Home এক্সক্লুসিভ সুবর্ণা মুস্তাফার মুখোমুখি আফসানা মিমি- খুবই শক্ত জীবনের ভিতর দিয়ে গেছি আমি-সুর্বনা...

সুবর্ণা মুস্তাফার মুখোমুখি আফসানা মিমি- খুবই শক্ত জীবনের ভিতর দিয়ে গেছি আমি-সুর্বনা মুস্তাফা

SHARE
Subarna-Mostafa

কতই না গুণ আমাদের প্রিয় অভিনেত্রী সুনির্মাতা আফসানা মিমির। টিভি পর্দার অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেত্রী তিনি। নাট্য পরিচালক হিসেবেও তাঁর ব্যাপক খ্যাতি রয়েছে। সে কারণে প্রচার মাধ্যমের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে তাঁর প্রতি। সুযোগ পেলেই সাংবাদিকরা তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য ছুটে যান অথবা তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই গুণী অভিনেত্রী আফসানা মিমি এবার কলম ধরেছেন আনন্দ আলোর জন্য…

আফসানা মিমি: চারিদিকে আগুনের কথা বলছিলেন…

সুবর্ণা মুস্তাফা: আগুন, কামানের গোলা, মানুষের চিৎকার। আমাদের বাসার ঠিক পেছনেই ছিলো ইকবাল হল।

আফনানা মিমি: ইকবাল হলটাই তো এখনকার সার্জেন্ট জহুরুল হক হল।

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যা। জাস্ট জিওগ্রাফিটা চিন্তা কর। পাশেই নীলক্ষেত এবং ইউনিভার্সিটি এবং তখনওতো জানি না যে এই তাÐব চলছে। ২৫, ২৬ কারফিউ দিলো। ২৭ তারিখ সকালে কারফিউ তুলে নিলো। বললো, যার কাছে যা আগ্নেয়াস্ত্র আছে জমা দাও। বোবার (গোলাম মুস্তাফা) একটা ছোট্ট পিস্তল ছিল, শখ করে কিনেছিল। বোবা সকালে রেডি হচ্ছিল পিস্তল জমা দিতে যাবার জন্য। একটা ছেলে আসলো, সে এয়াফোর্সের বাঙালী অফিসার। এসে বোবাকে বললো আপনি কোথাও যাবেন না, অস্ত্র সারেন্ডার করবেন না। আপনার এবং হাসান ইমাম সাহেবের জন্য শ্যুট অ্যাট সাইট অর্ডার আছে। জাস্ট লিভ। চলে যান ফ্যামিলি নিয়ে। বোবা আমাদের গাড়িতে তুললো, যাওয়ার সময় হাসান কাকুর বাড়িতে খবর দিয়ে গেল।

আফসানা মিমি: হাসান ইমামদের বাড়িতো তখনো মগবাজারেই ছিল?

সুবর্না মুস্তাফা: হ্যাঁ।

আফাসানা মিমি: তারপর?

সুবর্ণা মুস্তাফা: আমরা চলে গেলাম হাতির পুলে, নানীর বাড়িতে। ভ‚তের গলির ভ‚তের বাড়ি বলে যেটা পরিচিত ছিল ওটাই আমার নানীর বাড়ি ছিলো।

আফসানা মিমি: ভ‚তের গলিটা চিনি কিন্তু ভ‚তের বাড়ি যে কোনটা সেটা কখনও জানা হয়নি।

সুবর্ণা মুস্তাফা: ভ‚তের বাড়িটাই আমার নানীর বাড়ি।

আফসানা মিমি: ওই বাড়িতে সত্যি সত্যি ভ‚ত ছিল?

সুবর্ণা মুস্তাফা: ওটা ছিল এক হিন্দু জমিদারের বাড়ি। বিশাল বাড়ি, মানে মেইন গেট থেকে বাড়ির ভেতরে যেতে সময় লাগতো। আর পেছনেও বিশাল উঠান ছিলো। আমার নানী বিধবা মানুষ, উনি ওটা কিনেছিলেন, ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকতেন। তখনও এসব ছিল যে, তাড়িয়ে দিতে পারলেতো সম্পত্তি হাত করে নিতে পারবে। তো রাতে নানা রকম শব্দ শোনা যেতো,ঢিল পড়তো। আমার মামা আর বাবা একদিন রাত্রিবেলা ভ‚ত দেখার জন্য ছাদে গিয়েছিল। চুপ করে ঘাপটি মেরে ফ্ল্যাশ লাইট নিয়ে বসেছিল। ঢিল পড়া শুরু হওয়ার পরে দু’জনে একসাথে ফ্ল্যাশ লাইট অন করলে দেখা গেল যে পাড়ার লোকেরাই ঢিল ছুঁড়ছে।

আফসানা মিমি: পাড়ার লোকেরা?

সুবর্ণা মুস্তাফা: হুম পাড়ার কিছু দুষ্টু লোক…।

আফসানা মিমি: (হাসি) দুষ্টু লোকেরাইতো আসলে ভ‚ত!

সুবর্ণা মুস্তাফা: বোবা আমাদেরকে নানীর বাড়ী নামিয়ে কিন্তু থাকে নি। বোবা চলে গেল এবং কোথায় থাকতো পরে জেনেছি। ডিরেক্টর মমতাজ আলী ছিলেন‘রক্তাক্ত বাংলা’ যার, উনি একটা কোথাও চিলে কোঠার রুমে থাকতেন, উনার সাথে থাকতেন বোবা। আমরা আবার বাড়িতে ফেরত আসি জুন মাসের দিকে।

আফসানা মিমি: তখন কি ঢাকায় অনেকটা কন্ট্রোল্ড সিচুয়েশনে?

সুবর্ণা মুস্তাফা: তখন ঐ প্রথম নিধনটা শেষ হয়েছে। তারপরও নিধন চলছেই। বাই দ্যাট টাইম, গুজব রটে গেল যে, সুফিয়া খালাকে মেরে ফেলেছে। ওরকম একটা গুজব হয়েছিল যে, গোলাম মুস্তাফাকে মেরে ফেলেছে। বোবাকে ওরা একবার নিতে পেরেছিল রেডিওতে। তখন প্রচÐ গরম ছিল। বোবা দেখলাম তার মধ্যে মোটা একটা উলেন কোট, গলায় একটা মাফলার, মুখে দাঁড়ি নিয়ে ঘুরছে।

আফসানা মিমি: ছদ্মবেশ টাইপ কিছু?

সুবর্ণা মুস্তাফা: থ্রোট ক্যান্সার তাই কথা বলতেই মানা করে দিয়েছেন ডাক্তার। মিথ্যা কথা ছিলো সেটা, যাতে রেডিওতে না যেতে হয়, টিভিতে যেতে না হয়।আমাদের পরিচিত একজন ডাক্তার ছিলেন, উনি লিখে দিলেন যে, হি ইজ নট সাপোস্ড টু টক্। খুব বাজে অবস্থা।

আফসানা মিমি: আচ্ছা, তোমার মাও তো রেডিওর প্রোগ্রাম প্রোডিউসার ছিলেন…

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ। মা রেডিওতে ছিলেন, নাটক লিখতেন। অভিনয়ওতো করেছেন দু’টো ছবিতে।

আফসানা মিমি: উনার অভিনীত সিনেমা কি এখন আর্কাইভে আছে?

সুবর্ণা মুস্তাফা: আই ডোন্ট নো। ‘এইতো জীবন’ বলে একটা ছবি আর ‘নাচ্ ঘর’।

আফসানা মিমি: রেডিওর জন্যই নাটক লিখতেন?

সুবর্ণা মুস্তাফা: টিভির জন্যও লিখেছেন। আমার করা আম্মার দু’টো তিনটা নাটক আছে। একটা খুবই ফেমাস্। আম্মার স্ক্রিপ্টটা আমাকে আরিফ খান জোগাড় করে দিয়েছিল। ওই স্ক্রিপ্ট নিয়ে আমি আবার বানালাম নাটকটা, আমি যখন বানালাম, তখন প্রীতি আর ইরেশ অভিনয় করলো। আমি করেছিলাম বিটিভিতে। আকাশ-কুসুম। ওই যে একটা মেয়ে…

আফসানা মিমি: মিথ্যা কথা বলে খুব।

সুবর্ণা মুস্তাফা: হুম। শ্বশুর বাড়িতে এসে বাপের বাড়ির প্রশংসা আর…

আফসানা মিমি: বাপের বাড়ি গিয়ে শ্বশুর বাড়ির প্রশংসা।

সুবর্ণা মুস্তাফা: আম্মার লেখা…

আফসানা মিমি: উনি রেডিওতে কাজ করতেন। এই যুদ্ধের সময়টাতে, উনি কিভাবে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন?

সুবর্ণা মুস্তাফা: উনি যাননি। জাস্ট লাইক দ্যাট্। একটি দিনের জন্যও না। আসলে প্রতিবাদের না অনেক ভাষা থাকে। ২৫ শে মার্চের পরে, আমাদের বাসায় কোনদিন টেলিভিশন অন্ করে নি বোবা। আর একটা স্মৃতি খুব মনে পড়ে আমার। ৭১’এর ২৬ শে মার্চ এর ঘটনা। তার আগে বোবা ‘মিশর কুমারী’ বলে একটা ছবি করেছিল, খুব সুন্দর সেট ছিল। ইজিপশিয়ান সেট ছিলতো। একটা ইজিপশিয়ান স্ট্যাচু খুব সুন্দর! ওইটা বোবা নিয়ে এসেছিল এফডিসি থেকে। ওটা ছিল আমাদের বাসায়। ২৬ শে মার্চ সকালে প্রথম কাজটা করতে হলো ছাদের উপর থেকে, বাংলাদেশের পতাকাটা নামাতে হলো। নতুন যে পতাকাটা হয়েছিল বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা।

আফসানা মিমি: হ্যাঁ সেই হলুদ রং এর মানচিত্র সহ পতাকা।

সুবর্ণা মুস্তাফা: তারপর থেকে কালো পতাকা উড়েছিল, যখন পার্লামেন্ট বাতিল করে দিল। আর ঐ মিশরীয় মূর্তি নিয়ে গিয়ে ভেঙ্গে ফেলা হলো, টুকরো টুকরো করে মাটির সাথে মিশিয়ে গুড়ো গুড়ো করে ফেলা হলো। এইটা আমার খুব ডিস্টার্বিং একটা স্মৃতি। কত সুন্দর জিনিস নষ্ট করতে হয়, মুর্খদের কারণে।

আফসানা মিমি: সত্যিই তাই।

সুবর্ণা মুস্তাফা: ওরকম খারাপ লেগেছিল তালেবানরা যখন আফগানিস্তানে দু’টো বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করেছিলো পাহাড়ের গায়ে ছিল সেই বিশাল বৌদ্ধ মূর্তিদু’টো। থাইল্যান্ড, বার্মা, জাপান, চায়না কত বলল যে ঠিক আছে আমাদেরকে দিয়ে দাও তোমরা যখন চাওনা তোমাদের দেশের মূর্তি, আমাদের দাও। কিসের কি? সেই ধর্মান্ধ লোকেরা মেশিনগান দিয়ে গুলি করে…।

আফসানা মিমি: গোলাম মুস্তাফার জীবন-যাপন কেমন ছিল?

সুবর্ণা মুস্তাফা: সিম্পল।

আফসানা মিমি: খুব ডিসিপ্লিনড?

সুবর্ণা মুস্তাফা: একদমই না। ডিসিপ্লিনতো ছিলেন আম্মা। এতটার সময় খাওয়ার কথা, এতটার সময় খেয়ে নেবে। বোবা বই পড়ছে, কিন্তু আল্টিমেটলি আম্মা বলছে এবার ঘুমাতে আসো, তখন হয়ত আড়াইটা বাজে। মানে ওইরকম মিলিটারি ডিসিপ্লিন লাইফ না। তবে আমাদের সবার জীবনই অনেক ইজি হয়েছে আম্মার কারণে। আম্মা স্বামী এবং সন্তানদের সবার ভাল লাগা গুলোকে এত মূল্য দিয়েছে।

আফসানা মিমি: বাহ্।

সুবর্ণা মুস্তাফা: আমাদের পছন্দ-অপছন্দের মূল্য দিয়েছে, কিন্তু কোন       ন্যুইসেন্স ঘটতে দেয় নি।কিন্তু প্যাম্পার করেছে। যেমন, খাওয়া-দাওয়া নিয়ে, আমি কখনই বলিনা আমি এটা খাই না, ওটা আমাদের শিক্ষা। বলতেই পারবে না। তুমি খাওনা মানে কি? তুমি জান কি করে তুমি এটা খাও না? আর একটু বড় হওয়ার পরে বলেছে যে, হতে পারে যে একটা জিনিস তোমার খেতে ভাল লাগে না। কিন্তু কারো বাড়িতে গিয়ে বলো না যে এটা আমি খাই না। না খেলে চুপ করে থাক, অন্য একটা জিনিস দিয়ে খাও।কিন্তু প্যাম্পারিংটা কিরকম ছিল? ছোটবেলা থেকেই রাত্রে এই তরকারি-মরকারিগুলো আমার খেতে ইচ্ছে করে না। তো আম্মা সবার খাবারই দিত, কিন্তু খেয়াল করত যে, খেলাম কিনা? এবং একটু বড় হওয়ার পরে, মানে যখন আর ডান্ডাটা ঘুরবে না মাথার উপরে। আম্মা বলত যে, সুবর্ণা দু’টো স্যান্ডউইচ বানানো আছে খেয়ে নাও। সুমিত যেরকম এসে উঁকি দিয়ে দেখত টেবিলে মুরগী আছে কিনা, মুরগী না থাকলে বলত যে আমার না বেশি ক্ষিদে নাই। আম্মা বলত যতটুকু ক্ষিদে আছে অতটুকু খাও। তারপর আম্মা যেটা চাইছে সেটা খাওয়া হয়ে গেলে ঠিক মুরগী এনে দিতো। কিন্তু মাছ খেতে হবে, করলা খেতে হবে, শাক খেতে হবে। বোবাকে একবার বলেছিলাম আম্মা আমাকে করলা ভাজি খাওয়াচ্ছে। বোবা বললেন“আম্মা যদি ঘাস ভাজি দেয় সেটাও খেতে হবে”। ব্যাস শেষ। এন্ড অফ স্টোরি।

আফসানা মিমি: গোলাম মুস্তাফার জীবন তো অনেক ব্যস্ত ছিল। ছেলেমেয়েদেরকে সময় কিভাবে দিতেন তিনি?

সুবর্ণা মুস্তাফা: মহামানব ছিলেন। পারতেন। ছেলেমেয়েদেরকে সময় দিতেন এবং এটা এতই বুদ্ধিমত্তার সাথে দিতেন যে আমরা কখনই বোবা যে অনেকটা সময় নেই সেটা মিস করতাম না।গল্পের বই চলে আসছে বাসায়, এত্ত গল্পের বই, এটা পড়েছিস? ওটা পড়েছিস? আচ্ছা এই চ্যাপ্টারটা পড়বি, দেখি তারপর আমাকে বলবি গল্পটা কিরকম। তো বোবা যখন আসবে তখনতো গল্পটাই বলব। সুতরাং কতক্ষণ নাই সেটা কে দেখছে মাঝখনে? বরং আম্মাই উল্টো বলতো যে শুটিং থেকে ফিরলেই সবাই গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়োনা। বেচারারতো একটু বিশ্রাম লাগে। কিন্তু কে এত কথা শুনতো? শুয়ে শুয়ে আমরা বোবার সাথে কথা বলতাম, বোবা উত্তর দিত। বোবা হয়ত পড়ছেন, আমরা কিছু জিজ্ঞেস করলাম। বোবা সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আবার পড়তে শুরু করলেন। কখনো বিরক্ত হতেন না।

আফসানা মিমি: ছোটবেলায় কে বেশি দুষ্টু ছিল?

সুবর্ণা মুস্তাফা: আমি।

আফসানা মিমি: কিরকম? একটা গল্প… মানে বোঝার জন্য আরকি…

সুবর্ণা মুস্তাফা: (হাসি)যেটা বলছি সেটা খুবই ডেঞ্জারাস টাইপের দুষ্টুমি। এটা আমি পরে আম্মার কাছে শুনেছি। আমরা নানী বাড়িতে থাকতাম, ওখানে উঁচু বারান্দা। বিকেল বেলা খেলার সময়, ছোট বাচ্চা যারা আমরা, তাদেরকেতো খেলায় নেয়া হত না। বারান্দায় বসিয়ে দেয়া হত।

আফসানা মিমি: হুম, দুধভাত…

সুবর্ণা মুস্তাফা: দুধভাত…। সামনের খোলা জায়গায় কনস্ট্রাকশনের কাজের জন্য সুরকি রাখা ছিল।একদিন কোন এক বাচ্চার সাথে ঝামেলা হয়েছিলো। তারপর আমি নাকি তার বুকের উপরে বসে তাকে সুরকি খাইয়ে দিয়েছিলাম।

আফসানা মিমি: সুরকি? মানে ওই কনস্ট্রাকশন এর সুরকি? হা হা হা…।

সুবর্ণা মুস্তাফা: এবং আম্মা যখন আমাকে শাসন করতে এসেছে তখন যার বাচ্চা তিনি বলেছেন ও ছোট, ও বুঝে করেনি। আম্মা বলে, আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছি ও সব বুঝেই করছে।

আফসানা মিমি: সুমিত কেমন দুষ্টু ছিল?

সুবর্ণা মুস্তাফা: সুমিত খুব শান্ত ছিল। একদম দুষ্টু ছিল না। ভেরি কাম অ্যান্ড কোয়ায়েট। সারাদিন একা একা খেলতে পারত। তারপর সকালে ঘুম থেকে উঠে আম্মার পেছনে পেছনে ঘুরত। রুটি বানানোর ছোট বেলুন আর পিঁড়ি কিনে দেয়া হয়েছিল মহররমের মেলা থেকে। রুটি বেলার সময় আম্মা ওকে গোল করে আটা দিত আম্মার সাথে রুটি বেলত পাশে বসে।

আফসানা মিমি: ছবিটা দেখতে পাচ্ছি…

সুবর্ণা মুস্তাফা:আমাকে নিয়ে আমার মামা বলেছিল,“বিজু আপা তোর এই মেয়েটা যখন দেখবি বেশি শান্ত চেহারা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন বুঝবি কিছু একটা সর্বনাশ করেছে কোথাও।”

আফসানা মিমি: কোন একটা মতলব আঁটছে?

সুবর্ণা মুস্তাফা: কিছু একটা করেছে।

আফসানা মিমি: ও মানে দুষ্টুমি করা হয়ে গেছে?

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ।

আফসানা মিমি: কখনও মার খাওয়া হয়েছে মা’র কাছে?

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ। তালপাতার পাখা বলে একটা জিনিস ছিল না?

আফসানা মিমি: হ্যাঁ। মায়েদের প্রিয় অস্ত্র।

সুবর্ণা মুস্তাফা: কিছুক্ষণ পরে ফডাশ ফডাশ। এত দুষ্টু ছিলাম …! এই শাসনটুকু লাগে। আর এখন নাকি বাচ্চাদের শাসন করলে ওদের সাইকোলজিক্যাল প্রবেøম হয়।

আফসানা মিমি: কিন্তু শাসন না করায় সাইকোলজিক্যাল প্রবেøম কি কমছে?

সুবর্ণা মুস্তাফা: ইট হ্যাজ বিন প্রæভড যে, বাচ্চারা ডিসিপ্লিনড হতে পছন্দ করে। সে অনেক দুষ্টুমি করল তুমি তাকে কিছুই বললে না, সে তখন ভাবে আই অ্যাম নট এনআফ ইম্পর্ট্যান্ট… তখন সে তার দুষ্টুমির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। এটা আমার কথা না। বড় বড় চাইল্ড সাইকোলজিস্টদের কথা। চিলড্রেন ওয়ান্ট টু বি ডিসিপ্লিনড।

আফসানা মিমি: বাবা-মার মধ্যে খুব চমৎকার বোঝাপড়া ছিল, না?

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ। প্রেম। একজন আরেকজনকে একটা অদ্ভ‚ত নামে ডাকতো। এই ডাকটি আমি আর কখনও শুনিনি। ‘আমি’ বলে ডাকতো। অদ্ভ‚ত লাগতো আমার।‘আমি’ আমি অর্থেই। মানে তোমাকে আমি ‘আমি’ বলে সম্বোধন করছি। ইউ আর পার্ট অফ মি।

আফসানা মিমি: মানে বাবাও মাকে আমি বলছেন আর মাও বাবাকে আমি বলছেন? বাহ্ !

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ।

আফসানা মিমি: মানে ইটস্ মি?

সুবর্ণা মুস্তাফা: ইটস্ মি।

আফসানা মিমি: দারুণ!

সুবর্ণা মুস্তাফা: বাবা হয়তো ডাকছে শোনো, ওগো শুনছো? আমি গিয়ে বলাতাম লাইলি, মজনু ডেকে ডেকে সারা হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মার সাথে খুবই ফ্রেন্ডলি ছিলাম।

আফসানা মিমি: আমিওঁদের দুজনকে একসাথে দেখেছি কখনও আসা-যাওয়ার পথে। কিন্তু যখন আম্মা অসুস্থ’ ছিলেন তখন তোমার বাবার প্রেমটা কাছ থেকে দেখেছি। আমরা একটা নাটকে একসাথে কাজ করেছিলাম ‘না’ নামের, ধারাবাহিক নাটক। সেখানে মুস্তাফা চাচা ছিলেন আমার বাবা। সকালে ঘড়ির কাঁটা মেপে উনি আসতেন, শুটিং হতো, ঠিক রাত ৮টা বাজলে চলে যেতেন, বলতেন বিজুর ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে। আমি না গেলে বিজুকে ওষুধ খাওয়াবে কে? আমি অবাক হয়ে দেখতাম। আর চাচা দুপুরে কি খেতেন আমার এখনও মনে আছে। একটা ছোট বন রুটি আর একটু দুধ।

সুবর্ণা মুস্তাফা: কিভাবে হিস্ট্রি রিপিট করে দেখ। দুপুরে, ম্যাক্সিমাম সময় আউটডোরে যখন শুটিং-টুটিং থাকে আমি একটু ওটস নিয়ে যাই, দুধ, একটা কলা। অনেক হ্যাসেল ফ্রি খাওয়া-দাওয়া।

আফসানা মিমি: নানা রকম গল্প করতে করতে তো অনেক কিছুই এলো। বাবা-মা, পরিবার, মুক্তিযুদ্ধ। টেলিভিশনেরতো আরো বিস্তর কথা আছে। একটু ঢাকা থিয়েটার থেকে ঘুরে আসি।

সুবর্ণা মুস্তাফা: ঢাকা থিয়েটার করতে গেলাম, ওই রকমই বয়স ১৪ যখন বেলাল ভাই (আল মনসুর) আমাকে বলল যে, থিয়েটার করবি? আমি বললাম ‘হ্যাঁ’। তারপরতো বাসায় চলে এসেছি, মনেও নেই। তারপর একদিন বোবা একটা স্যুভেনির এনে হাতে দিলেন। এখনও রঙটা মনে আছে, কমলা রঙের একটা স্যুভেনির, প্রথম জাতীয় নাট্যোৎসব।সেখানে ঢাকা থিয়েটারের ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ নাটকটি হবে। ছেলেটি হচ্ছে আফজাল হোসেন, মেয়েটি সুবর্ণা মুস্তাফা।

আফসানা মিমি: মানে অলরেডি নাম ছাপানো?

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ।

আফসানা মিমি: তখনো সুবর্ণা মুস্তাফা থিয়েটারে যায় নি?

সুবর্ণা মুস্তাফা: আমি রাজি হয়ে গেছি মানে রাজি হয়ে গেছি। আর তখনতো থিয়েটারে মেয়ে পাওয়া কঠিন ছিলো।

আফসানা মিমি: টিনের তলোয়ারের কথা মনে পড়ছে…

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ, সেই…! বাচ্চু ভাইয়ের সাথে পরিচয়টাও মজার ছিলো… টেলিভিশনে একদিন বেলাল ভাই আমাকে বললো যে, ও হচ্ছে বাচ্চু, নাসির উদ্দিন ইউসুফ। তুমি থিয়েটার করবে বলেছো না? ও হচ্ছে টিম লিডার। আমার মনে আছে, বাচ্চু ভাই কেমন একটু বাঁকা হয়ে কেমন করে তাকায় না? আমার দিকে তাকালো আমি ইকোয়ালি বাঁকা ভাবে বাচ্চু ভাইয়ের দিকে তাকালাম। বেলাল ভাই ফোন করে বললো টিএসসি তে আসো। টিএসসি? আমিতো চিনি না। বোবা বললো, চিনিস না আবার কি? রিক্সাওয়ালারাও চেনে। সময়টা কী সুন্দর ছিলো ভাবো… রিক্সাওয়ালা চেনে বলে আমার বাবা ছেড়ে দিল আমাকে রিক্সায়। আমি পরে শুনেছি আফজালের কাছ থেকে যে, ঢাকা থিয়েটারের সবাই নাকি আমাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করে ছিলো।

আফসানা মিমি: তাই?

সুবর্ণা মুস্তাফা: হুম, গোলাম মুস্তাফার মেয়ে আসবে। ‘বরফ গলা নদী’ করেছে যে সুবর্ণা মুস্তাফা। ওদের ধারণা ছিল যে, আমি সাইকেল-টাইকেল চালিয়ে যাবো।

আফসানা মিমি: তারপর?

সুবর্ণা মুস্তাফা: বেলাল ভাই বলে, তারপর দেখলাম একটা বার হাত শাড়ির পোটলা রিকশা থেকে নামলো…।

(দু’জনের হাসি।)

সুবর্ণা মুস্তাফা: সেই ‘জন্ডিসও বিবিধ বেলুন’ প্রথমে কিছুই বুঝি নাই। কিসের জন্ডিস? কিসের বিবিধ বেলুন? কি একটা কথপকথনের পরে ছেলেটি চিঠি চায়, তারপর আমি ব্যাগ থেকে একটা নীল রঙের বেলুন বের করে দিই। দিয়ে বলি, এখন থেকে এটাই দেব। তো রিহার্সেলের সময়… মুখস্ত-টুখস্থ করে এসে দাঁড়িয়ে যখন রিহার্সেল করছি ‘এখন থেকে এটাই দেব’ বলে আমি তাঁকিয়ে দেখি বাচ্চু ভাই শুনছিল, জাস্ট একটা ভ্রæ উঁচু করে পাশে তাকিয়েছিলেন সেলিম আল দীন এর দিকে। আমি তখন বুঝেছি রিহার্সেল ভাল হয়েছে। তারপরে করলাম মুনতাসির ফ্যান্টাসি আর তারপরতো হিস্ট্রি, শকুন্তলা… একই নাটকে মেনকাও করলাম, শকুন্তলাও করলাম।

আফসানা মিমি: ইস! যদি সেই সময়ের নাটকগুলো দেখতে পারতাম…

Afzal-Subarnaসুবর্ণা মুস্তাফা: শকুন্তলা করার সময় একটা এক্সপেরিয়েন্স হয়েছিল। কিছুইতো বুঝি না, অত কঠিন বাংলা সেলিম আল দীন এর। স্ক্রিপ্ট নিয়ে বোবার কাছে গেছি যে, একটু পড়তে চাই তোমার সাথে। আর বোবা তখন কি বললো? কেন? আমার সাথে কেন? সেলিম আল দীন না তোমাদের গ্রæপে? সেলিম আল দীনের কাছে বসো। বাচ্চুর কাছে যাও। কাজ যেখানে করছো ওখান থেকে বুঝবে।

আফসানা মিমি: এভাবেই আসলে ডিসিপ্লিন তৈরি হয়ে যায় তাই না?

সুবর্ণা মুস্তাফা: খুবই শক্ত জীবনের ভিতর দিয়ে গেছি আমি। সিরিয়াসলি। আবার বাবা শেক্সপিয়র, ইলিয়েট, সুধীন দত্ত, সবকিছু গড় গড় করে আবৃত্তি করতে পারে, সব বোঝে। আর আমি শকুন্তলা স্ক্রিপ্ট নিয়ে গেছি, বলছে ‘নো’ নাট্যকার নিজে আছে, বাচ্চু আছে, ওর কাছে, ওদের কাছে যাবে না কেন? নিজেরা ওয়ার্কআউট করো। আমি তখন খুব আস্তে কথা বলতাম… সবার রিহার্সেল শুরু হতো পাঁচটায়। বাচ্চু ভাই আমার সাথে কাজ করতো তিনটা থেকে।

আফসানা মিমি: আলাদা করে?ভয়েসের…?

সুবর্ণা মুস্তাফা: প্রোজেকশন। বাচ্চু ভাই বলতো যেদিন আমি ওই টিএসসির গেটের বাইরে থেকে তোমার ডায়লগ ডেলিভারি শুনবো, সেদিন গলা তৈরি। চার না পাঁচ দিনের দিন গলা বসে গেল একদম। বাচ্চু ভাই বললো এটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এইযে গলা বসলো, তোমার গলা আর কোন দিন বসবে না। আমার সিরিয়াসলি ওইভাবে আর কোনদিন গলা আর বসে নাই। বলল, এরপর সব ঠিক হবে, প্রজেকশন ঠিক হবে। আর আমি ওই যে, মনযোগী ছাত্রী সব সময়ই। তখন প্রচুর থিয়েটারের ওয়ার্কশপ হতো। আমি সব সময়ই ভোকাল ট্রেনিংটার উপরে জোর দিয়েছি। এক্সপ্রেশনস নিয়ে কম ভাবতে হয়েছে। কারণ, আমরা হচ্ছি পদ্মার এই পারের মানুষ। হেভি ইমোশনাল। উই রিঅ্যাক্ট ভেরি ফার্স্ট। পশ্চিম বঙ্গের লোকের চাইতেও অনেক দ্রæত রিঅ্যাক্ট করি আমরা। আমাদের এক্সপ্রেশনস্ অনেক ভিভিড হয়। শিখেছি, ওই ওয়ার্কশপগুলো থেকেই। চর্চাটা আসলে ইম্পর্ট্যান্ট।

আফসানা মিমি: বাবা বাড়িতে কবিতা পড়তেন?

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ। দ্যাট ওয়াজ সামথিং উই লাভড ভেরি মাচ।

আফসানা মিমি: তোমাদের পড়ে শোনাতেন?

সুবর্ণা মুস্তাফা: হুম। মা’কে পড়ে শোনাতেন, নিজের আনন্দের জন্য পড়তেন।আমাদের বাসায় চা খাওয়াটা একটা রিচুয়াল এর মতো।

আফসানা মিমি: বিকালে চায়ের আসর বসতো?

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ। বাবা-মা ফ্রি থাকলে। যে কারণে আমি কিন্তু সবখানে চা খাই না। চা খাওয়া মানে হচ্ছে চায়ের কাপ থেকে শুরু করে এভরিথিং গরম পানি দিয়ে ধোয়া হবে।তারপরে পাতা দেওয়া হবে কেটলিতে, গরম পানি দেওয়া হবে, টিকোজি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হবে। চা ওই গরম কাপে ঢালা হবে। সাথে স্যান্ডউইচ বানানো হতো বা একটু নুডুলস। তখন আমাদের একটা নাগরা স্পুল ছিল। ওখানে সুচিত্রা মিত্র বাজতো বা কণিকা বন্দোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা চিন্ময়ের রবীন্দ্র সংগীত, আর বোবা একটা কবিতা পড়ছে তো আম্মা একটা কবিতা পড়ছে, তো গল্প হচ্ছে।

আফসানা মিমি: বাহ্ শুনতেই কী ভালো লাগছে…

Subarna-Mustafa-1সুবর্ণা মুস্তাফা: আর দুপুর বেলার একটা রিচুয়াল ছিলো ভাত খাওয়ার পরে, আম্মা আমাদেরকে গল্প পড়ে শোনাত। অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড,হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডার্সন আম্মা পড়ে শুনিয়েছে ওই সময়।

আফসানা মিমি: ছেলে-মেয়েদেরকে কোয়ালিটি টাইম দেওয়াটা খুব দরকার।

সুবর্ণা মুস্তাফা: হ্যাঁ, কোয়ান্টিটি টাইম দরকার নাই, কোয়ালিটি টাইম দিতে হবে।

আফসানা মিমি: এই যে তোমরা শিখলে, নাটকের গুরুদের কাছ থেকে, বাবা-মার কাছ থেকে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে, আমরা কি পেরেছি তোমাদের কাছ থেকে শিখতে? পরম্পরায় উত্তরসুরী হতে?

সুবর্ণা মুস্তাফা: যারা চেয়েছে, তারা পেরেছে।

আফসানা মিমি: আমার একটা কথা মনে পড়ে, তোমার সাথে প্রথম অভিনয় করতে গিয়েছি যখন টেলিভিশনে। তুমি আমাকে বলেছিলে যে, দেখ, এখানে তুমি যেটা রেকর্ড করছো সেটাই শেষ কথা। তোমার বাড়িতে ঝগড়া হয়েছে নাকি আসার সময় রাস্তায় জ্যামে বসে ছিলে সেজন্য অভিনয় খারাপ হতে পারে না।

সুবর্ণা মুস্তাফা: একেবারেই পারে না।

আফসানা মিমি: এটা আমি মনে রেখেছি সব সময়।

সুবর্ণা মুস্তাফা: নাহলে তো একটা করে সাব টাইটেল যেতে হবে,“আমার অভিনয়টা ভাল হয়নি কারণ, শুটিংয়ের দিন আমার মন খারাপ ছিল।” (দু’জনের হাসি)