Home প্রতিবেদন মহাস্থান খোলামঞ্চে নাটকের মহাযজ্ঞ

মহাস্থান খোলামঞ্চে নাটকের মহাযজ্ঞ

SHARE
Moncho

বিভিন্ন প্রতœতাত্তি¡ক স্থান নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রতœনাটক করছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এরই ধারাবাহিকতায় আড়াই হাজার তিনশতাধিক শিল্পী-কলাকুশলীর অংশগ্রহণে নির্মিত প্রতœনিদর্শন মহাস্থানগড়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের শৈল্পিক উপস্থাপন।
বছরের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে প্রতœনাটক ‘মহাস্থান’ মঞ্চায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ড. সেলিম মোজাহার-এর রচনায় এবং লিয়াকত আলী লাকীর নির্দেশনায় প্রযোজনাটির উদ্ধোধনী মঞ্চায়ন ২৩ নভেম্বর বগুড়ার মহাস্থানগড় ভাসু বিহারে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমি প্রযোজিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই প্রতœনাটকটি ২৩ নভেম্বর ২০১৮ সন্ধ্যা ৬টায় মঞ্চায়নের উদ্ধোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মঞ্চসারথি নাট্যজন আতাউর রহমান, বিশিষ্ট নাট্যজন অধ্যাপক আবদুস সেলিম, প্রতœতত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলতাফ হোসেন, বগুড়ার জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ, পুলিশ সুপার মো. আলী আশরাফ ভূইঞা বিপিএম এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মো. বদরুল আনম ভূঁইয়া।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘বগুড়া আমার খুবই প্রিয় শহর। বগুড়ার মাটি যেমন উর্বর এর সংস্কৃতির ইতিহাসও অনেক পুরনো। মহাস্থান হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমান তিনটি সভ্যতার শিল্প পিঠস্থান। এই স্থানকে নিয়ে নির্মিত নাটকটি বিশেষ গুরুত্ববহ।’
মহাস্থান নাটকে আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে সময়ের পরম্পরায় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম পর্যন্ত সময়কালকে একক গ্রন্থনায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই নাটকে প্রাচীন শিকারযুগ থেকে শুরু করে বৈদিকযুগ, আদিবাসি পর্ব, রামায়নের গীত, কালিদাসের কাব্য, চর্যাপদ, সুফিসামা, বৈষ্ণব পদাবলী, ব্রাহ্মসংগীত, লোকগান, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ব্রতচারীদের গান, পঞ্চকবির গান, ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ইতিহাস, কাব্য-গীত ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা পালাগানরূপে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাস ঐতিহ্য উপস্থাপনের পাশাপাশি আমাদের যে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের আলোকিত অধ্যায় রয়েছে, সেটাই মহাস্থান নাটকের মধ্যদিয়ে প্রকাশের চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রাচীর বেষ্টিত এই নগরীর ভেতর রয়েছে বিভিন্ন সময়ের নানা প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা এখানে রাজত্ব করেছিলো। ‘মহাস্থান’ প্রতœনাটকের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন সময়ের শাসন শোষণের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই স্থানটি একসময় ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবেও
পরিণত হয়েছিলো। ধর্মের বাণী বুকে নিয়ে কেউ মানবতার কথা বলেছেন কেউ আবার মানুষের অধিকার নষ্ট করেছেন। এসব কীর্তি, কৃষ্টি ও সভ্যতার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে ‘মহাস্থান’ নাটকে। এ প্রসঙ্গে নাটকটির নির্দেশক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘ পৃথিবীতে এভাবে আর্কিও ড্রামার ইতিহাস নেই। এর কাজ প্রতœ-ইতিহাসকে দৃশ্যকাব্যে রূপান্তরিত করে শিল্পে রূপ দেয়া। মহাস্থানের গৌরবোজ্জ্বল আখ্যানের ভিতর দিয়ে সমগ্র বাঙলার মহাস্থান হয়ে ওঠার গল্প। মহাস্থান, কোটি বছরজুড়ে এ-মাটির জেগেওঠার কথা। হাজার হাজার বছর ধরে তার মানব বসতির কথা।’ নাট্যকার সেলিম মোজাহার বলেন, ‘বাঙলার প্রাচীনতম রাজধানী পুন্ড্রনগরের ‘মহাস্থান’কে কেন্দ্রভূমিতে রেখে-মহামুনি গৌতম বুদ্ধের বাঙলায় আগমনকাল থেকে ১৯৭১-এর বাংলাদেশ কালব্যক্তির এ-নাট্য-আখ্যানে পুরো গল্পটাকে এক সাথে বলার চেষ্টা হয়েছে। বাঙ্গালা অঞ্চলের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পট ও তার পরিবর্তনের ইতিহাসের ‘জানা ও জনপ্রিয়’ গল্পপ্রবাহ এ-নাটকের অখ্যানভাগ।
এই নাট্য প্রযোজনা নির্মাণের অংশ হিসেবে গত ২৪ ফেব্রæয়ারি বগুড়ার মহাস্থানগড়ে ‘প্রতœ আর্ট ক্যাম্প ২০১৮’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১০ জন চিত্রশিল্পীর অংশগ্রহণে দিনব্যাপী মহাস্থানের ১০টি স্থানে এই আর্ট ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। আর্ট ক্যাম্পে শিল্পীরা মহাস্থানগড়ের বিভিন্ন স্থাপনার ক্যানভাস পেইন্টিং ও স্কেচ করেন।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ইতোপূর্বে নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এবং নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর স্থাপনা নিয়ে দুইটি প্রতœনাটক মঞ্চস্থ করেছে। গত ২০ এপ্রিল ২০১৪ নওগাঁস্থ পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে দেবাশীষ ঘোষের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছিলো দেশের প্রথম প্রতœনাটক ‘সোমপুর কথন’। নরসিংদী জেলার উয়ারী বটেশ্বর খননের মাধ্যমে যে আড়াই হাজার বছরের পুরনো প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন আবিষ্কার হয়েছে, সেই নিদর্শনকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে মঞ্চনাটক ‘উয়ারী-বটেশ্বর’। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় ৬ জুন ২০১৪ নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয়।