Home শীর্ষ কাহিনি প্রচ্ছদ মুখ বিদায় বন্ধু বিদায়

বিদায় বন্ধু বিদায়

SHARE
AB

রেজানুর রহমান

বিদেশে একটি গিটারের দোকানে ঢুকেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। দোকান ভর্তি গিটার আর গিটার। বাচ্চুর সাথে ছিলেন কয়েকজন সহশিল্পী। তারাও দোকানটিতে ঘুরে ফিরে গিটার দেখছিলেন। আবার কেউ কেউ বাচ্চুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কখন তার গিটার দেখা শেষ হয়Ñ এমনই অপেক্ষা…। কিন্তু বাচ্চু ততক্ষণে ঢুকে পড়েছেন তার গিটারের স্বপ্নময় জগতে। অনেক গিটারের মধ্যে একটি গিটার তার বেশ পছন্দ হলো। দোকানের সেলসম্যানকে ডাক দিলেন। গুরুত্বহীন ভঙ্গিতে বাচ্চুর সামনে এসে দাঁড়াল সেলস ম্যান। গিটারটির দিকে দৃষ্টি ফেলে বাচ্চু তার কাছে জানতে চাইলেন, এটার দাম কত? সেলসম্যান অনেকটা অবজ্ঞার চোখে বাচ্চুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, তুমি কোন দেশ থেকে এসেছ? বাচ্চু গর্বের সাথে বললেন, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাচ্চুর কথা শুনে সেলসম্যান চরম ঔদাসীন্যতা প্রকাশ করে বাচ্চুকে বলল, এই গিটার তোমার জন্য নয়। এর দাম অনেক। তুমি বরং অন্য গিটার দেখ।

বাচ্চুর মনের ভিতরে তখন অসম্মানের কষ্ট তড়পাচ্ছিল। বাচ্চুর দেশকে অপমান করেছে এই লোক। বিদ্রোহ দানা বেঁধেছে মনের ভেতর। তবুও অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে সেলসম্যানের কাছে একটা অনুরোধ করলো, ভাই আমি কি গিটারটা একটু দেখতে পারি? আমাদের সবার কাছে যা অর্থ দিয়ে তাই দিয়ে বোধকরি গিটারটা কেনা যাবে… গিটারটা একটু বাজাব… প্লিজ…

সেলসম্যান বিরক্তমুখে বাচ্চুকে গিটারটি বাজানোর অনুমতি দিল। আমাদের প্রিয় শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু গিটার হাতে নিয়েই প্রথমে মাথা নুয়ে সালাম করলেন। তারপর গিটারেও তারে সুরের ঝংকার তুললেন। হঠাৎই বদলে গেল পরিবেশ। কে বাজাচ্ছে এই সুর? সে কি হ্যামিলিনের সেই বাঁশিওয়ালা? আশে পাশের দোকান থেকে ক্রেতারা, দোকানের কর্মচারীরা, মার্কেটে আসা অন্য লোকেরা একে একে ভীড় করতে থাকলেন আইয়ুব বাচ্চুর সামনে। সবার চোখে-মুখে অপার বিস্ময়। কে বাজাচ্ছে গিটার? তাকে এক নজর দেখার জন্যই মানুষের ভীড় বাড়তেই থাকলো। এক সময় গিটার বাজানো থামালেন বাচ্চু। আনন্দময় করতালি দিল সবাই। দোকানের ওই সেলসম্যান যারপর নাই অবাক। জীবনে সে এভাবে এতো সুন্দর করে গিটার বাজাতে দেখেনি। এবার সে বিনীত হলো বাচ্চুর ওপর। বলল, এই গিটার তোমার… তোমাকে এর পুরো দাম দিতে হবে না। অর্ধেক দাম দিলেই চলবে…

এবার আইয়ুব বাচ্চু গিটারটি আর ছুঁয়েও দেখলেন না। সেলসম্যানকে বললেন, স্যরি, তুমি আমার দেশকে অপমান করেছ। তুমি যদি বিনে পয়সাও আমাকে গিটারটি দাও তবুও আমি নিব না। যে গিটারের জন্য আমার দেশ অপমানিত হয় ওটা আমার না…

এই হলেন আমাদের আইয়ুব বাচ্চু। যিনি দেশকে ভালোবেসে গানের জন্যই জীবনটা পার করে দিয়েছেন। মৃত্যুর দু’দিন আগেও রংপুরে হাজার হাজার শ্রোতার সামনে গান করেছেন। গানের মাধ্যমেই দেশকে ভালোবাসার মন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছেন। অনেক মায়ায় জড়িয়ে গানে গানেই জীবনকে তুলে ধরেছেন দেশ-বিদেশের লক্ষ কোটি শ্রোতার কাছে। গিটার ছিল তার জীবনসঙ্গী।

অনেকদিন আগের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পাশে ‘মল’ এলাকায় উন্মুক্ত মঞ্চে গান গাইবেন আইয়ুব বাচ্চু। মঞ্চের সামনে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী অপেক্ষা করছে। কখন আসবেন প্রিয় শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। মঞ্চে অপরিচিতি শিল্পীরা গান গাইছিলেন। সে জন্য কারও কোনো আগ্রহ নাই। হঠাৎ ঘোষনা এলো এবার মঞ্চে আসছেন আমাদের প্রিয় শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু… এবি মঞ্চে আসছেন…

মুহূর্তে পরিবেশ পাল্টে গেল। মনে হলো গোটা বাংলাদেশ যেন আনন্দে এক সাথে চিৎকার দিচ্ছে। এবি… এবি… এবি…

মঞ্চে উঠে এলেন কালো পোশাখে ক্যাপ মাথায় সবার প্রিয় আইয়ুব বাচ্চু। শুধু হাত নাড়লেন শ্রোতাদের উদ্দেশে। আবারও মূর্হু মূর্হু করতালি আর হর্ষধ্বনি। তারপর গোটা এলাকা নিশ্চুপ। বাচ্চু বললেন, চলো আমরা দেশের জন্য একবার দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাই। যেন জাদুকরের মন্ত্র ছুঁয়ে গেল গোটা এলাকায়। দাঁড়িয়ে গেল হাজার হাজার শ্রোতা। বাচ্চু তাদের সাথে সুর তুললেনÑ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…

তরুণদের খুব ভালোবাসতেন আইয়ুব বাচ্চু। বলতেন, ওরাইতো দেশের সম্পদ। ওদেরকে ঠিক মতো গড়ে তুলতে না পারলে তো দেশ এগুবে না। সে কারণে মঞ্চে গান গাইতে উঠলেই তরুণদেরকে নানা ধরনের পরামর্শ দিতেন। দেশের তরুণ-তরুণীরাও তাকে অনেক আপন করে নিয়েছিল। বাচ্চু ছিল তাদের কাছে আইডল। প্রেরণার উৎস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত শ্রোতা বাচ্চুকে নিয়ে স্মৃতির কথা লিখেছেন। তাদেরই কয়েকজনের বক্তব্য তুলে ধরছি। সৌমেন রায় নামে একজন ভক্ত লিখেছেন, ছোটো বেলায় যখন সবেমাত্র জিন্স প্যান্ট পড়তে শুরু করেছি। ঠোঁটের ওপর গোফ গজাতে শুরু করেছে, হাতের কবজিতে ব্রেসলেট পড়া শুরু করবো কি করবো না ভাবছি, মাথায় ক্যাপ পড়া শুরু করে দিবোÑ কাকে দেখে জানেন? ব্যান্ড সঙ্গীতের জনপ্রিয় গায়ক এলআরবির আইয়ুব বাচ্চুকে দেখে।

Ayub-baccuআমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি-সুরেলা ময় এই বাক্যটিই আমাদের প্রজন্মকে গানের নতুন এক ধারার সাথে পরিচয় করে দিয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তার গানগুলো চলে এসেছে। চলো বদলে যাই, গানটি তিনি ১৯৯৩ সালের কোনো এক বৃষ্টি¯œাত দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় নিয়ে লিখেছেন। এক লাইন লেখেন আর গিটারে সুর তোলেন। এভাবে তিনি কমপ্লিট করেছিলেন গানটি। তারপর দুদিনের আয়োজনে সুর দিলেন। ব্যস হয়ে গেল এক ইতিহাস। একাই ইতিহাস গড়লেন। সেই গান আমরা ৩৫ টাকার ক্যাসেটে কিনে স্টেরিওতে শুনেছি। তারপর ডিস্ক, এমপিথ্রির যুগ পার হয়ে এখন ইউটিউব এর যুগ। গানটির আবেদন কি বিন্দুমাত্র কমেছে? কনসার্ট হলেই ‘বদলে যাই’ গানের রিকোয়েস্ট, সেটা যেই শিল্পীই হোক, ব্যান্ডের গান গাইতে পারলেই হলো।

আরেকজন ভক্ত লিখেছেন, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। সিনিয়র ব্যাচের র‌্যাগের কনসার্টে আসলেন বাচ্চু ভাই। সেই প্রথম দেখা। সুরের মূর্চ্ছনায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। হাসতে দেখ, গাইতে দেখ… সবাই বাচ্চু ভাইয়ের সাথে ছবি তুলছিলো। ব্যক্তিগত কাজে একটু আগে ভাগেই ঢাকায় চলে যাওয়ায় মিস করেছিলাম সেই সুযোগ। কিন্তু মনের ফ্রেমে ঠিকই গেঁথে রাখলাম এবিকে। ৪ বছর পর তখন ফরিদপুরের এনডিসি আমি। রাত ২টার মতো বাজে। মোবাইলের রিংটোনে ঘুম ভাঙ্গলো। অন্য জেলার সহকর্মীর ফোন। একটু কষ্ট দেই। আমার জেলায় বাচ্চু ভাইয়ের প্রোগ্রাম ছিল। তিনি রওয়না দিয়েছেন। ফরিদপুরের কাছাকাছি। তোমাদের সার্কিট হাউসে… মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, সার্কিট হাউস রেডি। আধাঘণ্টা পরে পৌঁছালেন বাচ্চু ভাই। সাথে এলআরবি’র সবাই। প্রিয় শিল্পীকে কাছে পাবার আনন্দই ছিল আলাদা… রাত ৩টায় এক সাথে খেলাম সাবই, পরাটা, ডিম, সবজি… খাওয়ার সাথে আড্ডা চললো পুরো দমে। সত্যি এ এক মহান স্মৃতি আমার জীবনে।

সুলতানা আহমেদ নামে একজন লিখেছেন, বলা যায় শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর প্রেমে পড়েছিলাম আমি। তাকে কখনও সে কথা বলা হয়নি। আজ বলছি। আইয়ুব বাচ্চুর ‘চলো বদলে যাই’ গানটা শুনেই তার প্রেমে পড়ে যাই। তারপর থেকে তার প্রতিটি গান আমার সংগ্রহে এসে যায়। তার গান শুনি আর নিজেকে দুঃখ কষ্টের মাঝেও তৈরি করি। গান যে মানুষকে কতটা বদলে দিতে পারে তার প্রমাণ আইয়ুব বাচ্চুর গান। আজ আইয়ুব বাচ্চু নেই। সীমাহীন শূন্যতা গ্রাস করেছে আমাকে। চলো বদলে যাই গানটা এর মধ্যে বোধকরি হাজার বার শুনেছি। কেন শুনছি জানিনা…

এরকম আরও কতো শতো প্রতিক্রিয়ায় ভরা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সেখানে তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশী।

তারুণ্যকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন আইয়ুব বাচ্চু। নিজের সঙ্গীত জীবনের শুরুটা খুব যে খুব একটা মমৃণ ছিল তা তো নয়। চট্টগ্রামে বিয়ের আসরেও গান গেয়েছেন। খোলা ট্রাকে বাদ্যযন্ত্রের সাথে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন জায়গায় গান করতে গেছেন। সম্মানী তো দূরের কথা অনেক ক্ষেত্রে খাওয়াও পেতেন না। ঢাকায় এসেছিলেন প্রায় খালি হাতে। কিন্তু স্বপ্ন ছিল একদিন গানের জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। সেটা করতে পেরেছেন তিনি। তাই তরুণদের গানের শুরুর জীবনের প্রতি তার ছিল অনেক যতœ। চ্যানেল আই-এর সহায়তায় ব্যান্ড সঙ্গীতকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াসে শুরু করেছিলেন ‘ব্যান্ডফেস্ট’ এর নতুন আন্দোলন। বছরের প্রতি ডিসেম্বরে যা চ্যানেল আই প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়। ডেকে ডেকে তরুণ শিল্পীদের গান গাওয়ার সুযোগ করে দিতেন। শিল্পী আসিফ আকবরের কথায় তারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। আসিফ আকবর তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, বাচ্চু ভাইয়ের এবি কিচেন ছিল তরুণ আর অখ্যাত শিল্পীদের দরগাহ। স্টুডিতে একটা কনফারেন্স টেবিলের মতো ছিল। উনাকে ঘিরে কোনা কাঞ্চিতেও অবস্থান নিয়ে বসতো মজমা। তিনি সবার খবর নিতেন। সবাইকে উৎসাহ দিতেন আর রসিকতা করে পরিবেশটা জমিয়ে রাখতেন। আমি রূপম, আরিফ, স্টিলার ব্যান্ডের জিয়া, লিটন সহ প্রচুর পোলাপান বসে থাকতাম উনার সামনে। উনি সবাইকে ভালোবাসতেন।

হ্যা, আইয়ুব বাচ্চু ভালোবাসতেন সবাইকে। সহ শিল্পীদেরকে তো বটেই। তাঁর ভক্তদেরকেও প্রচুর ভালোবাসতেন। মানুষ মানুষের জন্য এই মানবিক বোধ তাকে সর্বদাই তাড়িত করতো। গোপনে অনেককেই আর্থিক ভাবে সহযোগিতা করেছেন। সে কথা কাউকে বলেননি। তিনি ছিলেন পুরো দস্তুর একজন শিল্পী। গান আর গিটার নিয়েই ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান। জীবদ্দশায় গিটার নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। চেয়েছিলেন গিটারগুলো কোথাও যতেœ সংরক্ষিত হোক। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন পুরণ হয়নি। দেশ প্রেমিক এই শিল্পী তার গানের মাধ্যমে দেশকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। শিল্পী বেঁচে নেই। না ফেরার দেশে চলে গেছেন। বিদায় বন্ধু বিদায়… একথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এটাই অমোঘ সত্য। জন্মের পর মৃত্যু অবধারিত। আমরা যেন প্রিয় শিল্পীকে মনে রাখি। তাকে যেন ভুলে না যাই।