Home প্রতিবেদন শাহ সিমেন্ট সুইট হোম সৈয়দ কুশল এর স্থাপত্য ভাবনা

সৈয়দ কুশল এর স্থাপত্য ভাবনা

SHARE
Kosul

তারুণ্যের হাত ধরে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে হাঁটছে আমাদের প্রিয় মাতৃভ‚মি বাংলাদেশ। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদানের জন্য কাজ করে চলেছেন তরুণ স্থপতি সৈয়দ আবু সুফিয়ান কুশল। ২০১০ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগ থেকে ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রি লাভ করেন। স্থাপত্য বিভাগে তৎকালীন সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জন করে প্রথম হন। শিক্ষা জীবনে কৃতিত্বের জন্য তিনি গোল্ড মেডেল অর্জন করেন। মেধা ও শিল্পচর্চার অসাধারণ সমাহার তাকে একজন সফল স্থপতি হতে সহায়তা করেছে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগে অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি স্থাপত্যচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ যাবৎ তিনি বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। স্থাপত্যচর্চার পাশাপাশি শিল্পচর্চায়ও নিয়োজিত আছেন এই গুণী স্থপতি। স্কেচ, পেইন্টিং ও ওয়াটার কালারের দক্ষতাকে তিনি চর্চা করে চলেছেন। ইতোমধ্যে দুটি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিজাইন প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি। এবার শাহ্ সিমেন্ট সুইট হোমে তাকে নিয়েই প্রতিবেদন। লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক
“ব্যক্তিগত ভাবে আমি মিনিমালিষ্ট কাজ করতে পছন্দ করি। ট্রপিকাল ক্লাইমেটে কাজের ধারা ইউরোপিয়ান আর্কিটেকচার থেকে ভিন্ন। ট্রপিকাল মর্ডানিজম ধারার কাজের সূচনা করেছিল প্রখ্যাত শ্রীলংকান স্থপতি জেফরি বাওয়া। তার এই ধরনের কাজ গুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করে। ল্যান্ডস্কেপকে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকি। ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন আমার স্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কনটেক্সট অর্থাৎ স্থান, পরিবেশ এবং সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে স্থাপনা তেরি করি, যার কারনেই প্রত্যেকটি স্থাপনা ভিন্নতর হতে পারে” কথা গুলো বললেন স্থপতি সৈয়দ আবু সুফিয়ান কুশল। তার গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলায়। সেখানেই তার জন্ম। কিন্তু বেড়ে ওঠা ঢাকায়। স্থপতি সৈয়দ কুশলের পিতা সৈয়দ সাইফুর রহমান একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার। মা উম্মে কুলসুম আকতার সরকারি কর্মকর্তা। ছোটবেলা থেকেই চিত্রশিল্পী বাবার কাছে ছবি আঁকা ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণে হাতে খড়ি তার। সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠার কারণে শিশু বয়স থেকেই শিল্পচর্চায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি।
নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও মূল্যবোধ গঠনের পিছনে পিতামাতার অবদানকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেন এই স্থপতি। গর্ভনমেন্ট ল্যাবরেটরী হাইস্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন ২০০১ সালে। ২০০৩ সালে নটরডেম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগে। স্থাপত্য বিভাগে পড়াশোনাকালীন তিনি অনেক গৌরব অর্জন করেন। এর মধ্যে হাবিবুর রহমান স্কলারশিপ, শরফুদ্দিন স্কলারশিপ, ডক্টর রশিদ মেমোরিয়াল স্কলারশিপ, এফ. আর. খান স্কলারশিপ, ইউনিভার্সিটি মেরিটস্কলারশিপ, বার্জার ট্রাভেল গ্রান্ট অ্যাওয়ার্ড, আই ইউ বি স্টুডেন্ট ডিজাইন কম্পিটিশন অ্যাওয়ার্ড অন্যতম।
২০১০ সালে তিনি ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রি লাভ করেন। স্থাপত্য বিভাগে তৎকালিন সর্বোচ্চ সিজিপিএ পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন এই স্থপতি। শিক্ষা জীবনে কৃতিত্বের জন্য তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হতে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন। মেধা ও শিল্পর্চ্চার অসাধারণ সমাহার তাকে একজন সফল স্থপতি হতে সহায়তা করেছে।
বুয়েট থেকে পাশ করে বের হওয়ার পর পরই তিনি যোগদেন স্বনামধন্য স্থপতি মাহমুদুল আনোয়ার রিয়াদ ও স্থপতি মামনুন মোরশেদ চৌধুরীর ‘ডি ডাবিøউ এম ফোর’ নামের প্রতিষ্ঠানে। তার স্থাপত্যচর্চায় এই দুই স্থপতির প্রভাব বেশ গুরুত্বপুর্ণ। স্থাপত্য পেশায় তার অনুপ্রেরণা বরেণ্য স্থপতি মুস্তফা খালিদ পলাশ। শিল্পের একাধিক ধারায় মুস্তফা খালিদের বিচরনে অভিভূত ও অনুপ্রাণিত এই স্থপতি। স্থপতি প্রফেসর ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদের সাথে কাজ করার মাধ্যমে পরিবেশ বান্ধব স্থাপনায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। দেশের অনেক মেধাবী তরুণরা যখন উন্নত জীবনের হাতছানিতে বিদেশে পাড়ি জমায়, তখন অন্যদের অনুকরণ না করে নিজের ভবিষ্যৎ এদেশে গড়তেই বদ্ধ পরিকর হন তিনি। ¯œাতক পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করেও একাডেমিক ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে নিজেকে স্থাপত্য চর্চায় নিয়োজিত করেন সৈয়দ কুশল। উম্মুক্ত ডিজাইন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নবীন স্থপতিদের মেধার বিকাশের অপার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেন এই স্থপতি। চেষ্টা করেন সকল ধরনের ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের। ইতোমধ্যে দুটি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিজাইন প্রতিযোগিতায় পুরুস্কৃত হয়েছেন স্থপতি সৈয়দ কুশল। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর প্রধান কার্যালয় এর প্রস্তাবিত ৩২ তলা গ্রীণ বিল্ডিংয়ের প্রধান ডিজাইন স্থপতি তিনি। উম্মুক্ত ডিজাইন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তরুণ বয়সে এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি ডিজাইন করার সুযোগ পান। নিজের মেধার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করে এই আধুনিক পরিবেশ বান্ধব বহুতল ভবনের নকশা প্রণয়ন করেন অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্থাপত্যকে আরও প্রতিষ্ঠিত করবে বলে তার ধারনা। রাজউক ভবনের স্ট্রাকচারাল চ্যালেঞ্জ, আলো বাতাসের পরিপূর্ণ ব্যবহার, আবহাওয়া ও পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য পুর্ণ এই ডিজাইনটিকে করে তুলেছে অনন্য সাধারণ।
Projectএছাড়া জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় ডিজাইন প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। বর্তমানে আরেকটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভবনের কাজ করছেন তিনি। এটি মিরপুর কালসিতে টাউনশিপ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট ভুক্ত। পাঁচ একর জমিতে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপের আওতায় এটি হতে যাচ্ছে একটি আধুনিক মডেল হাউজিং। যেখানে স্থপতির কনসেপ্ট হল দুই একর বিশিষ্ট একটি উদ্যান ও লেক তৈরি করা। আরবান ওয়েসিস, ঝুলন্ত বাগান এবং উন্নত জীবনধারণের সকল সুবিধার সংযোজন করা হয়েছে এই প্রজেক্টটিতে। এই প্রজেক্টটিও একটি ক্লোজড ডিজাইন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তারা পান। যার বাস্তবায়ন করছে ট্রপিকাল হোমস লিমিটেড।
এছাড়া তার অনেক স্থাপনা রয়েছে যার প্রত্যেকটিতেই তিনি চেষ্টা করেছেন গতানুগতিক ধারার থেকে বের হয়ে নতুন ধরনের চিন্তা চেতনায় কাজ করার। ইতিমধ্যে তিনি দেশের নামকরা বাণিজ্যিক ভবন, রিসোর্ট, আবাসিক ভবন, ফ্যাক্টরি বিল্ডিং, কনভেনশন হল, স্কুল, মসজিদ, ভ্যাকেশন হাউজ সহ অসংখ্য ভবনের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামে নীল কণ্ঠি গলফ রিসোর্ট, সুইমিং এন্ড হেলথ কেয়ার ‘জল চত্বর’, ঢাকার জাহাঙ্গীরগেটে বি এ এফ শাহীন স্কুল এর নতুন একাডেমিক ভবন, বনানীর মোস্তাফিজ রেসিডেন্স, মাহবুবুল আলম এর ১০ তলা আবাসিক ভবন, নারায়নগঞ্জের পাঁচগাও-এ খন্দকার ভ্যাকেশন হাউজ, গাজীপুরে অ্যাডভান্স ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের রিসোর্ট, বগুড়ার কে ডবিøউ টাওয়ার ১৫ তলা বাণিজ্যিক ভবন, টঙ্গীর মিজান টাওয়ার ২০ তলা বাণিজ্যিক ভবন, গুলশান-২ এর খন্দকার হাউজের রেনোভেশন, রংপুর পুলিশ লাইন মসজিদ, চিটাগং রোডে আনোয়ার সিমেন্ট শীট ফ্যাক্টরির মাস্টার প্লান, কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পএ প্রাইমারী হেলথ কেয়ার ইউনিট, বনানীর ডিওএইচএস এর আলমগীর আবাসিক ভবনের ইন্টেরিয়র, কাঁঠাল বাগানের ট্রপিকাল জিলানী গার্ডেন, ধানমন্ডির ভিএম হেলথ ক্লিনিকের ইন্টেরিয়র সহ অসংখ্য ভবনের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। স্থপতির প্রত্যেকটি কাজে রয়েছে শিল্পের ছোঁয়া। এছাড়াও বর্তমানে তিনি বেশ কয়েকটি নতুন প্রজেক্টের কাজ করছেন। স্থাপত্য চর্চার পাশাপাশি শিল্পচর্চায় নিয়োজিত এই স্থপতি। চিত্রশিল্পী পিতার সান্নিধ্যে প্রাপ্ত অসাধারণ স্কেচ, পেইন্টিং ও ওয়াটার কালার এর দক্ষতাকে তিনি চর্চা করে চলেছেন। অবসর সময়ে রং তুলি নিয়ে ইমপ্রেশলিষ্ট স্টাইলে সিটি স্কেপ পেইন্টিং করেন। ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কালার সোসাইটির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবেও কুশল দায়িত্ব পালন করছেন।
এ পর্যন্ত তিনি ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য সহ বিশ্বের ২১টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণকালীন সময়ে স্কেচ করতে পছন্দ করেন এবং তার ভ্রমণের স্মৃতিগুলোকে ডাইরিতে স্কেচ করে রাখেন তিনি। ভ্রমণ পিয়াসু এই স্থপতি ও চিত্রশিল্পী মনে করেন স্থাপত্য চর্চায় ভ্রমণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সৈয়দ কুশল ২০১৫ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম তাসনীম তারিক। তিনিও একজন স্থপতি। স্থাপত্যচর্চা ও শিল্প চর্চায় স্ত্রীর সার্বক্ষনিক অনুপ্রেরণা তাকে অনুপ্রাণিত করছে। ২০১০ সাল থেকে সৈয়দ কুশল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষকতা করছেন তিনি নিজের ভালোলাগা ও নাগরিক দায়বদ্ধতা থেকে। স্থপতি সৈয়দ কুশল বলেন, এ দেশের জনগনের অর্থে আমি পড়াশোনা করেছি তাই শিক্ষকতার মাধ্যমে আমি তার প্রতিদান স্বরূপ দেশের জন্য সুযোগ্য স্থপতি তৈরি করার চেষ্টা করছি।
শিক্ষকতার মাধ্যমে ভিন্ন ধরনের চিন্তার উম্মেষ ঘটনোর পাশাপাশি সৃজনশীল কাজের সাথেও নিজেকে যুক্ত রাখা যায়। শিক্ষকতার মাধ্যমে আমি শিখছি এবং নিজের জ্ঞানকে বাড়ানোর চেষ্টা করছি। বুয়েটএ স্থাপত্য বিভাগে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনেক দক্ষতা অর্জন করেছেন। তাদের সংস্পর্শে থেকে আমি আরও জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করছি। বাংলাদেশের স্থাপত্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সুদৃঢ় করার স্বপ্ন দেখেন তরুণ এই স্থপতি। স্থপতি রফিক আজম, মেরিনা তাবাস্সুম ও কাশেফ মাহবুব এর স্থাপত্য কৃতিত্বকে শ্রদ্ধা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্থপতিরা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। ভবিষ্যতে আরও অনেক আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। শুধুমাত্র দেশে নয়, দেশের বাইরেও কাজ করার স্বপ্ন দেখেন এই স্থপতি। সৈয়দ কুশল আরও বলেন, স্বপ্ন দেখতে দোষ কী? আমি বরাবরই স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি আর চেষ্টা করি স্বপ্নের জগৎটাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার।