SHARE

রেজানুর রহমান

মোবাইল ফোন নিয়েই কথা উঠলো। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথকে সত্যজিত রায় প্রশ্ন করলেনÑ গুরুদেব এই সময়ে আপনি যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনার লেখা কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্পে মোবাইল ফোনের ব্যবহার তুলে ধরতেন। আপনার উপন্যাসের নায়ক অমিত রায়ের হাতে নিশ্চয়ই দামি মোবাইল ফোন থাকতো?

কবি গুরু আকাশ থেকে নিচের দিকে তাকালেন। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পাশেই বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর আকাশে শীতল পাটি বিছিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন সবাই। আড্ডার আয়োজন করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনিই সবাইকে একত্র করেছেন। উদ্দেশ্য বাংলা ও বাংলা ভাষার জন্য কাজ করেছেন সংস্কৃতিবান প্রয়াত গুণী মানুষদেরকে পৃথিবীতে পাঠানো। প্রথম দফায় তারা সবাই বাংলাদেশ ভ্রমণ করবে। নিজেদের কর্মের জায়গাগুলো কেমন আছে তা সরেজমিন যাচাই করে আবার ফিরে আসবে আড্ডায়। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনেক বলে কয়ে আড্ডায় হাজির করা গেছে। তিনি প্রথমেই একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেনÑ দ্যাখো, নজরুল থাকবে তো তোমাদের আড্ডায়। ও না থাকলে আমি কিন্তু থাকবো না। অনেকদিন নজরুলের সঙ্গে দেখা হয় না। এই সুযোগে দেখা হবে। যাও নজরুলকে যদি হাজির করতে পার তাহলে আমিও হাজির থাকবো। হুমায়ূন আহমেদ কবি গুরুকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন গুরুদেব শুধু আমাদের বিদ্রোহী নজরুল ইসলামই নন বাংলা ভাষার জন্য কাজ করেছেন আপনার অনেক প্রিয় মানুষ আড্ডায় উপস্থিত থাকবেন। এই… যেমন ধরেন সত্যজিত রায়, উত্তম কুমার, সূচিত্রা সেন, ফিরোজা বেগম, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হকসহ আরও কয়েকজনকে আড্ডায় আমন্ত্রণ জানান হয়েছে। আশাকরি সবাই আড্ডায় হাজির থাকবেন।

আড্ডার জায়গা হিসেবে বুড়িগঙ্গার উপরিভাগকেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কবি গুরুই বলেছিলেন বুড়িগঙ্গার উপরই আড্ডার আয়োজন করো। নদীর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আড্ডা দিতে মন্দ লাগবে না। কিন্তু বুড়িগঙ্গা নিয়েই সমস্যাটা দেখা দিয়েছে। দুর্গন্ধে টিকে থাকা মুশকিল। কবি গুরু বারবার একই প্রশ্ন করছেনÑ এটা কি সেই বুড়িগঙ্গা? যার পানি ছিল স্বচ্ছ, টলটল, আয়নার মতো। সেই পানি এত কালো কেন? এই পানিতে কি মাছ বাঁচে? মানুষেরাই বা নিঃশ্বাস নেয় কীভাবে? কী বীভৎস! একটা নদীকে এভাবে সবাই মেরে ফেলছে। না, না আমি পৃথিবীতে যাব না। তোমরা আমাকে ক্ষমা করো। বলতে বলতে চলে যাচ্ছিলেন কবি গুরু। সত্যজিত রায় তাকে সামলালেন। হাত জোড় করে বললেনÑ কবি গুরু আপনি যাবেন না। আপনাকে কাছে পেয়ে আমাদের খুব আনন্দ হচ্ছে। আমরা বরং আড্ডার জায়গাটা বদলাই। বুড়িগঙ্গা থেকে সরে যাই। অন্য কোথায়… এই যে হুমায়ূন এককাজ করো না… তোমার নুহাশ পল্লীতে আমাদের নিয়ে চলো না। ওখানে তো নিশ্চয়ই এরকম দুর্গন্ধ পাওয়া যাবে না। আমরা তোমার নুহাশ পল্লীতে আড্ডা দিয়ে যে যার মতো ঢাকা শহরে বেড়িয়ে পড়বো। সত্যজিতের কথা টেনে নিলেন উত্তম কুমার। বললেনÑ আজকের আড্ডায় বোধকরি একটা শর্ত ছিল। আমরা পৃথিবীতে যাব। কিন্তু কেউ কারও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করবো না। কেউ কারও বাড়িতেও যাব না। যে যেই সেক্টরে কাজ করি সে সেই সেক্টরে যাব, দেখবো, শুনবো। তারপর ফিরে এসে রিপোর্ট করবো। উত্তম কুমারের কথা টেনে নিলেন ফিরোজা বেগম। বললেনÑ আমার অনেক সৌভাগ্য যে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি নজরুলকে কাছে পেয়েছি। বিদ্রোহী কবি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি ফিরোজা… আপনার গানের নায়িকা। আপনাকে অনেকবার গান শুনিয়েছি। আপনি শেষ জীবনে যখন বাংলাদেশে এলেন তখন… আমি আপনাকে গান শোনাতাম, আপনি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতেন… মনে পড়ে? নজরুল শীতল পাটির এক কোনায় চুপচাপ বসেছিলেন। ফিরোজার কথা শুনে হঠাৎ যেন সচকিত হয়ে উঠলেনÑ সেই সময়ের কথা আমার কিছুই মনে পড়ছে না। আমি বাংলাদেশে যাব… আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন?

হুমায়ূন আহমেদ বিদ্রোহী কবিকে থামিয়ে দিলেন। বললেনÑ বুড়িগঙ্গা থেকে আমরা একটু সরে যাচ্ছি। আপনারা নিচের দিকে তাকাতে থাকুন। একটু পরেই পদ্মা নদীর ওপর আমরা থাকব। পদ্মা ব্রিজের নির্মাণ কাজ দেখতে দেখতে আমরা আমাদের কথাগুলো সেরে নিব। তার আগে আমি আজকের বৈঠকের উদ্দেশ্যটা আবার সবার সামনে তুলে ধরছি। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ থেকে বাংলাদেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় নেমে যাব। আমরা সরেজমিন আমাদের কাজের ক্ষেত্র গুলো দেখব। এক্ষেত্রে কোনো ভাবেই আবেগকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। প্রতিবাদও করা যাবে না। যা দেখবেন, যা শুনবেন তাই এসে রিপোর্ট করবেন। আমরা সবার রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম ঠিক করবো। এবার আমি সবার উদ্দেশে কিছু বলার জন্য কবি গুরুকে অনুরোধ করছি।

কবি গুরু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ সবাই আকাশ থেকে নিচের দিকে তাকালো। সবার চোখে মুখে বিস্ময়। এই প্রথম সূচিত্রা সেন মুখ খুললেনÑ ওখানে কি হচ্ছে?

হুমায়ূন আহমেদ গর্বের ভঙ্গিতে বললেনÑ ওখানে পদ্মার ওপর ব্রিজ হচ্ছে!

ওমা তাই নাকি? বলেই একটু এগিয়ে এসে নিচের দিকে তাকালেন সূচিত্রা সেন। বললেনÑ এত মহাযজ্ঞ দেখছি। পদ্মার ওপর ব্রিজ হবে। দেশটাতো সত্যি সত্যি এগিয়ে যাচ্ছে…

সবাই পদ্মা ব্রিজের নির্মাণ কাজের দিকে তাকিয়ে আছে। কবি গুরু এবার স্বতঃস্ফ‚র্ত ভঙ্গিতে সবার দিকে তাকিয়ে বললেনÑ এতক্ষণ আমি তেমন মুড পাচ্ছিলাম না। ভাবছি বাংলাদেশে গিয়ে কি করবো? কি দেখবো? পদ্মার ব্রিজের এই নির্মাণ যজ্ঞ দেখে মনে হলো দেশটাতো সত্যি সত্যি এগিয়ে যাচ্ছে! হ্যাঁ আমরা সরেজমিনে সবকিছু দেখতে যাব। তার আগে সত্যজিতের কথার জবাব দেই। সত্যজিত প্রশ্ন করেছে এই সময়ে আমি জীবিত থাকলে আমার উপন্যাস, গল্পের পাত্র-পাত্রীরা নিশ্চয়ই মোবাইল ফোন, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহার করতো কি না? হ্যাঁ তারা এসব ব্যবহার করতো। অমিত রায়ের হাতে হয়তো দামি মোবাইল ফোন থাকতো। সত্যজিতের ‘নায়ক’ চলচ্চিত্রে উত্তম কুমার নিশ্চয়ই মোবাইল ফোন ব্যবহার করতো। সবই হলো যুগের পরিবর্তন। কিন্তু পরিবর্তনটা কতটা আনন্দের সেটাই বিবেচ্য!

কবি গুরু কথা থামালেন। এবার শামসুর রাহমান, সূচিত্রা সেন কিছু বলবেন বলে সিদ্ধান্ত হলো। সূচিত্রা সেন অপারগতা প্রকাশ করে বললেনÑ আমি যা বলার বাংলাদেশ থেকে ফিরে এসে বলব। শামসুর রাহমান কিছু বলার জন্য উদ্যোগী হতেই আকাশে ঝড় উঠলো। চারদিকে অন্ধকার ধেয়ে এলোÑ আকাশের শীতল পাটিতে কেউ কারও মুখ দেখতে পারছে না। এক সময় ঝড়ের তোপে আকাশ থেকে ছিটকে পড়লো সবাই…।