Home শীর্ষ কাহিনি প্রচ্ছদ মুখ তিন কন্যায় জমলো মেলা

তিন কন্যায় জমলো মেলা

SHARE
Tin-Konna

রূপালী পর্দার তিন তারকা কন্যা। ভারতের ঋতুপর্না ঘোষ আর আমাদের বাংলাদেশের বিদ্যা সিনহা মীম এবং আফসানা মিমি এক সাথে আড্ডা দিলেন অতি সম্প্রতি। সূত্রধর হিসেবে কাজ করেছেন আফসানা মিমি। আর আড্ডায় স্মৃতির ঝাপি খুলে ধরেছেন ঋতুপর্ণা ও বিদ্যা সিনহা মিম। তিন কন্যার জমজমাট আড্ডার কিছু অংশ পাঠকদের জন্য… লিখেছেন রেজানুর রহমান
আফসানা মিমি: আমাদের অনুষ্ঠানের নাম তিন কন্যার আড্ডা। আমাদের অতিথি কন্যা ঋতুপর্না। তাকে আমি অবশ্য অতিথি কন্যা বলতে চাই না। তিনি আমাদের অনেক কাছের মানুষ… সাথে আছেন বিদ্যা সিনহা মীম। আমাদের অতি আদরের পর্দা কন্যা। কেমন আছো ঋতু?
ঋতুপর্না ঘোষ: খুউব ভালো আছি। তোমাকে অনেক দিন পর দেখলাম।
আফসানা মিমি: হ্যা, অনেকদিন পর তোমার সাথে দেখা হলো। বেশ আনন্দ হচ্ছে। তোমার সাথে আজ অনেক কথা বলব। আর একটা না বললেই নয়, মীমকে যখন কাছে পেয়েই গেছি তখন আমাদের আড্ডাটা বেশ ভালই জমবে আশা করি…
ঋতুপর্না ঘোষ: (হাসতে হাসতে) এই অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হচ্ছে তিন কন্যার আড্ডা। নামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এই নামে একটা ছবিতে আমি অভিনয় করেছি। তাই বেশ ভালো লাগছে। আমার এই ছবিটি বেশ নাম করেছিল। আমার অভিনয় জীবনের একটি আলোচিত ছবি বলা যায়। ‘দহন’ নামে একটি নতুন ছবিতে আমি অভিনয় করেছি। ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। সূচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্প অবলম্বনে ‘গহীন হৃদয়’ নামে আমার একটি নতুন ছবি কলকাতায় রিলিজ হয়েছে। দহনও সুচিত্রা দি’র লেখা। ‘দহন’ আমার অনেক প্রিয় একটা সিনেমা। সূচিত্রা দি’র সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অনেক দিনের। আমরা দু’জন অনেক স্বপ্ন বুনেছি। তিনি আজ বেঁচে নেই। কিন্তু আমি মনে করি তিনি আমার চারপাশেই আছেন…
প্রসঙ্গক্রমে ‘ইচ্ছে’ নামে একটি ছবির কথা বলি। যে ছবিতে অভিনয় করে আমি খুব তৃপ্তি পেয়েছি। মা ও সন্তানের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে ছবিটা নির্মিত হয়েছে। অসাধারন একটা ছবি। মা ও ছেলের অদ্ভুত একটা মায়াময় ক্যামিস্ট্রি ফুটে উঠেছে ওই ছবিতে। বাচ্চাকে আঁকড়ে ধরে মায়ের বেড়ে ওঠা… ছেলে বড় হয়ে যাবার পর মায়ের যে তিতিক্ষাটা থাকে সেটা… সব মিলিয়ে মা ও ছেলের মাঝে একটা ক্রাইসিস তৈরি হয়। অভিনয় করে খুব আনন্দ পেয়েছি। সূচিত্রা দি’র কাছের মানুষ নিয়েও আমি কাজ করেছি…
আফসানা মিমি: তুমি কি জানো সূচিত্রা দি’র ‘কাছের মানুষ’ নিয়ে আমিও এখানে একটা সিলিয়াল বানিয়েছি…
ঋতুপর্না ঘোষ: ও, তাই নাকি…?
আফসানা মিমি: এনিয়ে আমার অনেক স্মৃতি আছে…
ঋতুপর্না ঘোষ: তুমি তো টেলিভিশনের স¤্রাজ্ঞী…
আফসানা মিমি: ওহ মাই গড! কী বলো তুমি! এভাবে বলো না। বড় জোর টেলিভিশন কর্মী বলতে পারো।
ঋতুপর্না ঘোষ: বাংলাদেশের টেলিভিশন এক সময় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল। ছোটবেলায় মনে আছে, বুস্টার লাগিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখা হতো কলকাতায়। হৈচৈ করে আমরা বাংলাদেশের টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখতাম। সত্যি এ এক গৌরবময় অনন্য ঘটনা। ভাবো একবার, অন্যদেশের টেলিভিশন অনুষ্ঠান… আমি অবশ্য বাংলাদেশকে অন্যদেশ ভাবি না। এটাতো আমার নিজের দেশও। আমাদের ভাষা এক। সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকের অনেক অভিনেতা, অভিনেত্রীর অভিনয় মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। তাদের অভিনয় আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করতো… বড় বেলায় এসে তাদের অনেকের সাথে বাংলাদেশের ছবিতে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। এসব ভাবলে বেশ আনন্দ পাই। ফরীদি ভাইয়ের কথা মনে পড়ে…
আফসানা মিমি: ফরীদি ভাইয়ের সাথে তুমি যে সিনেমাটি করেছিলে তার নাম মনে আছে…? রাঙা বউ… ওই ছবিতে তোমার ক্যারেকটারের জন্য আমি ডাবিং এ অংশ নিয়েছিলাম…
ঋতুপর্না ঘোষ: হ্যা অবশ্যই মনে আছে। রাঙা বউ। সত্যি নাকি? তুমি আমার ক্যারেক্টারের জন্য ডাবিং করেছ? অসাধারন হয়েছে?
আফসানা মিমি: (মীমকে উদ্দেশ্য করে) কেমন লাগছে এসব গল্প শুনতে?
বিদ্যা সিনহা মীম: মৃদু হেসে অনেক ভালো লাগছে। সব চেয়ে বেশী ভালো লাগছে আমি দু’জন গুণী শিল্পীর পাশে বসে আড্ডা দিতে পারছি।
আফসানা মিমি: তুমিও অনেক গুণী…
বিদ্যা সিনহা মীম: অনেক কিছুই আমি জানিনা। এখন জানতে পারছি। এজন্য বশ ভালো লাগছে…
ঋতুপর্না ঘোষ: আমার মনে হয় যে মীমের ইতিহাস গুলো জানা উচিৎ।
বিদ্যা সীনহা মীম: হ্যা, অবশ্যই…
ঋতুপর্না ঘোষ: (হাসতে হাসতে) এভাবে ইতিহাস জানলে ও নিজেকে অনেক আপডেট রাখতে পারবে।
বিদ্যা সিনহা মীম: সত্যি তাই। এ ধরনের আড্ডা তো সাধারনত হয় না। আমার খুব ভালো লাগছে।
আফসানা মিমি: (মীমকে উদ্দেশ্য করে) ঋতুর সিনেমা দেখো তো?
বিদ্যা সিনহা মীম: অবশ্যই। ছোটবেলা থেকেই তো ওনাকে সিনেমায় দেখে আসছি। আমার মা বুম্বা দা অর্থাৎ প্রসেনজিৎ এবং ঋতুপর্নার ছবির খুব ভক্ত। সে কারণে আমিও তাদের ভক্ত হয়ে যাই। টেলিভিশনে মা ওদের সিনেমা দেখতেন। আমিও দেখতে বসে যেতাম। ওদের দু’জনের অনেক ছবি আমি দেখেছি। বড় হয়ে আমি নিজের প্রয়োজনেও ঋতু দি’র অনেক ছবি দেখতে শুরু করি। শেখার জন্য… শেষ ছবি দেখেছি ‘রাজকাহিনী’। ঋতু দি’কে সে কথা বলেছি। ছবিটা খুব ভালো লেগেছে।
Tin-Konna-1আফসানা মিমি: (ঋতুপর্নার উদ্দেশে) গত কয়েক বছরে তুমি অনেক গুলো ভালো ছবিতে অভিনয় করেছ?
ঋতুপর্না ঘোষ: হ্যা, আমারও তাই মনে হয়। আসল কথা কি জানো? আমি আসলো চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি। যখন থেকে সিনেমায় আমি আমার ক্যারিয়ার শুরু করি তখন থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই। নিজের সাথে নিজের চ্যালেঞ্জ। কিভাবে আরও ভালো করা যায় তার চ্যালেঞ্জ। তবে সত্যি কথা, যখন ক্যারিয়ার শুরু করি তখন অনেক কিছুই জানতাম না। বুঝতামও না। ডিরেক্টররা যা বলতো তাই করতাম। এখন তো হিরোইনরা আগে স্ক্রীপ্ট দেখে তারপর অভিনয় করবে কিনা সিদ্ধান্ত নেয়। আমার সময় একটা মেকআপ ভ্যানও ছিল না। পরিচালক স্বপনদা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। বাংলাদেশে এক সময় তিনি কাজ করতেন। মনে আছে একদিন শুটিং করছি। স্বপনদা হঠাৎ হয়তো এসে বললেন। ঋতু তুমি আরেকটা শাড়ী পইর‌্যা আসো… আমি বললাম- ঠিক আছে পরে। আসতেছি… মজার ব্যাপারকি ওটা ছিল অন্য ছবির জন্য। আমি কিছুই বুঝতাম না। এক ছবির শুটিং করতে গিয়ে দুই ছবিতে অভিনয়। হা: হা: হা: এমন দিনও গেছে আমার… এখন কি কোনো আর্টিস্ট এটা মানবে? অবশ্যই না। আমাদের কাছে ডিরেক্টর হলো অনেকটা ভগবানের মতো…
আফসানা মিমি: পরিচালকরাও সেভাবে মর্যাদা রাখতেন… এই যে তুমি বলছ ডিরেকটররা আমার কাছে ভগবানের মতো… তার মানে ডিরেক্টরদের কাছেই তো আমরা কিছু না কিছু শিখি…
ঋতুপর্না ঘোষ: অবশ্যই তাই। ডিরেক্টর মানেই আমার কাছে অনেক বড় কিছু। তিনিই ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ। ওটাই আমরা ফলো করতাম। তবে সময় বদলেছে। পরিচালকরাও বদলেছেন। তার সাথে আমরাও বদলেছি। কিন্তু বেসিক সম্মানের জায়গাটা কিন্তু ঠিকই আছে। ডিরেক্টর মানে তো… ডিরেক্টরই…
আফসানা মিমি: আমাদের এই উপমহাদেশের চিত্রটা একই রকম। একজনের পরম্পরা দিয়েই তো আমরা হাঁটি। আমরা যাদের অভিনয় দেখে উদ্বুুদ্ধ হয়েছি তারাও নিশ্চয়ই কারও না কারও অভিনয় দেখে প্রেরণা পেয়েছেন। এটাই পরম্পরা।
ঋতুপর্না ঘোষ: আমার ধারণা কিছু কিছু ব্যাপার রয়েই যায়। যে গুলো বোধহয় কোনো কালেই বদলায় না।
আফসানা মিমি: ভারত বর্ষের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন। কাদেরকে তোমার আইডল মনে হয়। কারা তোমাকে অনুপ্রাণিত করে?
ঋতুপর্না ঘোষ: অনেকেই আছেন। আসলে সেভাবে আলাদা করে বলা যাবে না। ভারত বিশাল একটা দেশ। অনেক ভাষার সিনেমা হয়। আমি নিজে ৮টি ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি।
আফসানা মিমি: আমি জানি সেটা…
বিদ্যা সিনহা মীম: ঋতু দি। তুমি যখন অন্যভাষার ছবিতে অভিনয় করো তখন সংলাপ দাও কি ভাবে?
ঋতুপর্না ঘোষ: এজন্য একটা প্রস্তুতি থাকে। প্রস্তুতি থাকলে সব করা সম্ভব।
আফসানা মিমি: জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকাটা তোমার ক্ষেত্রে অনেক বড়…
ঋতুপর্না ঘোষ: আমি নিজে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার একবার পেয়েছি। কিন্তু আমার অনেক ছবি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে।
আফসানা মিমি: এই যে তুমি আবার বাংলাদেশে ছবি করতে এসেছ, কেমন লাগছে?
Ritu-porna-Goshঋতুপর্না ঘোষ: ভীষণ ভালো লাগছে। সত্যি বলব? বাংলাদেশ আমার এত প্রিয় একটা জায়গা যে… সবার ভালোবাসাটা আমাকে ব্যাপক উৎসাহ দেয়। আমি খুব মিস করি এখানকার প্রিয় মানুষদের। আমি বার-বার এখানে আসতে চাই…
আফসানা মিমি: এই যে তোমাদের ছবি আমাদের এখানে সেভাবে রিলিজ হয় না। আমাদের ছবি তোমাদের ওখানে যায় না। এসব মিস করো না?
ঋতুপর্না ঘোষ: এসব কথাই একটু আগে আলাপ করছিলাম। আমরা কেন আমাদের ছবির পুরো মাকের্টটাকে আরও বড় করতে পারছিনা। সমস্যা কোথায়? আমার মনে হয় দু’ দেশের মধ্যে যে ব্যবধান গুলো আছে আন্তরিকতার সাথে তা যদি কমিয়ে আনার চেষ্টা করি তাহলে তো সবারই লাভ…
বিদ্যা সিনহা মীম: আমিও সেটাই ভাবি। দুই পক্ষের আন্তরিক চেষ্টা থাকলে আমাদের বাংলা ছবির বাজার আরও বড় হতে পারে।
আফসানা মিমি: (ঋতুপর্নার উদ্দেশে) তোমার তো একটা প্রোডাকশন হাউস আছে। এব্যাপারে কিছু বলো?
ঋতুপর্না ঘোষ: ছবির গল্পটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আর আমরা নতুন প্রতিভাবান পরিচালকদের উৎসাহ দিতে আগ্রহী। সেভাবেই কাজ হয়।
আফসানা মিমি: মীম তোমার কথা বল। কেমন লাগছে?
বিদ্যা সিনহা মীম: আমার তো বেশ ভালো লাগছে।
আফসানা মিমি: (ঋতুপর্নার দৃষ্টি আকর্ষণ করে) আমাদের মীম, লাক্স তারকা। ওর মাথায় সেরার মুকুট উঠেছিল… সেটা একটা দারুন মুহূর্ত ছিল তাই না মীম?
বিদ্যা সিনহা মীম: হ্যা সেটা একটা দারুন মুহূর্ত ছিল আমার জন্য। ২০০৭ সাল। ক্লাস টেনে পড়তাম। আমার মা যখন লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার-এ ছবি পাঠাচ্ছে তখন মাকে বলেছিলাম এখন এসব পারব না। পড়াশুনা আছে। আরেকটু বড় হই… মা তখন আমাকে অনেকটা ব্যঙ্গ করেই বলেছিলেন, তোমার কি মনে হয় ছবি পাঠালেই তুমি উইনার হয়ে যাবে? মায়ের কথা শুনে আমার খুব মন খারাপ হয়ে যায়। অনিচ্ছা সত্বেও মাকে সম্মতি জানিয়ে দেই। ঠিক আছে ছবি পাঠাও… ছবি পাঠানোর পর ফাইনালি যখন ডাক আসে আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম। আনন্দে যেন কথাই বলতে পারছিলাম না। অডিশন দিতে গিয়ে আমি রীতিমত ভরকে যাই। হাজার হাজার মেয়ে… আমি ভয় পেয়ে যাই। না, আমাকে দিয়ে হবে না। এতো মেয়ের মধ্যে সেরা হওয়া চাট্টি খানি কথা নয়। আমি বোধহয় পারব না। এক পর্যায়ে ২০০ জনের মধ্যে টিকে যাই। তখনও কনফিডেন্ট ছিলাম না। তবে টপটেন-এ যাবার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। অভিনয় জানতাম না। সেটা লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার গ্রæমিং থেকে শিখেছি। এই যে আজকে আমি মীম হয়েছি এর পেছনে লাক্স ও চ্যানেল আই-এর অবদান অনেক। লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার-এর মুকুট পরার মুহূর্তটাই আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত। বুড়ো বয়সেও কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করে তাহলেও একথাই বলব। লাক্স তারকা হবার পর হুমায়ূন আহমেদ স্যারের ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পাই। এটাও আমার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট।
এভাবে আড্ডা চলতেই থাকে। প্রিয় পাঠক, চমৎকার এই আড্ডার পুরো অংশ প্রচার হবে চ্যানেল আইতে ঈদের অনুষ্ঠানমালায়। কাজেই আমরা আর এগুলাম না।
তিনকন্যার উদ্দেশে আনন্দ আলোর ভালোবাসা ছড়িয়ে দিলাম।
তার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা।