Home আরোও বিভাগ নীলুফার ফারুকের ইকেবানা

নীলুফার ফারুকের ইকেবানা

SHARE
Iqabana

ইকেবানা শব্দটি চোখের সামনে ভাসলেই ফুল আর ফুল সাজানো মঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাপানে ইকেবানা সংস্কৃতি বেশ জনপ্রিয়। জাপানে ইকেবানার অসংখ্য স্কুল আছে। আমাদের বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকায় ইকেবানা নিয়ে দীর্ঘ বছর ধরে কাজ করছেন দেশের বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা-নীলুুফার ফারুক। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানসহ বিয়ের মঞ্চে ফুলের ব্যবহারের ক্ষেত্রে নান্দনিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে চলেছেন তিনি। ফুলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গাছপালার ব্যবহার করেও বিয়ের মঞ্চকে অনেক আকর্ষণীয় করে তোলা যায় এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে নীলুফার ফারুকের প্রতিষ্ঠান- ইকেবানার ক্ষেত্রে আনন্দ আলোর ঈদ সংখ্যায় এব্যাপারে কথা বলেছেন তিনি।
আনন্দ আলো: ইকেবানার সাথে আপনি যুক্ত হলেন কীভাবে?
নীলুফার ফারুক: ১৯৯২ সালে আমি ইকেবানার সাথে যুক্ত হই। একটা শিল্পী পরিবারে আমার জন্ম। গাছপালাসহ যে কোনো শৈল্পিক জিনিস আমাকে আকৃষ্ট করতো। আমি যখন ছোট, স্কুলের ছাত্রী তখন ইকেবানার ক্যালেন্ডার আমার চোখে পড়ে। ক্যালেন্ডারটি আমার মনের ভেতরে দারুণ নাড়া দেয়। মতি মামা(বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোস্তফা মনোয়ার) তখনকার দিনে পাকিস্তান টিভিতে কাজ করতেন। ট্রেনিং-এর জন্য জাপানে যান। ফেরার সময় উনি সবার জন্য কিছু না কিছু এনেছিলেন। আমার জন্য এনেছিলেন ইকেবানার একটা বই। বাসার মধ্যে বিভিন্ন ক্যালেন্ডারের ছবি দেখে আমি বেশ আঁকাআঁকি করতাম। ফুল সাজাতাম। মতি মামার সেটা চোখে পড়েছিল। তাই তিনি আমার জন্য এই বই আনেন। ইকেবানার জন্য একটা স্পেশাল কাচি লাগে। তিনি সঙ্গে করে সেটাও এনেছিলেন। বইটি হাতে পাবার পর আমি নিজে নিজেই ইকেবানার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠলাম।
আনন্দ আলো: এ ব্যাপারে কোনো প্রশিক্ষণ?
নীলুফার ফারুক: ১৯৯৩ সালে জাপান দূতাবাস থেকে ইকেবানা শেখার একটা কোর্স চালু করা হয়। আমি ওই কোর্সে যোগদান করি। তখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ছোট দুটো বাচ্চা। একটা থ্রিতে একটা ফোরে। মতি মামা জাপান থেকে যে বইটা এনেছিলেন তা পড়ে পড়ে আমি ইকেবানা সম্পর্কে বেশ জ্ঞান আহরণ করেছি। ফলে ওই কোর্সে অনেক কিছুই আমার কাছে সহজ হয়ে উঠেছিল। জাপানি এক মহিলা কোর্স শিক্ষক ছিলেন। তিনি কিছু বলার আগেই আমি তা ধরে ফেললাম। ছবি আঁকতাম। একদিনের ঘটনা। কোর্সের ক্লাস চলছে। হঠাৎ আমাদের ওই প্রশিক্ষক মহিলা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার আঁকাআঁকি দেখে অবাক হয়ে যান এবং বলেন, তুমি তো অনেক এডভান্সড। কীভাবে শিখলে? আমি তখন তাকে সবকিছু খুলে বলি। আমাদের প্রশিক্ষক জাপানী মহিলা যেহেতু ভালো করে বাংলা বলতে পারতেন না। কাজেই তিনি আমাকে তার সাথে সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দিলেন। বললেন, এক কাজ করো। তুমি আমাকে এসিস্ট করো… ব্যস, আমি ইকেবানা শিখতে এসে যিনি শেখাবেন তারই সহযোগী হয়ে গেলাম। কাজেই বিষয়টার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। কোর্সটি ভালো ভাবে শেষ হলো। এবার ওই জাপানী মহিলা তার বাসায় আরও বড় পরিসরে নতুন ভাবে একটি স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন। অনেকেই সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এক পর্যায়ে আমিও ওই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলাম। কৃতজ্ঞতার সাথে বলতে হয় ওই জাপানী মহিলার আন্তরিক সহযোগিতায় আমি জাপানে ইকেবানার ওপর একাধিক কোর্স করার সুযোগ পাই। এ ব্যাপারে একাধিক সার্টিফিকেটও অর্জন করি।
আনন্দ আলো: পেশা হিসেবে নিলেন কখন?
nilofer-farukনীলুফার ফারুক: শুরুর বিষয়টা কিন্তু শুধুমাত্র শখের পর্যায়ে ছিল। আমি ভালো গান করতাম, নাচতামও। ভালো কিছু, সৃজনশীল সবকিছুর প্রতি আমার অনেক ঝোঁক ছিল। সে কারণে ইকেবানার প্রতি আকৃষ্ট হই।
আনন্দ আলো: আপনার এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হলো কীভাবে?
নীলুফার ফারুক: ১৯৯৯ সালে এর যাত্রা শুরু হয়। আমি প্রায় দশ বছর ইকেবানার টিচার ছিলাম। আমার খুব ইচ্ছে হতো মেয়েরা কিছু করুক। আমার জাপানী শিক্ষকের সাথে সব সময়ই যোগাযোগ ছিল। একদিন তাকে বললাম, আপা আসেন আমরা কিছু একটা করি… যাতে কিছু আর্থিক উন্নতি করা যায়। আমরা ছোট পরিসরে একটা প্রতিষ্ঠান খুললাম। হঠাৎ শুনলাম সার্ক সামিট হবে ঢাকায়। ভাগ্যগুণে আমরা এই সামিটে অতিথিদের রুমে ফুল সাজানোর দায়িত্ব পেলাম। তখনকার দিনে শেরাটন হোটেলের জিএম আমাদেরকে বেশ সহায়তা করেছেন। তিনি ছিলেন পুরো অনুষ্ঠানের ফুল সাজানোর মূল দায়িত্বে। তাকে বললাম, কাজটিতে আপনাকে আমরা সহযোগিতা করতে চাই। তিনি ভেবে নিয়ে বললেন, তোমরা যদি কাজটি করতে পারো তাহলে তো ভালোই হয়। আমাদেরকে আর বিদেশের সহযোগিতা নিতে হবে না। সার্ক সামিটে ফুল সাজানোর কাজটি আমরা ভালো ভাবেই সম্পূর্ণ করলাম। ব্যস আর পিছনে ঘুরে দাঁড়াতে হয়নি। সার্ক সামিটে ফুল সাজানোর অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক সাহসী করে তুলেছিল। কারণ এই কাজে প্রচÐ পরিশ্রম করতে হয়েছে। সরকারী প্রটোকল মেনে কখনও গণভবন কখনও বঙ্গভবনে যেতে হয়েছে। খুব দৌড়ের ওপর ছিলাম।
এরফলে ঘটনাটা এমন দাঁড়ালো যে যখনই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো অনুষ্ঠান হতো মঞ্চসহ হোটেল রুমেও ফুল সাজানোর জন্য আমাদের ডাক পড়তো। ইয়াসির আরাফাত, নেলসন ম্যান্ডেলাসহ বাংলাদেশে আসা বিশ্বের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির রুমে আমরা ফুল সাজিয়েছি। দ্বিতীয় সার্ক সামিটেও আমরা ফুল সাজানোর দায়িত্ব পালন করি। সার্ক গেমসের সময় স্টেডিয়াম সাজানোর ক্ষেত্রেও ফুলের ব্যবহার দেখিয়েছি।
এক পর্যায়ে বিয়েতে ফুল সাজানোর কাজ শুরু করলাম। তখনকার দিনে কোনো কম্পিউটার ছিল। ইন্টারনেট ছিল না। নিজে নিজে মঞ্চের ছবি আঁকতাম। সেই অনুযায়ী ফুল দিয়ে মঞ্চ সাজানোর নানা পরিকল্পনা সাজাতাম। সমস্ত কিছু নিজের মাথা থেকে বের করি। এখনকার দিনে তো ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। ছবি দেখে কিছু আঁকা আর নিজের মন থেকে কিছু আঁকার মধ্যে অনেক তফাত আছে। আমি এখনও বিয়ের মঞ্চ সজ্জা নিজের মতো করে আঁকি। দেশীয় প্রডাক্ট ব্যবহার করতে পছন্দ করি। বাংলাদেশে বিয়ের মঞ্চে ফুল সাজানোর কাজটা কিন্তু আমরাই প্রথম শুরু করি।

আনন্দ আলো: আপনার কথায় যা বোঝা গেল তাতে তো আমরা ধরেই নিতে পারি ইকেবানার মাধ্যমে দেশে নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব?
Iqabana-1নীলুফার ফারুক: অবশ্যই। এটি একটি সৃজনশীল পেশা। এর সাথে যুক্ত হয়ে শুধু নারীরাই নয়, পুরুষরাও কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিতে পারেন।
কথায় কথায় দেশের ফুলের চাষের ওপর জোর দিলেন নীলুুফার। তিনি বলেন, আমরা সাধারণত যে ফুল দিয়ে মঞ্চ সাজাই তা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ বাংলদেশে এই ফুল উৎপাদন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। বিয়ের মঞ্চ সাজানোর ক্ষেত্রে গাছপালার লতা পাতাকেও গুরুত্ব দিয়ে চলেছেন নীলুুফার ফারুক। প্রাকৃতিক পরিবেশে বিয়ের মঞ্চ সাজানোর ক্ষেত্রে তার বেশ খ্যাতি রয়েছে।
প্রিয় পাঠক, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মঞ্চে ফুলের সাজ সজ্জা ও বিয়ের মঞ্চ সাজাতে অনয়াসেই নির্ভর করতে পারেন নীলুফার ফারুকের প্রতিষ্ঠান ইকেবানার প্রতি। সকল যোগাযোগ: ইকেবানা, রোড নং: ২০, বাড়ি: ৩১, ফ্ল্যাট: ৩/বি, বনানী, ঢাকা।