Home শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমি আনসারী, প্রকৌশলী গড়ার কারিগর

আনসারী, প্রকৌশলী গড়ার কারিগর

SHARE

অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী। বাংলাদেশের খ্যাতিমান একজন শিক্ষাবিদ এবং ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ। একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘ তিন দশক ধরে পাঠদান ও গবেষণার পাশাপাশি ভৌত স্থাপনার নকশা, নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। ১৯৯১ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করেই জুনে তিনি লেকচারার হিসেবে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যোগ দেন। ১৯৯৩ সালে বুয়েট থেকে তিনি জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। বুয়েট-জিআইডিপাস (জাপান দুর্যোগ প্রতিরোধ ও নগর সুরক্ষা ইনস্টিটিউট) এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। বাংলাদেশ ভূমিকম্প সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি জেনারেলও ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিক প্রকৌশল উদ্যোগ (ডব্লিউ এস এস আই) এর পরিচালক। যা আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প প্রকৌশল আইএইই দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বাংলাদেশ সরকারের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটিরও সদস্য। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের তিনি আজীবন ফেলো। এবার শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমি তে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক

অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড় জেলায়। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। বাবার নাম এটিএ আনসারী। তিনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মা মনোয়ারা বেগম গৃহিনী। দুই ভাইয়ের মধ্যে আনসারী বড়। বাবা-মা চাইতেন তাদের সন্তান বড় হয়ে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। ঢাকা মেডিকেলে চান্স পাওয়া সত্ত্বেও তিনি ভর্তি হন বুয়েটে। তিনি হয়েছেন একজন সফল প্রকৌশলী। বাবা-মার অনুপ্রেরণা আর নিজের ইচ্ছা থেকেই প্রকৌশলী হওয়া তার। ঢাকার সেন্ট জোসেফ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন ১৯৮২ সালে। ১৯৮৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৯১ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাস করেই লেকচারার হিসেবে যোগ দেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ১৯৯৩ সালে বুয়েট থেকে জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দেন জাপানে। ১৯৯৬ সালে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বিদেশের স্বপ্নযাত্রাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে দেশে ফিরে এসে দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। আবার শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নানা বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিচ্ছেন।
অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষনা করছেন। তার গবেষণা হলো নগর বিপর্যয় প্রশমন, যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের শহর গুলির জন্য মাইক্রোজনেশন মানচিত্রের বিকাশ, বিল্ডিং, লাইফ-লাইন দূর্বলতার মূল্যায়ন, ফ্রি- ফিল্ড এবং সেতুর তথ্য থেকে শক্তিশালী স্থল গতির বৈশিষ্ট পর্যবেক্ষণ, সহজতর পরীক্ষামূলক কৌশলগুলির মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধ নির্মাণ, ঘূর্নিঝড়, বন্যা, আগুন ও টর্নেডোর মতো অন্যান্য নগর বিপর্যয়ের অধ্যয়ন ইত্যাদি।
র্দীঘ তিন দশকের কর্ম জীবনে অধ্যাপক আনসারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রায় ২০০ টির মতো বিভিন্ন গবেষনা নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ জন মাস্টার্স এবং ২ পিএইচডি ছাত্রের তত্ত্বাবধান করেছেন। তার বর্তমান গবেষণা হচ্ছে তৈরি পোশাক গুলির জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতির বিকাশ, বেড়িবাঁধ এবং পোল্ডার গুলির ভূমিকম্প প্রতিক্রিয়া।
তিনি ডব্লিউএসএসআই এর পরিচালক। বাংলাদেশ সরকারের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটিরও সদস্য। এ ছাড়াও বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরামর্শক হিসেবে ছোট-বড় বেশ কিছু প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপুণ প্রকল্পে কাজ করেছেন। যেমন- পদ্মা সেতুর ভূমিকম্প নির্ধারণ, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভূমিকম্প মূল্যায়ন, পদ্মা রেল লিঙ্ক প্রকল্পের ভূমিকম্প মূল্যায়ন। বঙ্গবন্ধু রেল ব্রিজ প্রজেক্ট, সিলেট বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্ট, কোয়াসটাল ব্লেট এরিয়াতে জিকা ফাউন্ডেড পোল্ডার অ্যাসেসমেন্ট প্রজেক্ট, রাজউকের ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রজেক্ট, মেঘনা ঘাট পাওয়ার প্ল্যান্ট সহ অসংখ্য বিল্ডিংয়ের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন। এছাড়াও রাজউকের আরবান রেসিলেন্সী প্রকল্প ও রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এই দুটি প্রকল্পে তিনি উপদেষ্টা কমিটির সদস্য। চেয়ারম্যান।
যে সব ভবন তৈরি হয়ে আছে সে গুলোকে কীভাবে ভূমিকম্প সহনীয় হিসেবে হড়ে তোলা যায়? এ প্রশ্নের উত্তরে অ্যধাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, শুরুতেই ভবন গুলোর ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট বা বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়ন করে নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ভবনটি যেখানে রয়েছে সেখানকার মাটি পরীক্ষা করা, ভবনটির ফাউন্ডেশন বা ভিত্তির ওজন নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কী না, ভবনের কলাম ও বিমে পর্যাপ্ত রড আছে কী না, কলামের ধারণক্ষমতা রয়েছে কি না ইত্যাদি বিষয় গুলো। এ গুলো পরীক্ষা করে ভবনে কোনো সমস্যা থাকলে সে গুলোর সমাধান করা যায়। ফেরোস্কেনিং ও ফোরকাটিংয়ের মাধ্যমে সহজেই এ পরীক্ষা করা যা।
সেটা কী ভাবে? শুরুতে ডিটেইলড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্টের ম্যাধমে সমস্যা চিহ্নিত করে নিতে হবে। এজন্য প্রতি বর্গফুটে খরচ হতে পারে ৫ থেকে ১০ টাকার মতো। অর্থাৎ ২০০০ বর্গফুটের ছয় তলা একটি ভবনের মূল্যায়ন করতে খরচ হবে মাত্র ৬০ হাজার টাকা। গড় হিসাব করলে এটা খুব বেশি নয়। মূল্যায়নের পর যদি কোনো সমস্যা থাকে, সে সমস্যা সমাধানের জন্য ভবনটিকে রেট্রোফিট করে নিতে হবে। রেট্রোফিট হলো এমন একটি প্রযক্তি যেটা দিয়ে পুরোনো ভবন না ভেঙে যথাযথ শক্তিশালী করা। এ পদ্ধীতিটি কিছুটা ব্যয় বহুল, যদিও নিরাপত্তার বিচারে সেটা অনেক বেশি নয়। এটি করতে প্রতি বর্গ ফুটে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এ হিসাব ২০০০ বর্গফুটের ছয় তলা একটি ভবনের রেট্রোফিট করতে খরচ হবে ৬০ লাখ টাকা। ওই ভবনটি যদি ১০টি ফ্ল্যাটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট হয় তাহলে প্রতি মালিকের খরচ হবে ছয় লাখ টাকা করে। নিরাপত্তার দৃষ্টি কোন দিয়ে দেখলে এটি খুব বড় ব্যয় নয়। রেট্রোফিট করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশেও উদাহরণ রয়েছে এর মধ্যে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে খাদ্য মন্ত্রনালয়ের একটি ভবনকে রেট্রোফিট করা হয়। এটি আগে চার তলা ছিল। কলাম ছিলই না। আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে গুলশান শুটিং ক্লাবের উল্টো দিকে উইকে এআইডির একটা ভবন। আজকাল অনেক ভবন নতুন ভাবে রেট্রোফিট করা হচ্ছে। গত ৫ বছরের ২০০টি তৈরি পোশাক শিল্পের ভবন রেট্রোফিট করা হয়েছে।

আর আনন্দের সক্ষমতার কথা বলতে গেলে বলতে পারি যে আজ থেকে কয়েক বছর আগেও একটা ভবন ভূমিকম্প সহনীয় কী না, তা বলার মতো দক্ষ প্রকৌশলী আগে হয়তো ৫০ থেকে ১০০ জন ছিলেন আমাদের এখন সংখ্যাটি ৫০০ এর মতো হবে। এখন কমপক্ষে ৫০টি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কী ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন? এ প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক আনসারী বলেন, ভবন নির্মাণে সতর্কতার ক্ষেত্রে অনেক গুলো বিষয় মাথায় রাখতে হবে। যেমন রি-ইনফোর্সড কংক্রিটের শুরুতে লোহার যে বেড় তৈরি করা হয়, সেটির টাই রডকে ১৩৫ ডিগ্রি কোণে বাঁকিয়ে ভেতরের দিকে ঢুকিয়ে দিতে হবে। এছাড়া ভবনের বিমের ও কলামের বিল্ডিংয়ের রডকে কোড অনুসারে ডিটেইলিং করার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। এতে ভবন নির্মাণের ব্যয় সামান্য বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া ভবন যদি প্রস্থের চেয়ে দৈর্ঘ্যে অনেক বেশি হয়, তাহলে এর বিভিন্ন অংশ আলাদা করা যেতে পারে। যেমন লিফটের অংশটুকু মূল ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত না হলে ভালো হয়। আবার খেলায় রাখতে হবে, ঘরের জানালা যেন খুব বেশি বড় না হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হলো ইমারত নির্মান করা। বিল্ডিং কোডের মূল ব্যাপারটি হচ্ছে জীবনের নিরাপত্তা। এসব ভবন বিধ্বস্ত হলেও জীবন বেঁচে যাবে। কিন্তু এ জন্য প্রতি বর্গফুটে ৮০ থেকে ১০০ টাকা খরচ করাই যথেষ্ট। এ প্রক্রিয়ায় কিছু বাড়তি রড দিতে হবে। বিল্ডিংটা যাতে বাঁশের মতো হয়, বাঁশ যেমন মচকায়। ভাঙে না, তেমন করে তৈরি করতে হবে। এ ধরনের ভবনে ভূমিকম্প হলেও আমরা অবস্থান করতে পারব। এ ধরনের ভবনই আমাদের দেশে এখন অনেক বেশি। আমাদের এখানে পাঁচ হাজার টাকা বর্গফুটের ফ্ল্যাট যেমন রয়েছে তেমনি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বর্গফুটের ফ্ল্যাটও বিক্রি হচ্ছে। এত ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুটের ৮০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি ব্যয় খুবই নগন্য। আরেক ধরনের ভবন হচ্ছে, যে গুলোকে বলা হয় ইমিডিয়েট অকুপেনসি। বড় ঝাঁকুনিতেও একেবারেই ভাঙবে না। এ জন্য বর্গফুটে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচ বাড়বে।

জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী মনে করেন ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলা, দূর্যোগ প্রস্তুতি, দুর্যোগকালী করনীয় এবং দূর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা ও উদ্যোগের বিকল্প নেই। প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে যথাযথ উদ্যোগ নিলে ঝুঁকির পরিমানটিই কমিয়ে আনা যায়। আমরা তো ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারব না। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারনী কর্মকান্ড, নিয়ন্ত্রক সংস্থা গুলোর তদারকি এবং মানুষের সচেতনতাই পারে বড় ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে।
১৯৯১ সালে তিনি বিয়ে করেন। স্ত্রী নাম সাদিয়া আফরোজ। এই দম্পতি তিন কন্যা সন্তানের জনক জননী। বড় মেয়ে মাইসুন মালিহা দেশের বাইরে থাকেন। দ্বিতীয় মেয়ে মুসফিকা আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশুনা করছে। আর ছোট মেয়ের নাম মুনিবা। এই শিক্ষাবীদ ও প্রকৌশলী তার কাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ভালোবাসেন।