Home এক্সক্লুসিভ যে জীবন দেখেছি সেটাই লিখেছি : রিজিয়া রহমান

যে জীবন দেখেছি সেটাই লিখেছি : রিজিয়া রহমান

SHARE

কথাসাহিত্যিক

রিজিয়া রহমান বাংলাদেশের অন্যতম কথাসাহিত্যিক।  জন্ম ১৯৩৯ সালে কলকাতার ভবানীপুরে।  ’৪৭-এর দেশভাগের পরে পরিবারের লোকজনের সাথে বাংলাদেশে চলে আসেন।  এরপরে শৈশব-কৈশোর, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা এখানে, আমাদের এই বাংলাদেশে।  লিখে চলেছেন প্রায় ছয় দশক ধরে।  তাঁর উলে­খযোগ্য গ্রন্হ- অগ্নিসাক্ষরা, ঘর ভাঙা ঘর, রক্তের অক্ষর, বং থেকে বাংলা, অলিখিত উপাখ্যান, সূর্য-সবুজ-রক্ত, অরণ্যের কাছে, উত্তর পুরুষ, শিলায় শিলায় আগুন, হে মানব মানবী, নদী নিরবধি, পবিত্র নারীরা, সীতা পাহাড়ে আগুন।  লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।  আনন্দ আলো ঈদ সংখ্যার জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহ্‌সান মাহ্‌মুদ

আনন্দ আলো: আমাদের আজকের আলোচনা শুরু করতে চাই আপনার স্মৃতিচারণ দিয়ে।  শুরুতেই জানতে চাইবো, আপনার শৈশব বিষয়ে- আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠার সময়কার গল্প…

রিজিয়া রহমান: আমার জন্ম হয়েছিল কলকাতার ভবানীপুরে।  কিন্তু আমাদের বাড়ি ছিল কলকাতার কাশিপুর থানার নওবাদ গ্রামে।  এরপরে বাবার বদলির চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে কেটেছে শৈশবের অনেকটা সময়।  আমাদের পরিবারের ইতিহাস খুঁজতে গেলে দেখা যাবে যে, পরিবারটি বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্হাপন করেছে।  তারা একটার পর একটা অভিবাসন তৈরী করেছে।  আমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ফরিদপুরে।  আমার বাবা সেখানে চাকরি করতেন।  আমরাও স্বপরিবারে সেখানেই থাকতাম।  কিন্তু ১৯৫২ সালে আমার বাবা মারা যাওয়ার পরে আমরা ঢাকার শাইনপুকুরে নানা বাড়িতে চলে আসি।  তখন আমার এক মামা চাকরি করতেন চাঁদপুরে।  আমাকে চাঁদপুরের একটি মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি করা হলো।  সেখানে আমি নবম শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছিলাম।  কিন্তু মামাদের পরিবারের কনজারভেটিভ আচরণের জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।  অবশ্য এর পরে এক বছরের মধ্যেই প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্টিক পাশ করে ফেলি।

আনন্দ আলো: আপনার জন্মের সময়ে আপনাদের পারিবারিক-সামাজিক অবস্হা কেমন ছিল?

রিজিয়া রহমান: আমাদের পরিবারে একটা সাংস্কৃতিক আবহ ছিল শুরু থেকেই।  দাদার লেখাপড়ার অভ্যাস ছিল।  দাদার ঘরে সেলফ ভর্তি বিভিন্ন বই ছিল।  তাই আমাদের পরিবার খুবই উদার ঘরানার পরিবার ছিল বলতে হবে।  তবে বাবা মারা যাওয়ার পরে মামাদের পরিবারে এসে লোকজনের কথায় আমাকে বোরখা পরতে হয়েছিল।  তবে তা বেশিদিন স্হায়ী হয়নি।

আপনার বাবা-মা সম্পর্কে বলুন…

আমার বাবার নাম আবুল খায়ের মোহাম্মদ সিদ্দিক।  তিনি পেশায় ছিলেন ডাক্তার।  বাবা খুব সংগীতের অনুরাগী ছিলেন।  বাবা এস্রাজ বাজাতেন।  মাঝে মাঝে বাঁশিও বাজাতেন।  বাবা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতেন।  সেসব তখন আমার মাথায় কিছুই ঢুকতো না।  আমার মায়েরও গান শোনার শখ ছিল তবে মা বাবার মতো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতেন না।  মা শুনতেন সায়গল, জগন্ময় মিত্রের গান।  মায়ের পছন্দের শিল্পী ছিলেন কানন বালা।  মা নিজে গিয়ে দোকান থেকে হিন্দি আর বাংলা গানের রেকর্ড কিনে আনতেন।  মাঝে মাঝে মায়ের সাথে আমিও যেতাম।

প্রকাশিত আপনার নির্বাচিত গল্প বইয়ের ভূমিকায় আপনি লিখেছিলেনণ্ড কবিতা দিয়ে আপনার লেখালেখি শুরু।  সেসব বিষয়ে জানতে চাই…

ছোটবেলায় অনেকটা শখের বশেই কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম।  কবিতা লিখে লিখে খাতা ভরিয়ে ফেলতাম।  কবিতা লিখে বাড়ির কাউকে দেখালে তারা হাসতেন।  বলতেন- আমি অন্য কারো কবিতা দেখে নকল করে লিখেছি! কিন্তু বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে তখন বলতেন, তোর কবিতার খাতাটা নিয়ে আয়তো।  তখন আমাকে লুকিয়ে রাখা কবিতার খাতাটি এনে বাড়ির অতিথির সামনে তুলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো।  সেটি কিন্তু আমার কাছে মোটেও ভালো লাগতো না।

তখন, অর্থাৎ ১৯৫০ এর দিকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো ‘সত্যযুগ’ নামে একটি পত্রিকা।  সেখানে আপনার ‘টারজান’ নামে একটি গল্প ছাপা হয়েছিল।  ছাপার অক্ষরে সেটিই আপনার প্রথম গল্প ছাপা হওয়ার ঘটনা।  সে বিষয়ে শুনতে চাই।  অর্থাৎ গল্প ছাপা হওয়ার অনুভূতি কেমন ছিল….?

যখন ‘টারজান’ গল্পটি ছাপা হয় তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি।  তখন আমার বয়স এগারো বছরের মতো।  গল্পটি সত্যযুগ পত্রিকায় ছোটদের পাতায় ছাপা হয়েছিল।  গল্পটি ছাপা হওয়ার পরে পরিবারের সবাই অনেক প্রশংসা করেছিল।  কবিতা লেখা নিয়ে যারা হাসাহাসি করতো তারাও এবার আমাকে উৎসাহ দিতে শুরু করে।

টারজান’ গল্প ছাপা হওয়ার দীর্ঘদিন পরে ১৯৬০ এর দিকে ইত্তেফাক পত্রিকায় আবার আপনার গল্প ছাপা হয়েছিল।  তারপর থেকেই মূলত লেখালেখি নিয়মিত করে আসছেন।  মাঝখানে বিরতি দেয়ার কারণটা জানতে চাইছি…

_MG_4926-copyলেখক হবো।  লেখক হওয়ার জন্য আমার কোনো প্রস্তুতি কিংবা বলা যায় কোনো চেষ্টাই ছিল না।  শুরুর দিকে লেখা ছাপার আনন্দে লেখা পাঠাতাম আর সেসব লেখা পত্রিকার ছোটদের পাতায় ছাপা হতো।  তখন লেখালেখি নিয়ে সিরিয়াস কিছু অর্থাৎ সাহিত্য নিয়ে ভাবার মতো বয়স বা অবস্হা আমার ছিল না।  এরপরে যখন কলেজে পড়ি তখন থেকে আবার লেখালেখি শুরু করি।  তখন থেকেই বড়দের জন্য লেখার শুরু।  মাঝখানের সে সময়টা, তখন লেখার জন্য কিংবা লেখা প্রকাশের জন্য আগ্রহ বোধ করিনি।  তাই তখন লেখালেখি করিনি।

ইত্তেফাক-এ ‘বিকল্প’ নামে একটি উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবেও কিছুদিন লিখেছিলেন।  সেই উপন্যাসটির বিষয়ে জানতে চাইছি…

লিখেছিলাম তখনকার ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতা যিনি দেখতেন তাঁর উৎসাহে।  তাঁর নাম ছিল কামরুন নাহার লাইলি।  আমি শুরুর দিকে গল্পই লিখেছিলাম।  কিন্তু তিনি বললেন, একটা ধারাবাহিক উপন্যাস লেখা শুরু করতে।  সেভাবেই তখন শুরু হয়েছিল।  তিনি আমাকে গল্প লেখায়ও উৎসাহ দিতেন।  ১৯৬৭ সালে ‘লাল টিলার আকাশ’ নামে একটি গল্প লিখেছিলাম।  তখন ললনা নামে একটি পত্রিকা বের হতো, ওখানেও অনেক গল্প ছাপা হয়েছে।

আপনার প্রথম বই কিন্তু গল্পের।  বইটর নাম ‘অগ্নিস্বাক্ষরা’।  প্রকাশিত হয়েছিল সম্ভবত ১৯৬৭ সালে।  প্রথম বই প্রকাশিত হওয়ার স্মৃতি শুনবো…।  সেই সাথে পরবর্তীতে গল্প খুব বেশি না লিখে উপন্যাসের দিকে অধিক ঝুঁকে যাওয়ার কারণটা জানতে চাই…।

ঠিক।  আমার প্রথম বইটি গল্পের।  ঐ সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো নিয়েই প্রকাশিত হয়েছিল ‘অগ্নিস্বাক্ষরা’।  লেখালেখির একেবারে শুরুর দিকে শৈশবে সাহিত্য না বুঝেই কবিতা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম।  এরপরে বড়দের জন্য প্রথম গল্প লিখে লেখালেখি শুরু।  এরপরে হঠাৎ করেই উপন্যাসে প্রবেশ।  তারপরে যখন দেখলাম আমার যা বলার, কিংবা যেসব বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেছি তা গল্পে পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয়।  এজন্য কিছুটা বড় পরিসর বা বড় ক্যানভাস প্রয়োজন।  সে জন্যই পরবর্তীতে উপন্যাস বেশি লেখা হয়েছে।

আপনার এক লেখায় আপনি বলেছেন গল্প এবং উপন্যাসের ভাষা কিংবা আঙ্গিক ভিন্ন হতে হয়।  সেটি কেমন- একটু বুঝিয়ে বলবেন…

গল্প এবং উপন্যাস এ দু’টো বিষয়ই আলাদা।  উপন্যাসে বিস্তারিত বলার যে সুযোগটা রয়েছে, গল্পে এমনটা নেই বলেই আমার মনে হয়।  গল্প অনেকটা সংক্ষিপ্ত।  উপন্যাস সেখানে বিস্তারিত দাবী করে।  তবে গল্প কিংবা উপন্যাস যাই হোক না কেন, তা সময়ের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন হবেই।  তখন তার ভাষাও ভিন্ন হতে বাধ্য।  এখন এই ২০১৫ তে এসেও আমি বঙ্কিমের ভাষায় উপন্যাস লিখতে পারি না।  কিংবা শরতের মতো গল্পের ভাষা এখন কেউ লিখবে না।  তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, লেখার ভাষাটা যাতে উন্নত সমসাময়িক হয়।

আপনার উপন্যাসগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রতিটি উপন্যাসেই নির্দিষ্ট এবং স্বতন্ত্র বিষয়কে নিয়ে। কোনোটিতে বস্তিজীবনের কথা, কোনেটিতে নিষিদ্ধপল­ীর কথা আবার কোনোটিতে উঠে এসেছে বাংলা এবং বাঙালির ইতিহাসের সন্ধান।  প্রসঙ্গক্রমে আপনার ‘ঘর ভাঙা ঘর’, ‘রক্তের অক্ষর’ এবং ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসের কথা বলতে পারি।  সাহিত্য রচনায় এই যে বহুমাত্রিক বিষয়কে অন্তভর্ূক্ত করা… এ বিষয়ে জানতে চাই।

উচিত যে, আমরা আসলে আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে লিখি না।  অভিজ্ঞতা বিভিন্ন রকমের হতে পারে। ‘ঘর ভাঙা ঘর’ লিখেছি বস্তির মানুষের গল্প নিয়ে।  একসময় আমার বাসার কাছেই বস্তি ছিল।  সেখানকার ছেলেমেয়েরা আমার বাসায় আসতো।  ওদের গল্প আমি শুনতাম।  সেই ক্লেদাক্ত যন্ত্রনার কথা নিয়েই আমি লিখেছি ‘ঘর ভাঙা ঘর’।  আর ‘রক্তের অক্ষর’ উপন্যাসের ভাবনাটি আমি পেয়েছিলাম শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত বিচিত্রার মাধ্যমে।  পত্রিকাটি একবার পতিতাদের নিয়ে একটি কভার স্টোরি করেছিল।  তখন সেখানে কাজ করতো শাহরিয়ার কবির, আনু মুহাম্মদ, শামীম আজাদ এঁরা।  আমি পত্রিকায় নিউজটা পরে শাচৌর কাছে গিয়ে বললাম, স্টোরিটা আমার ভালো লেগেছে।  তখন শাচৌ আমাকে বলল, আপনি এই বিষয়ে একটা উপন্যাস লিখতে পারেন।  আমি বললাম, এই বিষয়ে আমি কি করে লিখবো? তখন তিনি আমাকে বললেন, আমাদের কাছে এই কভার স্টোরি করার জন্য যতো ইনফরমেশন ছিল সব আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি।  দরকার হলে আমাদের রিপোর্টার আপনাকে সাহায্য করবে।  এইভাবে শুরু হলো ‘রক্তের অক্ষর’ লেখা।  এরপরে ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসটি লিখেছি বাঙালির ইতিহাসকে তুলে ধরার জন্য।  বাংলাদেশের জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তন নিয়ে উপন্যাসটির ব্যাপ্তি।  প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বং গোত্র থেকে শুরু হয়ে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পর্যন্ত এই উপন্যাসের বিস্তৃতি।  বাংলার সাধারণ মানুষ সব সময়ই অবহেলিত, নির্যাতিত এবং উপেক্ষিত।  তারা কোনোদিনই অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক মুক্তি পায়নি।  এখানে আমি একই সাথে ইতিহাস এবং একটি জাতি কিভাবে স্বাধীনতার মর্যাদায় এসে দাঁড়িয়েছে তা দেখিয়েছি।

আনন্দ আলো: এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই।  আপনারা যখন সাহিত্য চর্চা শুরু করলেন সেই মধ্য পঞ্চাশের দিকে, তখন একজন নারী হিসেবে সাহিত্য চর্চার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছিলেন কিনা?

রিজিয়া রহমান: আমি আগেই বলেছি আমাদের পরিবারটি যথেষ্ট সংস্কৃতবান পরিবার ছিল।  পরিবারে আগে থেকেই প্রচুর বই ছিল।  মাধ্যমিকে পড়ার সময়েই ঘরে থাকা শরতের সব গল্প, উপন্যাস পড়েছিলাম।  তাই লেখালেখি শুরু করতে বা চালিয়ে যেতে আমার খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি।  হ্যাঁ, এটাও আমি জানি যে, এই জায়গাটি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল না।  বেগম রোকেয়ার সময়ে হয়তো এমন পরিবেশ ছিল না।

rezea-rahmanআনন্দ আলো: আপনাদের সময়েরই আরেকজন খ্যাতিমান নারী কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন।  তিনিও দীর্ঘদিন ধরে লিখে চলেছেন।  প্রায় একই সময় হতে আপনারা লেখালেখি করে আসছেন, লেখক হিসেবে রাবেয়া খাতুন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন শুনবো…

রিজিয়া রহমান: আমরা যখন ছোট তখন থেকেই রাবেয়া আপা লেখক হিসেবে বেশ পরিচিত।  একটু আগে তুমি যেমনটি বলেছিলে যে, নারী লেখকদের লেখালেখির পরিবেশ… এখন তার জবাবে বলছিণ্ড আমাদের জন্য লেখালেখির ক্ষেত্রটা সহজ এবং প্রস্তুত করেছিলেন রাবেয়া আপা, রিজিয়া খানম এঁরা।  তাঁরা যখন লেখালেখি শুরু করেছিলেন তখন পরিবেশটা একজন নারী লেখকের জন্য সুখকর ছিল না।  কিন্তু তাঁরা তাঁদের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে পুরুষের পাশাপাশি নারী লেখকদের জন্য একটি সম্মানজনক জায়গা তৈরি করতে পেরেছিলেন।

রাবেয়া আপার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রায় ৩৫ বছরের।  তাঁর সাথে আমার এক ধরনের সিনিয়র-জুনিয়রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।  আমাদের মধ্যে অনেক সুখকর ঘটনা রয়েছে।  আমার মতে ব্যক্তি রাবেয়া খাতুন একজন সাহসী, অনমনীয় এবং সৎ মানুষ।  আর লেখক রাবেয়া খাতুন একজন পথপ্রদর্শক।  অন্য নারী লেখকদের জন্য প্রেরণার উৎস।  তাঁর অসংখ্য গল্প উপন্যাস এবং ভ্রমণ রচনা আমি পড়েছি।  তার মধ্যে ‘বায়ান্ন গলির এক গলি’ এবং ‘নীল দংশন’ আমার খুবই প্রিয়।

আনন্দ আলো: এবার আমরা একটু সাম্প্রতিক বিষয়ের দিকে আসি।  সেটিও অবশ্য আপনার গল্প প্রসঙ্গে।  ‘চার দশকের গল্প’ শিরোনামে আপনার একটি গল্পগ্রন্হ রয়েছে।  সেখানে প্রথম গল্পটির নাম ‘সোনার হরিণ চাই’।  এই গল্পটিতে আপনি অভিবাসীদের জীবনের নিঃসঙ্গতা ও নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরেছিলেন।  আপনার গল্প লেখার এতো বছর পরে আমরা এখন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখছি সারাবিশ্বে অভিবাসীদের দুর্দশা ও দুরাবস্হার ঘটনা।  হাজার হাজার লোক সাগরে ভেসে বেরাচ্ছে।  এমনটা হওয়ার কারণ কি বলে আপনার কাছে মনে হয়?

রিজিয়া রহমান: ‘সোনার হরিণ চাই’ গল্পে বিদেশে অবস্হানরত বাংলাদেশী অভিবাসীদের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে পাত্রপাত্রীদের মধ্য দিয়ে।  সেখানে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিতে যাওয়া অভিবাসীদের নিঃসঙ্গতা ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে লিখেছিলাম।  আর এখন বাংলাদেশে যেটি হচ্ছে সেটি হলোণ্ড একটু উন্নত জীবন যাপনের আশায় মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশ যাচ্ছে।  বাসায় ফ্রিজ, টিভি, সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করা এসব আশায় মানুষ জায়গা জমি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।  দালালদের খপ্পরে পড়ছে।  মানব পাচারকারী, অপহরণকারীদের চক্করে আটকে পড়ছে।  আর হাজার হাজার মানুষ সাগরে ভেসে বেড়ানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক।  রাষ্ট্রগুলো তাদের ক্ষমতা আটকে রাখার জন্য কিংবা বহিঃবিশ্বে তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করার জন্য, নিজেদের সুবিধা আদায়ের জন্য সাগরে লোকদেরকে ভাসমান অবস্হায় রাখছে।

আবারও ফিরে আসি আপনার লেখালেখির বিষয়ে।  বিগত কয়েক বছর যাবৎ আপনাকে আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা রচনার দিকে আগ্রহী দেখা যায়।  আমরা জানি যে, আপনি প্রথমে কবিতা দিয়ে শুরু করলেও পরবতর্ীতে গল্প এবং আরো পরে উপন্যাসেই বেশি মনোযোগী হয়েছিলেন।  সে ক্ষেত্রে এখন আত্মজৈবনিক রচনার দিকে মনোনিবেশ করার বিষয়ে বলবেন…

যাপন করে এসেছি, সেটিই আমি লিখছি।  আমার কাছে সব লেখাই একই রকম আনন্দের।  একসময় কবিতা লিখতাম।  তারপরে ছড়া লিখেছি, গল্প লিখেছি, উপন্যাস লিখেছি।  এখন আত্মজীবনী লিখছি।  আমার আত্মজীবনীমূলক প্রথম বইটি হলো ‘অভিবাসী আমি’।  এর পরে লিখেছি ‘নদী নিরবধি’।  ‘অভিবাসী আমিতে’ লিখেছিলাম শৈশবের শুরুটা।  নদী নিরবধিতেও শৈশব থাকবে।  এখানে ১৯৫২ পর্যন্ত লিখেছি।  এরপরে এখন যেটি লিখছি সেখানে পারিবারিক বিষয় নিয়ে লিখছি।  সেখানে লেখক জীবন পর্যন্ত লিখবো।  কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখে উঠতে পারবো কিনা জানি না।

নিজের কাছে দরকারি বলে মনে হয়েছে তাই লিখেছি।  আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেছি।  তেতালি­শের দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, ভারত-পাকিস্তান ভাগ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এসব আমি দেখেছি।  ঐ সময়টা আমাদের সমাজ, সাহিত্য এবং রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়।  তাই আমি ঐ সময় নিয়ে লিখেছি।  বলা যায় যে, ঐ সময়টাকে ধরে রাখার জন্যই স্মৃতিকথা লিখছি।