন্তরের মধ্যে থাকত। কিন্তু টেলিভিশনে সেটা হচ্ছে না। যদি পরিচালক, সহকারী পরিচালক, অভিনয়শিল্পী, লাইট, ক্যামেরা, মেকআপসহ সবার মধ্যে ফিলিংসটা হয়, তাহলে সেরা কাজটি হওয়া সম্ভব। সেই কাজটা হয় না, কারণ চর্চার অভাব। সেইভাবে স্কুলিংটা গড়ে ওঠেনি। থিয়েটারে আমরা শিল্পের চর্চার মধ্যে ছিলাম। থিয়েটার করা একটি ছেলে হয়তো কখনোই মঞ্চে উঠবে না, নাটক করবে না, তাই বলে তার মধ্যে শিল্পের চেতনা নেই, তা কিন্তু না। টেলিভিশন নাটকে শিল্পের চেতনার অভাবটা প্রকট।
একটা ছেলে ইউটিউব বা ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখে ক্যামেরা চালানো শিখে নিতে পারে। লাইটটাও শিখতে পারে। কিন্তু শিল্পের ব্যাপারটা তাকে ইউটিউব শেখাবে না। এটা বোঝার জন্য শিল্পের মধ্যে বসবাস দরকার। শুধু ক্যামেরা নয়, এটা লাইট, প্রোডাকশন সব ক্ষেত্রেই। বুঝতে হবে, তারা যে কাজটা করছে সেটা অন্য দশটা কাজ থেকে আলাদা। আমি যে কাজটা করছি এটা শিল্পের কাজ, একটা গ্রেট ওয়ার্ক, এই অনুভূতিটা আসতে হবে। এটা যেদিন সবার মধ্যে ছড়াবে, সেদিনই পরিবর্তন ঘটবে।
আনন্দ আলো: টেলিভিশনে আপনার অভিনীত প্রথম নাটক প্রচারের কথা মনে আছে?
মোশাররফ করিম: আমার অভিনীত প্রথম নাটক ‘অতিথি’ ১৯৯৯ সালে বিটিভিতে প্রচার হয়। কিন্তু আমার প্রথম নাটক ‘স্বপ্নের পাঠশালা’। যত দূর মনে পড়ে, সুমন আনোয়ার ও অনন্ত হিরার রচনা ও পরিচালনা ছিল নাটকটি। এটি প্রচারিত হয়েছে অনেক পরে। তারপর টুকটাক কাজ করেছি। অন্য কাজের ফাঁকে অভিনয়। তাই পুরোদস্তুর অভিনেতা বলা যাবে না। ‘অতিথি’ও ওই সময় করা। টুকটাক যা-ই করতাম, সেগুলো হয় চাকর, না হয় নায়কের বন্ধু জাতীয় কোনো চরিত্র। খুব মন খারাপ হতো। এ কারণে একসময় ভেবেছিলাম- অভিনয়ই আর করব না। মাঝের দু’তিন বছর করিনি। তখন কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করতাম। পুরোপুরি অভিনয় শুরু করলাম ২০০৫ সালের দিকে। ঈদুল ফিতরে করলাম ‘হেফাজ ভাই’ এবং ঈদুল আজহায় ‘ক্যারাম’। দুটি নাটকই বেশ পছন্দ করল সবাই। তখনই অভিনয়ে মনোযোগী হলাম। মনে আছে ‘ক্যারাম’ নাটকটি প্রচারের পর থেকে আমার চারদিকে জনপ্রিয়তা ছড়াতে থাকলো। মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর পরিচালনায় নাটকটি দর্শক এতো পছন্দ করলো যে সেখান থেকেই বলা যায় আজকের মোশাররফ করিম তৈরি হল।

‘পুতুলের সংসার’ নাটকে মোশাররফ করিম ও রুহী

আনন্দ আলো: অনেকেই বলেন, গল্প ভালো নেই, নাটক-সংলাপও উপযুক্ত নয়, অস্থিরতা চলছে নাট্যাঙ্গনে। আপনি কি সমর্থন করেন?
মোশাররফ করিম: আসলে জীবনের সব ক্ষেত্রে ‘সময়’ একটি বড় ফ্যাক্টর। সময় সাপেক্ষে কাজ করার গুরুত্ব অনেক। আমাদের দেশে ভালো নাটক হচ্ছে বটে, তবে অস্থিরতাও আছে। একটি উদাহরণ দিতে চাই, ব্যবসা কিন্তু ভালো বিষয়। যে কোনো ব্যবসায় গ্রাহক ধরতে ভালো পণ্যই তৈরি করতে হয় বিক্রির জন্য। খারাপ পণ্য কেন গ্রাহক কিনবে টাকা খরচ করে? নাটকের বেলায়ও তাই। এক ঘণ্টার নাটক বানাতে যে সময় দরকার, সে সময় কিন্তু আমরা অনেকাংশে পাই না। অন্যদিকে যতটুকু সময় নিয়ে কাজ করা উচিত, সে সময় মাফিক নাটকের বাজেটও কিন্তু দেয়া হয় না। সে পরিপ্রেক্ষিতে যা হওয়ার তা-ই হয়। তবে আমি আশাবাদী একজন মানুষ। আমরা চেষ্টা করছি আরও যতœবান হওয়ার। আমাদের নাট্যাঙ্গন আরও কর্মপরিবেশবান্ধব হবে।
আনন্দ আলো: একটা ভিন্ন প্রসঙ্গে আপনার মন্তব্য নিতে চাই। আমাদের দেশ তথ্যপ্রযুক্তির দিক থেকে দিন দিন উন্নত হচ্ছে। আপনার কী মনে হয়- আমরা মানসিকতার দিক থেকে উন্নত হচ্ছি?
মোশাররফ করিম: আমি সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এই বিষয়ে কথা বলতে চাই। আমরা এখন অনেক নামিদামি মোবাইল ফোন ব্যবহার করি, প্রযুক্তির দিক থেকে এগিয়ে আছি। কিন্তু মানসিকতার দিক থেকে এগুতে পেরেছি? আমাদের মধ্যে কী সেই হিসেবে মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে? অবশ্যই না। যেমন একটি উদাহরণ দেই। আমাদের নাটকের ইন্ডাস্ট্রিতে একজন অভিনেতা আছে যার সাথে এই অভিনেত্রীর বেশ কয়েকটি নাটক প্রচার হয়েছে। সেদিন আমি একটি নাটক দেখছিলাম ইউটিউবে। নাটকটি দেখার সময় ইউটিউবে বেশকিছু কমেন্টস পড়লাম। পড়ে আমার আসলে বেশ খারাপই লাগলো। একটা মেয়ে যার জন্য সে নিজে দায়ী না কোনোভাবেই। কারন সে তো তার বাগদত্তার সাথে সময়টা এক্সপেন্ড করেছে। এমনকি ভিডিওটি তো মেয়েটি নিজে ছড়ায়নি। ভিডিওটি ছড়িয়েছিল তার সেই মানুষটি। এটার জন্য মেয়েটা কিভাবে দায়ী থাকে? আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যার সাথে তার কয়দিন পর সংসার হচ্ছে, একটা জীবন পার করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- সেখানে তো তারা একটা ভালো সময় কাটাতেই পারে। আর ভিডিওটি তো আর সে করেনি। যদিও আমি এমন ভিডিও করাটা অবশ্যই সাপোর্ট করছি না। তবে যেহেতু করেই ফেলেছে সেই মানুষটি যার জন্য মেয়েটি তো আর দায়ী না। আর ভিডিওটা যে ছাড়া হবে সেটাও তো মেয়েটির জানা ছিলো না। আমার কথা হচ্ছে- তখন থেকে এখন পর্যন্ত সবাই মেয়েটির উপরই সকল দোষ আমরা দিয়ে যাচ্ছি। অথচ, সে কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ মানুষের সাথেই সময়টা পার করেছিল। আমার কথা হচ্ছে- যারা দেখে ঠিকই মজা নিচ্ছেন, তা দেখার পর আবার মেয়েটিকেই আজেবাজে কথা বলছেন। এই যে মানসিকতার বিপর্যয়- এটা তো ঠিক না। আমরা তো মানসিকভাবে এগিয়ে যেতে পারিনি এখনো। আমি আবারও বলছি আমি অবশ্যই এরকম ভিডিও করাটা সাপোর্ট করি না। কিন্তু এটা তো আর মেয়েটি করেনি। তাহলে দোষটা মেয়েটির হলো কিভাবে? আবার সেই ভিডিও দেখে একটা আনন্দ উপভোগ করে মেয়েটিকে বকা দিচ্ছে সবাই। তারচেয়ে যেকিনা ভিডিওটি দেখে বলে- ‘বাহ! ভালো লাগলো আমার।’ আমি তাকেই মানসিকভাবে সাপোর্ট করবো।
আনন্দ আলো: অনেকেই মোশাররফ করিমের মতো হতে চায় তাদের জন্য আপনার বক্তব্য কী?
মোশাররফ করিম: আমার প্রথম কথা হলো, মোশাররফ করিম হওয়ার চেষ্টা না করা। কারণ এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আলাদা। সবার মধ্যেই সূক্ষ্ম কোনো গুণ নিশ্চয়ই রয়েছে। সেটা বের করে প্রকাশ করা জরুরি। মাথায় রাখতে হবে, কাঁঠাল কিন্তু চৈত্র মাসে বলে না, আমি কেন পাকি না। প্রকৃতির নিয়মে সে জ্যৈষ্ঠ মাসেই পাকবে। তাই সময়মতো ভালোবাসা দিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। নিশ্চয়ই তুমি জ্বলে উঠবে।