Home প্রতিবেদন শাহ সিমেন্ট সুইট হোম রাহেলা আক্তারের স্থাপত্য ভুবন

রাহেলা আক্তারের স্থাপত্য ভুবন

SHARE
Rahela-Akter

রাহেলা আক্তার। বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য স্থপতি। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রিলাভ করেন। বুয়েট থেকে পাস করে বের হওয়ার পরই তিনি যোগ দেন ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি চিফ আর্কিটেক্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এযাবৎ তিনি বেশকিছু দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার ডিজাইন করেছেন। এই স্থপতি সব সময় চিন্তা করেন তার কাজটা যেন পরিবেশ বান্ধব হয়। সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দনের পাশাপাশি পরিবেশ সহনীয় স্থাপত্য চর্চাই তার অন্যতম লক্ষ্য। স্কুল জীবনে গান বাজনার সাথে জড়িত ছিলেন। এবার শাহ সিমেন্ট সুইট হোমে তাকে নিয়েই প্রতিবেদন। লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক।
স্থাপত্য শিল্পে এ দেশের নারীদের অবদান কোনো অংশেই কম নয়। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ স্থপতি রাহেলা আক্তার। এক সময় মনে করা হতো নারীরা শুধু মাত্র অফিশিয়াল কাজ আর ঘর-সংসার সামলাবে। সে ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি। নারী বা পুরুষ নয় দক্ষতা, মেধা ও যোগ্যতা থাকলে যে কেউ ভালো কাজ করতে পারে এর জলন্ত উদাহরণ রাহেলা আক্তার। ইট, কাঠ, বালু ও কংক্রিটের মঝেই তিনি খুঁজে ফেরেন প্রকৃতির সান্নিধ্য। আর তাই প্রতিটি স্থাপনায় থাকে সবুজের ছোঁয়া। আলো, বাতাস, সবুজসহ প্রকৃতিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।
দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে মেঝ আর্কিটেক্ট রাহেলা আক্তার। তার বাবার নাম মরহুম এ কে এম আশরাফ উদ্দিন। তিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। মা বেগম রোকেয়া আশরাফ গৃহিণী। স্কুল জীবন থেকেই রাহেলা সাংস্কৃতিক কর্মকাÐের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গান বাজনার প্রতি ছিল তার প্রচÐ নেশা। ওস্তাদ সোহরাব হোসেন এবং ওস্তাদ ওমর ফারুকের কাছে সংগীতের ওপর তালিম নিয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই আর্কিটেকচারের প্রতি তার ভালোবাসা জন্মায়। সেই ভালোবাসা থেকেই আজ তিনি হয়েছেন সফল একজন স্থপতি। অগ্রণী গার্লস হাইস্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন ১৯৮৫ সালে। ১৯৮৭ সালে বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগে। শিক্ষা জীবনে স্থপতি ক্যাথরিনডি গোমেজ ও স্থপতি সালমা পারভীন খান দুজনই বড় বোনের মতো তাকে সব বিষয়ে গাইড করতেন। পড়াশোনার অবসরে তিনি স্বনামধন্য স্থপতি জালাল আহমেদ ও স্থপতি সাইফুল হকের অধীনে ‘ডায়াগ্রাম আর্কিটেক্টস’ এ কাজ করতেন। ১৯৯৭ সালে তিনি ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রি লাভ করেন। পাস করে বের হওয়ার পর পরই রাহেলা আক্তার যোগ দেন ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড-এ’। বর্তমানে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি চিফ আর্কিটেক্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকরির পাশাপাশি স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে নিজের গড়ে তোলা ‘ডিজাইন অ্যান্ড কেয়ার’ নামের প্রতিষ্ঠানটির দেখাশোনা করছেন। এছাড়াও স্বনামধন্য আর্কিটেক্টদের সঙ্গে কাজও করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে রাহেলা আক্তার দেশের নামকরা অডিটোরিয়াম,ব্যাংক, স্কুল-কলেজ, উপাসনালয়, নগরভবন, মাকের্ট, পার্ক, লাইব্রেরী, অফিস বিল্ডিং, কোয়াটার, হোস্টেল, মসজিদ সহ অসংখ্য ভবনের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের হয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছেÑ নরসিংদী জেলা পরিষদের শিবপুর অডিটোরিয়াম কাম পাবলিক লাইব্রেরী, মানিকগঞ্জের নগর ভবন, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার মার্কেট, গাজীপুর পৌরসভার জয়দেবপুর বাজার সুপার মাকের্ট, রাইছ মার্কেট, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সাতকানিয়া উপজেলার সুপার মার্কেট, নরসিংদী জেলা পরিষদের চালাকচর সুপার মার্কেট, মানিকগঞ্জ পৌরসভার বিল্ডিং, গাজীপুর সিটি করপোরেশন অডিটোরিয়ামের পুনঃবিন্যাসের কাজ, সিলেট জেলা পরিষদের জাফলং-এ অবস্থিত পিকনিক স্পটের ডিজাইন, মানিকগঞ্জ পৌরসভার মার্কেট, চট্টগ্রাম রাউজানের জেলা পরিষদের মার্কেট, গাজীপুর পৌরসভার পৌর বিল্ডিংয়ের পুনঃবিন্যাসের কাজ, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মসজিদ, কক্সবাজার সাগরতীরে অবস্থিত ঝিনুক মার্কেট, কক্সবাজার জেলা পরিষদের নীলাচল রেষ্টুরেন্ট কাম চেঞ্জরুম, শরিয়তপুর নড়িয়ার পন্ডিতশ্রা-এ চিশতি নগর খানকা-এ চিশতিয়া দরবার শরীফের বিভিন্ন অবকাঠামোর কাজ, নরসিংদী পুটিয়ার মান্নান ভ‚ইয়া ডিগ্রি কলেজের মাষ্টার প্লানসহ মূল ভবনের ডিজাইন, গৌরীপুরের বিলকিস মোশারফ মহিলা কলেজ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাও-এ শফি উদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের চক্ষু হাসপাতাল, নীলফামারীতে জাইকার অর্থায়নে মানবিক সাহায্য সংস্থার ট্রেনিং সেন্টার, মিরপুরে মটস্ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ইত্যাদি।
SEL-Chayaneer-1SEL এর হয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছেÑনিউ ইস্কাটন রোডের আফরোজা মোতালেব স্বপ্নধারা, মহাখালীর ছায়ানীড় আবাসিক ভবন, পুরানা পল্টন লেনের ভিআইপি রোডে অবস্থিত ট্রাইডেন্ট টাওয়ার, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউর কমার্শিয়াল বিল্ডিং রোজ এন ডেল, শ্যামলী মিরপুর রোডের বাণিজ্যিক ভবন হক স্কাই পার্ক, বসুন্ধরার রাশি আবাসিক ভবন, গুলশানের ডালিয়া আবাসিক ভবন, ইস্কাটনের ওয়েসিস আবাসিক ভবন, বনানীর খায়ের প্যালেস, শিরিনিটি, শ্যামলীর দি স্ট্রাকচারল লি: এবং সুবার্তা ট্রাস্ট এর যৌথ উদ্যেগে নির্মিত ছায়াবিথী, কাকরাইলের আর্চ বিশ হাউজ সহ কুমিল্লা, খুলনা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, সাভার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসইএল এর অসংখ্য ভবনের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন।
এছাড়া বর্তমানে তিনি বেশ কিছু নতুন প্রজেক্টের কাজ করছেন। স্থপতি রাহেলা আক্তার সব ধরনের কাজ স্থাপত্য নীতি ও রাজউকের নিয়ম মেনেই করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি বিয়ে করেন। স্বামীর নাম মোহাম্মদ রবিউল্লাহ। তিনি একজন স্বনামধন্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। এই দম্পতি এক ছেলে সন্তানের জনক-জননী। ছেলের নাম শাফকাত উল বারী। সে স্কলাসটিকাতে এ লেভেলে পড়াশোনা করছে।
স্থপতি রাহেলা আক্তার বলেন, দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)। প্রতিষ্ঠানের এমডি ইঞ্জিনিয়ার্স আব্দুল আওয়াল স্যারের সুদক্ষ পরিচালনায় আমাদের একটি শক্তিশালী আর্কিটেকচারাল টিম রয়েছে। এতে ডিরেক্টর আর্কিটেক্ট হিসেবে আছেন আব্দুর রহমান, প্রিন্সিপাল আর্কিটেক্ট শাহনেওয়াজ ইসলাম এবং আরো কিছু তরুণ মেধাবী আর্কিটেক্টদের সমন্বয়ে আমাদের এই আর্কিটেকচারাল সেকশন। এই প্রতিষ্ঠানে আমি প্রজেক্ট লিডার এবং ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছি। প্রতিদিনের কাজের সিডিউল রুটিন মাফিক প্রদান করে থাকি যাতে আমার সহযোগীরা যথা সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পাদান করতে সমর্থ হয়। প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা তৈরী এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করার কাজেই সদা সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হয় আমাকে। প্রকল্পে প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী মাঝে মাঝে মিটিং করে উত্থাপিত সমস্যা ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করে থাকি। প্রতি মাসের কাজের অগ্রগতির প্রতিবেদন তৈরি করা, কাজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা, কাজের অগ্রগতি ব্যবস্থাপনা করা, এবং কার্য সম্পাদনের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ড্রইং তৈরি কাজের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত সকল প্রকৌশলীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে কার্য সম্পাদন করা হয়। স্থাপনার মালিকগণদের সকল চাহিদা ও সমস্যা প্রকল্পে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। সর্বশেষে সম্পূর্ণ ভাবে কাজ সম্পাদন করে প্রকল্পের দায়িত্বের ইতি টানা হয়। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি এপর্যন্ত ১৭৮টি প্রজেক্টের কাজ সম্পন্ন করেছে। আর ৫০টির মতো প্রজেক্টের কাজ চলছে। এছাড়াও নতুন ১২টির মতো প্রজেক্টের কাজ শুরুর পথে। বাংলাদেশের আবহাওয়া জলবায়ু, প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি কাজে নজর দেন রাহেলা আক্তার। পাশাপাশি পেশার কাছে দায়বদ্ধ থেকে সেটাকে সততার সঙ্গে শেষ করতে তৎপর থাকেন সর্বদা। স্থাপত্য নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্থপতি রাহেলা আক্তার বলেন, বিল্ডিং ডিজাইন এবং কন্সট্রাকশনে আরও উচ্চ প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটাতে চাই। আরও ভালো কাজ উপহার দিতে চাই।