SHARE

রেজানুর রহমান
ছোট্ট একটা গল্প বলি। রাত পোহালেই ছেলের এসএসসি পরীক্ষা শুরু। বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা। বাবা-মা দু’জনই অস্থির। ছেলেকে বুঝাতে শুরু করেন, বাবা পরীক্ষার আগের রাতই হলো আসল রাত। মনোযোগ দিয়ে পড়ো বাবা। ল²ী সোনা আমার… ছেলে মশারীর নীচে হ্যারিকেন রেখে বালিশের ওপর বই নিয়ে পড়তে শুরু করে। বাবা-মা দু’জনই দারুন খুশি। রাত ১০টা বাজে। মা এক গøাস দুধ হাতে নিয়ে ছেলেকে দেখতে আসেন। ছেলেকে নিজের হাতে দুধ খাইয়ে দিয়ে ‘বাবা ভালো করে পড়’ বলে মাথায় হাত দিয়ে আদর করে চলে যান। রাত ১২টায়ও এসে দেখেন ছেলে পড়ছে। রাত ১টাতে একই অবস্থা। এবার মা ছেলেকে ঘুমানোর জন্য তাগাদা দেন। ‘বাবা হয়েছে আর রাত জাগিস না। এখন ঘুমাতে যা।’ ছেলে ব্যস্ততা দেখিয়ে বলে, মা… অ্যাই আরেকটু… এক সময় মায়ের সন্দেহ হয়। ছেলে সত্যি কি পরীক্ষার পড়া পড়ছে? নাকি… মশারী তুলে ছেলের হাতে বই দেখে অবাক হয়ে যান তিনি। একি করছিস বাবা? পরীক্ষার আগের রাতে এসব কি পড়ছিস?
মা ছেলের হাত থেকে বইটা ছোঁ মেরে নেন। ছেলের তো অস্থির অবস্থা। মা বইটা দাও। খুবই ক্রিটিক্যাল জায়গায় পৌঁছে গেছি। নায়ক বিপদে পড়েছে।
মা ধমক দেন ছেলেকেÑ নায়ক বিপদে পড়েছে তাতে তোর কি? পরীক্ষার আগের রাতে তুই এসব কি পড়ছিস? কাল পরীক্ষায় তুই কি করবি? বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন মা। বাবা দৌঁড়ে আসেন। কি হয়েছে, হ্যা কি হয়েছে…
মা কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, তোমার ছেলের কান্ড দেখো। পরীক্ষার আগের রাতে সে পরীক্ষার পড়া না পড়ে কি সব পড়ছে।
মা বাবার দিকে বইটা বাড়িয়ে দেন। বই দেখে বাবাও অবাক। শোভন এটা তুই কি করছিস? কাল তোর পরীক্ষা। পরীক্ষার আগের রাত মানেই… আর তুই কিনা…
পরীক্ষা নিয়ে ছেলের কোনোই টেনশনই নাই। বাবাকে উদ্দেশ্য করে সে বলে, বাবা বইটা দাও। নায়কের খুব বিপদ?
তাতে তোর কি? নায়কের বিপদ হলে তুই কি করবি? বাঁচাবি গিয়ে…
ছেলে অস্থির হয়ে বলে, তুমি বুঝতে পারতেছ না বাবা। নায়ক যদি হেরে যায় তাহলে আমাদের দেশের অনেক বড় ক্ষতি হবে। কাজেই শেষ পর্যন্ত নায়কের কি হলো আমাকে পড়তেই হবে। প্লিজ বাবা বইটা দাও। পরীক্ষার কথা বলছ তো… দেখে নিও আমার পরীক্ষা ভালোই হবে।
বলা বাহুল্য, বইটা ছিল কাজী আনোয়ার হোসেনের বহুল আলোচিত মাসুদ রানা সিরিজের নতুন বই। পরীক্ষার আগের রাতেও এই বই পড়েছে শোভন এবং পরের দিন বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় খুব একটা খারাপ করেনি। ১০০’র মধ্যে ৮২ নম্বর পেয়েছিল।
প্রিয় পাঠক, বাংলা ভাষাভাষি মানুষের কাছে মাসুদ রানা গোয়েন্দা সিরিজ গ্রন্থের পরিচয় বোধকরি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। একটা সময় ছিল মাসুদ রানা সিরিজের নতুন বই প্রকাশের আগেই গোটা দেশে নবীণ প্রবীণ সকল শ্রেণীর পাঠকের মাঝে একধরনের রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। পত্রিকা ও বইয়ের দোকানে সারাক্ষণ ভীড় লেকেই থাকতো। ‘আসছে কি নতুন বইটা’ এই একটি প্রশ্নে বইয়ের দোকানদার হয়তো বিরক্ত হতেন। আবার কেউ কেউ অবাকও হতেন একটি বইয়ের জন্য পাঠকের এত আকুলতা দেখে। মাসুদ রানা সিরিজের নতুন বই প্রকাশ হওয়া মাত্রই বিক্রির ধুম পড়ে যেত। অনেকে পরিবারে বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে মিলে একটি বই শেয়ার করে পড়তেন। আবার এমনও হতো একটি বই এবাড়ি থেকে ওবাড়ি বেড়াতে যেত। সবার কী যে আদর একটি বইয়ের প্রতি। মাসুদ রানা বলতে সবাই যেন অজ্ঞান।
মাসুদ রানা এই যে কালজয়ী একটি গোয়েন্দা সিরিজ… যার ¯্রষ্টার নাম কাজী আনোয়ার হোসেন। মজার ব্যাপার হলো, মাসুদ রানাকে সবাই চিনেন কিন্তু এর লেখক অর্থাৎ এর ¯্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনকে অনেকেই চিনেন না। প্রচার বিমুখ লেখক তিনি। প্রচার মাধ্যমের কাছে নিজেকে আড়াল করে রাখতেই পছন্দ করেন। গত কয়েক বছর ধরে প্রায় প্রতি ঈদে জীবন্ত কিংবদন্তী এই লেখকের একটি সাক্ষাৎকার আনন্দ আলোয় প্রকাশের আশায় যোগাযোগ করেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু কথা একটাই তিনি নিজের প্রচার চান না। অবশেষে এবার তাকে পাওয়া গেল। তবে শর্ত দিলেন লিখিত প্রশ্ন চাই।
বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক মাসুদ রানা সিরিজের ভক্ত আমীরুল ইসলামের সাথে পরামর্শ করে প্রশ্ন পাঠানো হলো। নির্ধারিত তারিখের একদিন আগেই প্রশ্নের উত্তর এলো আনন্দ আলোর দফতরে। ছবি তোলার ব্যাপারেও রাজি হয়েছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১২টা একঘণ্টা সময়। নির্ধারিত দিনে পৌঁছে গেলাম তাঁর সেগুনবাগিচার বাড়িতে।
আনন্দ আলোর সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের পরামর্শক্রমে আনন্দ আলোর পক্ষে কাজী আনোয়ার হোসেনের পুত্রবধু লেখিকা মাসুমা মায়মুরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলেন চ্যানেল আইয়ের প্রতিনিধি গোলাম হাবিব লিটু। নির্ধারিত দিনে আমাদেরকে স্বাগত জানালেন মাসুমা মায়মুর। তার স্কুল পড়–য়া দুই ছেলে আমাদেরকে দেখে এটা ওটা প্রশ্ন করছে। একটু পরেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী গোয়েন্দা সিরিজ মাসুদ রানার ¯্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন। মুখে মিষ্টি হাসি। দুই নাতি তাকে দেখেই আনন্দে হই চই করে উঠলো। ছোটখাটো একটা আড্ডা শুরু হয়ে গেল আমাদের। অবাক বিস্ময়ে বার-বারই তাকাচ্ছিলাম এই গুণী লেখকের দিকে। লেখক জীবনের কত গল্পই না তাঁর স্মৃতিতে জমা হয়ে আছে। যখন চিঠির যুগ ছিল তখন প্রতিদিন ডাক বিভাগের লোকজন সেবা প্রকাশনীর দফতরে বস্তায় ভরা চিঠি দিয়ে যেতেন। প্রতিটি চিঠিই মনোযোগ দিয়ে পড়তেন কাজী আনোয়ার হোসেন। এখন আর সেভাবে চিঠি আসে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাসুদ রানা সহ সেবা প্রকাশনীর অন্যসব সিরিজের বইকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘ফ্যান পেইজ গড়ে উঠেছে’ আর তাই এখন মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই পাঠকদের সাথে মতবিনিময় করেন লেখক। মৃদু হেসে বললেন, তবে চিঠির মজাটাই আলাদা। চিঠি পেলেই পাঠকের হাতের স্পর্শ অনুভব করতাম। চিঠি পড়েই বুঝে ফেলতাম কতটা আবেগ দিয়ে চিঠিখানা লেখা হয়েছে।
কাজী আনোয়ার হোসেন শারিরীক ভাবে কিছুটা অসুস্থ জীবন যাপন করছেন। তাই বাড়ির বাইরে তেমন একটা বের হন না। আদরের দুই নাতির সাথেই মূলত তার অবসর সময়টা কাটে। বাড়ির ছাদে বাগান করেছেন পুত্র বধু মাসুমা মায়মুর। বিকেলে রোদ পড়ে গেলে ছাদ বাগানে হাঁটাহাটি করেন। মন চাইলে দুই নাতি কখনও বা পুত্র বধুর সাথেও দাবা খেলায় মেতে ওঠেন।
সেদিন অনেকক্ষণ আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়েছে প্রিয় লেখকের সাথে। অনেক কথা হয়েছে। আজ ওসব কথা থাক। আমরা বরং আনন্দ আলোর দেয়া লিখিত প্রশ্নের আলোকে তাঁর লিখিত উত্তরের দিকেই এবার চোখ ফেরাই….