Home মুখোমুখি মুখোমুখি গল্প কথায় মামুন ও বাচ্চু

মুখোমুখি গল্প কথায় মামুন ও বাচ্চু

SHARE
Mamun-baccu

সৈয়দ ইকবাল
শহরে সেদিন শরতের সকালটা বেশ শুভ্রতা নিয়েই হাজির হয়। একে তো ছুটির দিন তার উপর প্রিয় দুজন মানুষের সান্নিধ্য- সবমিলিয়ে সোনায় সোহাগা বলতে হবে। সেদিন যেনো নাগরিক যন্ত্রণা কিছুটা হলেও দূরে ছিলো অন্তত নাট্যাঙ্গণ থেকে। কেননা নাট্যপ্রেমী মানুষেরা প্রাণখুলে কিছু কথা বলার সুযোগ পেয়েছিল তাদেরই প্রিয় জন মামুনুর রশীদ ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ এর সাথে। আর তাই তো সেদিন সবাই যেনো দেশের নাট্যাঙ্গণ নিয়ে কিছু কথা বলতে পেরে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছেন। তিন প্রজন্মের নির্দেশক, নাট্যকার ও দর্শকদের সঙ্গে আলাপনে তারা বললেন নিজেদের নাট্যচর্চার গল্পও। দেশের নাট্যচর্চার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেছেন তারা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, কেরামত মাওলা, ড. ইনামুল হক, অধ্যাপক আবদুস সেলিম এবং কলকাতার নাট্যজন বিভাস চক্রবর্তী প্রমূখ।
এক কথায় নাট্যপ্রেমীদের জন্য মুহূর্তটি ছিল আনন্দের, অজানাকে জানা আর সংস্কৃতিজনের স্মৃতিবাক্যে বিনোদিত হওয়ার শুভক্ষণ। দুজনই বিদগ্ধ নাট্যপুরুষ। দুজনই নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতাসহ বহু গুণে গুণান্বিত। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে মেঠো আলো পথ থেকে যারা বিগত ৪৭ বছর ধরে রক্ত, ঘাম ও শ্রম দিয়ে আজ রাজপথে পরিণত করেছেন সেই অগ্রজ নাট্যজনদের অন্যতম মামুনুর রশীদ ও নাসিরউদ্দিন ইউসুফ। আলাপনে এ দুজন শোনালেন বাংলা নাটকের উত্থান ও বিস্তারের কথা। কোন কথাই কাল্পনিক নয়, বাস্তবতার নিরিখে নাট্যান্দোলনের স্মৃতিকথায় মুগ্ধ করেছেন মহিলা সমিতির মিলনায়তন ভর্তি দর্শক-শ্রোতাদের। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন দুজনে সাবলিল ভাবে। দেশে প্রথমবারের মতো ব্যতিক্রমধর্মী এই আলাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মঞ্চ নাটকের নির্দেশকদের সংগঠন ‘থিয়েটার ডিরেক্টরস ইউনিটি’।
আলাপনের শুরুতেই ৬০ দশকের নাট্য ও সংস্কৃতিচর্চা নিয়ে আলোকপাত করেন দুই নাট্য ব্যক্তিত্ব। পরে আলাপনের ধারাবাহিকতায় তাদের কথায় মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের নাট্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রসঙ্গ উঠে আসে। প্রথমেই কথা বলেন নাট্যকার, নিদের্শক ও অভিনেতা মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ষাটের দশকে রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য খুব চমৎকার ছিল। সাংস্কৃতিক কর্মী, কবি, সাহিত্যিক, ছাত্র রাজনীতি এবং রাজনীতি যারা করতেন তাদের সঙ্গে মিল ছিল। যেটা এখন আর নেই। এখন যিনি রাজনীতি করেন সংস্কৃতির সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। ষাটের দশকে এই যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তা বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা থেকেই। এই সম্পর্ক না থাকার কারণেই এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে সা¤প্রদায়িকতা, মৌলবাদ এগুলোর রাজনীতিতে উত্থান হচ্ছে। তখন আমরা যারা সংস্কৃতি ক্ষেত্রে কাজ করি, তাদেরকে বলা হতো কবিতা, ¯েøাগান, পোস্টারসহ নানা বিষয় লিখে দিতে। আমাদের নাট্য সংস্কৃতির একটা বড় উপাদান হিসেবে দেখা দিল উৎসব। ঢাকা তো বটেই, ঢাকার বাইরেও প্রচুর নাট্যোৎসব হতো। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে জেলা শহরগুলোর সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হত। রাজনৈতিক থিয়েটারের একটা বড় দিক হলো পথ নাটক। এই পথনাটক দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের একটা হাতিয়ার হয়ে ওটে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এই পথ নাটক নিয়ে নানান ধরনের মন্তব্য আছে।
নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বলেন, আমরা যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলি তা পঞ্চাশের দশক থেকে আস্তে আস্তে দানা বাঁধতে শুরু করে। ষাটের দশকে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। পঞ্চাশের দশকে মওলানা ভাসানী এবং ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই এর পূর্ণতা পায়। একদিকে ছায়ানট, অন্যদিকে নাটক, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নাটক এর সহযোগী হয়ে ওঠে। তখন আমরা রাজধানীর নবাবপুরে মাঝে মধ্যে নাটক করতাম। তখন নাট্য আন্দোলনের মিছিলে ছিলাম। কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কবি নির্মলেন্দু গুণ একদিন বললেন, আপনার দ্বারা কবিতা হবে না। আশাহত হয়ে ছেড়ে দিলাম। অবশ্য পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি কবিতা লিখেছিলাম। মামুনুর রশীদের সঙ্গে আমার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সরাসরি পরিচয় ছিল না। রেডিও টেলিভিশনে ওনার কণ্ঠস্বর ছিল ভিন্ন। সে জন্য এক ধরনের আকর্ষণ তার প্রতি আমাদের মতো তরুণদের ছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে মামুন ভাই ও আমরা একই রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের ছত্র-ছায়ায় হলেও ভবিষ্যতে তেমন ছিল না। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে তখন প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ড্রামা সার্কেল। ছেষট্টিতে ৬ দফা আন্দোলন শুরু হলে নগর কেন্দ্রিক নাট্যচর্চা শুরু হয়। ষাটের দশকে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ গঠন। শিল্পীদেরই সংগঠন ছিল এটি। পরাধীন দেশে সংস্কৃতিকর্মীরা যে বীজটি বপন করায় সক্ষম হয়েছিল সেটা হচ্ছে যে দেশটি স্বাধীন হবে, সেটি যদি বাংলাদেশ হয়, সেটি অবশ্যই মানুষের সমঅধিকারের দেশ হবে। সমাজতন্ত্রের যে ভাবনা শিল্পীদের মধ্যে ছিল তা রাজনীতিতে সফলভাবে সন্নিবেশিত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এটি ছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি বড় জায়গা।
তিনি আরো বলেন, ‘নাট্যকার যা লিখবেন, নির্দেশক সেটার অনুসরণে অভিনেতাকে প্রস্তুত করবেন। অভিনেতা মঞ্চে যাবেন তৃতীয় চরিত্র নিয়ে। সেটি না হবে নাট্যকারের লেখা চরিত্র, না হবে নির্দেশকের নির্দেশিত চরিত্র। সেটি হবে তাঁর নিজের চরিত্র। একে বলে ক্রিয়েটিভ ট্রান্সলেশন অব টেক্সট, যেটি মুহূর্তে মিলিয়ে যাচ্ছে।’ তাঁর এ বক্তব্যের ভেতরে আকস্মিকভাবে প্রবেশ করেন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘তোমার ভাবনায় একটা বিরাট পরিবর্তন এসেছে। তুমি ও সেলিম আল দীন আগে বলতে, অভিনয় একটি তৃতীয় শ্রেণির শিল্প। আজ বলছ অভিনয় একটি সার্বভৌম শিল্প। সেলিম আল দীন যখন কথাটা বলত, আমি বলতাম, অভিনয় পারো না বলে এমন কথা বলছ।’ মামুনুর আরও রশীদ বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের মনেও এই উটকো ধারণা ছিল। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, অভিনয় হচ্ছে পরজীবী শিল্প। আমি জানতে চাইলাম, ‘হারানো সুর’ ছবিটা কার মনে আছে? তিনি বললেন, না তো, কার? আমি বললাম উত্তম-সুচিত্রার কথা মনে আছে? তিনি বললেন হ্যাঁ।’
দুই অগ্রজের এমন প্রাণবন্ত কথায় মহিলা সমিতির আইভি রহমান মিলনায়তন তখন বেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। নাট্য নির্দেশক তথা নাট্যাঙ্গণের মানুষের মাঝে বেশ আমেজ লক্ষ্য করা যায়। দুজন গুণী নাট্যজনের কাছ থেকে কিছু কথা জানতে পেরে যেনো তারা বেশ উৎফুল্ল।
আলোচনায় নাটকের সেট নিয়েও কথা হয়। মামুনুর রশীদ বলেন, নাটকের সেট হতে হবে নাটকে গল্পের সাথে যাওয়ার মতো। রাজ দরবারের কোনো নাটকের গল্প বললে যে মঞ্চকে একেবারে রাজ দরবার বানিয়ে ফেলতে হবে তা কিন্তু নয়। যেমন আমাদের যাত্রায় একটি নরমাল চেয়ার রেখে সেটা দর্শকের সামনে সিংহাসন বলা হয় এবং মরুভূমি আর ইরানের গল্প বলার সময় যাত্রায় অভিনেতার প্রাণবন্ত আর বিশ্বাসযোগ্য ডায়লগের ডেলিভারিতে দর্শকদের নরমাল দৃশ্যটাকেই সব বুঝিয়ে দেয়া হত। আমি একবার একটি নাটকে অভিনয় করার সময় দেখলাম এমনভাবে মঞ্চ ডিজাইন করা হয়েছে যে সেখানে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা দাঁড়ানোর জায়গা নেই। একজন অভিনয়শিল্পী যদি অভিনয় করার সময় বডি মুভমেন্ট করতে না পারেন তাহলে তাকে চরিত্রটি নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হওয়া বেশ কষ্টকর। আমার মতে, সেট তো অবশ্যই লাগবে। কিন্তু সেখানে পরিমিতিবোধ শব্দটার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। শুধু ট্রাকে ট্রাকে করে সেটের জিনিস এনে অভিনয়শিল্পী তৈরি না করে কিন্তু নাটক হয় না। বরং অভিনয়শিল্পীরা দর্শকদের সামনে প্রাণবন্ত আর বিশ্বাসের বিষয়টার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
আলাপনে ওঠে আসে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের নাট্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রসঙ্গ। এ আয়োজনের প্রশংসা করেন রামেন্দু মজুমদার বলেন, এ রকম আয়োজন নিয়মিত করা প্রয়োজন। এতে করে অগ্রজদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্ম অনেক কিছু জানতে এবং শিখতে পারবে। শুধু তাই নয়- অগ্রজরা ফেলে আসা জীবনে তাদের নানান অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলে, নতুনরা সেখান থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে বরং সামনে এগুতে পারবে। আমি এমন আয়োজনের জন্য ‘থিয়েটার ডিরেক্টরস ইউনিটি’কে ধন্যবাদ জানাই। তারা নিয়মিতভাবে এই ধারা অব্যাহত রাখবেন বলে আমার বিশ্বাস।’
নাট্যজন ড. ইনামুল হক বলেন, ‘এমন আয়োজন সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। আমি নিজেও এই আলাপনে এসে অনেক কিছু জানতে পারলাম। অগ্রজরা তাদের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাটা অনেক জরুরি। আমরা যারা সেই ষাট-সত্তুর দক থেকে আজকের থিয়েটারটাকে নিয়ে এসেছি তাদের অনেক কিছুই বলার আছে এবং তা আবার নতুন প্রজন্ম নেয়ার বিষয় আছে। আলাদাভাবে হয়তো সবসময় সব কথা বলাও যায় না। বরং এমন উদ্যোগ হলে আড্ডা এবং গল্পের ছলে অনেক কথাই বলা যায়। আমি আবারো এমন আয়োজনের জন্য ‘থিয়েটার ডিরেক্টরস ইউনিটি’কে ধন্যবাদ জানাই।’
আলাপনের শেষ পর্যায়ে মামুনুর রশীদ ও নাসির উদ্দিন ইউসুফকে উপস্থিত নির্দেশক তথা তরুণ অনেক অভিনয়শিল্পী ও নাট্যজনেরা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। সেসব প্রশ্নের জবাবও দেন তাঁরা। তুলে ধরেন নিজেদের সৃজনশীল জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথাও।