Home এক্সক্লুসিভ মেসি ও নেইমার কর্তৃক একটি কৃতজ্ঞতা পত্র

মেসি ও নেইমার কর্তৃক একটি কৃতজ্ঞতা পত্র

SHARE
Messi-neymar

শাহানা বেগমের যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। হাতে চিমটি কেটে দেখলেন ঘটনা সত্য। যা দেখছেন সত্য দেখছেন। এক বর্ণও মিথ্যা দেখছেন না। লিওনেস মেসি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মিট মিট করে হাসছেন মিসি। যেন মুক্তো ঝরছে তার হাসিতে। শাহানা বেগম আরেকবার ধাতস্থ হতে চাইলেন। তিনি কি স্বপ্ন দেখছেন নাকি বাস্তবে ঘটছে ঘটনাটা? আর্জেন্টিনার লিওনেস মেসির তো এখন রাশিয়ায় থাকার কথা। বিশ্বকাপ ফুটবলের এবারের আসরে অনেক কষ্টে সেরা ষোলোতে উঠেছে মেসির আর্জেন্টিনা। এ নিয়ে শাহানার খুশির অন্ত নাই। আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে নিজের বাড়িটা রঙ করার পর থেকে তার বাড়িটার নাম হয়ে যায় আর্জেন্টিনা বাড়ি। শাহানা বেগমকে অনেকে আর্জেন্টিনা বলেও ডাকে। পথে ঘাটে পরিচিত জনেরা দেখলেই বলে ওঠেÑ এই যে আর্জেন্টিনা কেমন আছো?

শাহানা বেগমের ভালই লাগে। আর্জেন্টিনা মানেই ম্যারাডোনার দেশ। ম্যারাডোনার খেলা দেখে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের ভক্ত হয়ে যায় শাহানা বেগম। অবশ্য এক্ষেত্রে তার বাবার ভ‚মিকাও কম নয়। শাহানা বেগমের বাবা রহমত আলী সর্দার এক সময় ফরাশগঞ্জ ফুটবল ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলতেন। ম্যারাডোনার ফুটবল খেলা দেখতে দেখতে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের ভক্ত হয়ে যান। বাবার প্রভাব মেয়ের উপরই পড়ে। শাহানা বেগম ম্যারাডোনার যেমন ভক্ত। তার চেয়ে বেশি ভক্ত লিওনেস মেসির। পুরনো ঢাকার বাসায় ড্রয়িং রুমে বিশাল দেওয়াল জুড়ে মেসির একটা ছবি বাঁধাই করে রেখেছেন। সেই মেসি কিনা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এটাও বিশ্বাসযোগ্য।

শাহানা আবার নিজের হাতে চিমটি কাটলেন। সব কিছুই তো বাস্তবে ঘটছে। একবার ভাবলেন চিৎকার করে পাড়ার সবাইকে মেসির কথা জানাবেন। পরক্ষনেই মনে হলো চিৎকার করে পাড়া প্রতিবেশিকে ডাকার পর ভীড় ঠেকানো মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। তখন আর মেসিকে একান্তে নিজের করে পাওয়া যাবে না। আহারে! কত দিনের শখ মেসিকে এক নজর দেখার। সৃষ্টিকর্তা সেই শখ পুরণ করে দিয়েছেন। মেসিকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকলেন শাহানা। ঘরের দেওয়ালে নিজের বিশাল সাইজের ছবি দেখে মেসি অবাক হয়ে জানতে চাইলেনÑ আমার এতো বড় ছবি, কোথায় পেয়েছেন? শাহানা আবেগে কথা বলতে পারছেন না। গলা জড়িয়ে আসছে। মেসির কথা শুনে শুধু বললেন, আপনার ছবি পাওয়া তো কতো সহজ। আপনি বাংলাদেশে এসেছেন, তাও আবার আমাদের বাসায়। আমি বিশ্ববাস করতে পারছিনা। মেসি হাসতে হাসতে বললেন, বিশ্বাস না হওয়ার কি আছে। আমি আসলে এসেছি বাংলাদেশের মানুষের দোয়া নিতে। সেরা ষোলোতে উঠার পর আমাদের ফুটবল গুরু ম্যারাডোনাই আমাকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠালেন। তারও আসার কথা ছিল। কিন্তু গ্যালারিতে চিৎকার চেচামেচি করতে গিয়ে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, সেরা ষোলোতে নামার আগে বাংলাদেশ থেকে ঘুরে আসো। বাংলাদেশের মানুষের দোয়া নিয়ে আসো। সত্যি আমরা বাংলাদেশের মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। শুনেছি যেদিন শেষ ষোলোতে উঠার লড়াইয়ে আমরা মাঠে নেমেছিলাম সেদিন আপনারা বাংলাদেশের মানুষ নাকি দারুণ উৎকণ্ঠায় ছিলেন। শাহানা বেগম বললেন, সে কথা আর বলবেন না। রীতিমত রুদ্ধর্শ্বাসপুর্ণ পরিস্থিতি। আমাদের বাড়িতে মিলাদের আয়োজন করা হয়েছিল। আপনাদের জয়ের জন্য আমরা বিশেষ মুনাজাতের ব্যবস্থা করেছিলাম। এবার বিশ্বকাপে আপনি গোল পাচ্ছিলেন না বলে নানা জনে নানা কথা বলছিল। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে শুধু প্রার্থনা করছিলাম আপনার গোলেই যেন আর্জেন্টিনা জিতে যায়। সৃষ্টিকর্তা আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন। আপনার গোলেই আর্জেন্টিনার জয়ের পথ খুলে যায়। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

শাহানার কথা শুনে মেসি এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, বাড়িতে আর কাউকে দেখছি না যে। আর কেউ নাই?

শাহানা মৃদু হেসে বললেন, সবাই রাত জেগে ফুটবল খেলা দেখেছে। এখন ঘুমাচ্ছে।

মেসি অবাক হয়ে বললেন, আপনারা ফুটবলকে এতো ভালোবাসেন? আপনাদের নিজেদের ফুটবলের খবর কি?

Messi-neymar-1মেসির কথা শুনে শাহানা যেন একটু হোঁচট খেলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, আপনি একটু বসেন। আমি আপনার জন্য চা নিয়ে আসছি। আপনি কি চা খাবেন? নাকি ফলের জুস খাবেন! আপনি বরং ফলের জুস খান। আমাদের গাছের আমের জুস। আপনি বসেন। আমি আসতেছি…

থেকে ফিরছিলেন আজাদ রহমান। বাংলামটর মোড়ে এক তরুণ হঠাৎ গাড়ির সামনে এসে উপস্থিত। সে খুব ব্যস্ত। মনে হচ্ছিলো তাকে কেউ তাড়া করেছে। নিজেই গাড়ির দরজা খুলে গাড়ির পিছনের সীটে বসতে বসতে বলল, ভাই গাড়ির এসিটা একটু বাড়িয়ে দেন তো… আজাদ রহমান অবাক হয়ে বললেন, অ্যাই আপনি কে? এভাবে গাড়িতে উঠলেন কেন? নামেন… নামেন… বলতেছি। না হলে কিন্তু পুলিশ ডাকবো।

তরুণ মৃদু হেসে বলল, ভাই আপনি এতো উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? আপনি কি আমাকে চিনতে পারতেছেন না? একটু ভালো কইর‌্যা দেখেন। চিনতে পারবেন। আমার নাম নেইমার। ব্রাজিলের নেইমার।

আজাদ রহমান অবাক হয়ে বললেনÑ অ্যাই মিয়া আপনি কি আমার সাথে ইয়ার্কি করতেছেন। ব্রাজিলের নেইমার বাংলাদেশে আসবে কি করে? সে তো এখন রাশিয়ায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতেছে…

নেইমার আগের মতোই মৃদু হেসে বলল, ভাই বিশ্বাস করেন আমিই নেইমার। ব্রাজিল শেষ ষোলোতে উঠার পর আমাদের মনে হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের দোয়া নেবার জন্য একঘণ্টার জন্য হলেও এই দেশে আসা দরকার। তাই একঘন্টার জন্য আপনাদের বাংলাদেশে এসেছি। আপনার কাছে আসার একটা বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। আমরা শুনেছি বাংলাদেশে আপনারা স্বামী-স্ত্রী নাকি দুই দলের সাপোর্টার। আপনি ব্রাজিল। আর আপনার স্ত্রী শাহানা আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আপনারা নাকি পৃথক হয়ে গেছেন। এটা ভাই একটা অভিনব ঘটনা। আমাদের ব্রাজিলেও এমন ঘটনার নজীর পাবেন না। সেরা ষোলোতে ব্রাজিল উঠে যাবার পর আমাদের মনে হলো বাংলাদেশে এসে আপনাদের কাছে দোয়া নিতে হবে। তাই একঘণ্টার জন্য বাংলাদেশে এসেছি। গাড়িতে যেতে যেতেই কথা বলি। আমাদের জন্য এবার একটু বেশি করে দোয়া করবেন। বাকি ম্যাচ গুলোতে যেন আমরা ভালো করি।

এখন যা ঘটছে তার কিছুই আজাদ রহমানের বিশ্বাস হচ্ছে না। দ্রæত গাড়ি চালিয়ে ধানমন্ডির বাসায় এসে ঢুকলেন তিনি। নেইমার নামের তরুণও তার পিছু পিছু ঘরে ঢুকেছে। আজাদ রহমানের ঘরের দেওয়ালে নিজের একটা বিরাট সাইজের ছবি দেখে নেইমার অবাক হয়ে বললেনÑ এতো বড় ছবি তো আমার নিজের বাসাতেও নাই। ভাই একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?

জ্বি বলেন। বিগলিত কণ্ঠে বললেন আজাদ রহমান।

নেইমার জানতে চাইলেনÑ আপনাদের বাংলাদেশে এসে তো ভাই আমি রীতিমত অবাক। যেখানেই তাকাই সেখানেই হয় ব্রাজিল না হয় আর্জেন্টিনার পতাকা। আপনারা কি এই দুইটা দেশ সম্পর্কে ভালো করে জানেন? বিশেষ করে আমাদের ব্রাজিলকে নিয়া আপনার কোনো ধারনা আছে?

না নাই। বিব্রত হয়ে জবাব দিলেন আজাদ রহমান। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ভাই আমি কিন্তু এখনও বিশ্বাস করতে পারতেছি না আপনি স্বশরীরে আমাদের বাংলাদেশে আসছেন। হাতটা দিবেন একটু ছুঁয়ে দেখবো। নেইমার হাত বাড়িয়ে দিতেই আজাদ রহমান ছুঁয়ে দেখে বললেন, ঘটনাতো ঠিকই আছে। কিন্তু রাশিয়ায় খেলা রাইখ্যা আপনি হঠাৎ বাংলাদেশে…? কেন?

নেইমার হাসতে হাসতে বললেন, আপনাদের বাংলাদেশের মানুষের দোয়া নিতে আসছি। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

আজাদ রহমানের কোনো ভাবেই বিশ্বাস হচ্ছে না তিনি বিশ্বখ্যাত ফুটবলার নেইমারের সাথে কথা বলছেন। তবুও মনে হলো ঘটনা যখন ঘটছেই তখন কিছু প্রশ্নের উত্তর জেনে নিলে কেমন হয়? নেইমারের দিকে তাকালেন তিনিÑ ভাই আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করবো?

করেন। মাথা নেড়ে শায় দিলেন নেইমার।

আজাদ রহমান ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন, এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলটাকে কেমন দেখছেন?

কেন? ভালোই তো…

দূর্মূখেরা বলে আপনি নাকি এবার মাঠে বেশ অভিনয় করতেছেন?

নেইমার মৃদু হেসে বললেন, ঘটনা সত্য। শুধু আমি না। এবার মাঠে অনেকেই অভিনয় করছে। যে যত বড় অভিনেতা সে তত বড় খেলোয়াড়।

তার মানে আপনি কি মেসিকেও একজন অভিনেতা বলবেন?

হ্যা। সেও একজন অভিনেতা। সে এখন কোথায় জানেন?

কোথায়?

আপনাদের বাংলাদেশে।

মানে কি বলতেছেন আপনি?

হ্যা মেসি এখন ঢাকায়। আপনার স্ত্রীর সাথে বৈঠক করতেছে। সেও বাংলাদেশের মানুষের দোয়া নিতে আসছে। দোয়া নেওয়া মানে অভিনয় করা।

তার মানে আপনিও আমার সাথে অভিনয় করছেন? দোয়া নেওয়ার অভিনয়?

মেসি হঠাৎ বিব্রত হয়ে বললেন, না-না অবস্থাটা ঠিক এমন নয়। বাংলাদেশের মানুষকে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি।

হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। আজাদ রহমান বিছানা থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। শাহানা বিছানায় নেই। বিছানা থেকে নেমে বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। দেখলেন শাহানার হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। আজাদ রহমানকে দেখে শুধু একটাই প্রশ্ন করলেনÑ হ্যা গো, বিশ্বকাপে আমাদের বাংলাদেশ কবে খেলবে? আমাদের এই পতাকাটা কবে উড়বে?

আজাদ রহমান স্ত্রীর দিকে ছলছল চোখে তাকালেন। বললেন, উড়বে, আমাদের পতাকাও উড়বে… দেখে নিও একদিন…