Home আরোও বিভাগ ক্রীড়া বিনোদন তবুও ফুটবলই ভালোবাসা!

তবুও ফুটবলই ভালোবাসা!

SHARE
Football

রেজানুর রহমান
খেলায় হারজিৎ থাকে। কেউ হারে কেউ জিতে। কিন্তু কেউ যদি নিজের ভুলে হেরে যায় সেটাতো মেনে নেওয়া যায় না। ফুটবল এই খেলাটি নিয়ে আমাদের অনেক হতাশা। এখন আর কেউ ফুটবল খেলা দেখতে চায় না। ক্রিকেটের জোয়ারে ফুটবল যেন গুরুত্বহীন হয়ে গেছে দেশের মানুষের কাছে। যারা এসব কথা ভাবেন তারা ভুল করেন। ফুটবল থেকে দর্শকের আগ্রহ এতটুকু কমেনি সেটাতো প্রমাণ করলো এবারের সাফ টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশ বনাম নেপালের শেষ খেলার দিন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে তিল ধারনের ঠাঁই ছিল না। গ্যালারীতে ঢোকার টিকেট না পেয়ে অনেকে ফিরেও গেছেন। এতো দর্শক কেন গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে? সহজ উত্তর বাংলাদেশের ফুটবলকে উৎসাহ জোগাতে। একটা সহজ সমীকরণ ছিল বাংলাদেশের জন্য। ভুটান, পাকিস্তানকে হারিয়ে ৬ পয়েন্ট অর্জন করেছিল বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। আর নেপালের পয়েন্ট ছিল ৩। অর্থাৎ বাংলাদেশ যদি এই খেলায় ড্রও করতো তাহলেই গ্রæপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠে যেতো সাফ এর সেমিফাইনালে। অথচ আশার গুড়ে বালি। ড্র’ করাতো দূরের কথা দুই গোলের হার নিয়ে মাঠ ছাড়লো বাংলাদেশ। দেশের জেগে ওঠা ফুটবল যেন হঠাৎ করেই মুখ থুবরে পড়ে গেল। আবারও বলি খেলায় হার জিৎ পাশাপাশি হেটে চলে। কিন্তু ভালো খেলে হারার মধ্যে একটা আভিজাত্য আছে। সেটাওতো দেখাতে পারল না বাংলাদেশ। বলা যায় একজন খেলোয়াড়ের অযোগ্যতায় বাংলাদেশের ফুটবল আলো ছড়িয়েই হঠাৎ করে যেন সেই আলো ¤øান হয়ে গেল। খেলোয়াড়টি হলেন গোলকিপার। মূলত তার ভুলেই সাফÑএ বাংলাদেশ ফুটবল দলের হঠাৎ এই অধঃপতন। নেপালী খেলোয়াড়ের প্রায় নিস্তেজ একটি ফ্রি কিক তিনি ঠেকাতে পারেননি। এধরনের ফ্রি কিক সামলানোর জন্য বোধকরি বছরের পর বছর ধরে ফুটবল প্রশিক্ষণ নিতে হয় না। সাধারণ মানের ফুটবলারের পক্ষেও এই ধরনের নিস্তেজ ফ্রি কিক সামলানো সম্ভব। অথচ বাংলাদেশ ফুটবল দলের গোল রক্ষক সেটাই সামলাতে পারলেন না। বাংলাদেশের গোলপোস্টে সহজেই ঢুকে গেল নেপালের পাঠানো বল। হতাশায় নিমজ্জিত হল স্টেডিয়ামের অসংখ্য দর্শক সহ গোটা বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমী মানুষ। কারণ বাংলাদেশ ও নেপালের ওই খেলা দেখার জন্য দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের ড্রয়িং রুম, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, চায়ের দোকান সহ প্রায় সব খানেই টিভির সামনে উপস্থিত ছিল ফুটবল প্রেমি মানুষ। কিন্তু হঠাৎই হল ছন্দ পতন। বাংলাদেশ দলের গোলকিপারের ভুলে একটা সহজ সমীকরণ বেশ কঠিন হয়ে গেল। যেখানে বাংলাদেশ ড্র করলেই গ্রæপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনালে যাবার কথা। সেখানে শুধুমাত্র গোলকিপারের ভুলে আশার গুড়ে বালি পরলো। আবারও হতাশ হলো দেশের ফুটবল প্রেমি কোটি কোটি মানুষ।
বিভিন্ন পত্রিকায় বাংলাদেশ বনাম নেপালের মধ্যকার এই খেলার রিপোর্ট পড়লেই বোঝা যায় একজন খেলোয়াড়ের ভুলেও বড় স্বপ্ন ধুলিস্যাত হয়। প্রথম আলো ‘হাস্যকর ভুলে স্বপ্নভঙ্গের কান্না’ শিরোনামে লিখেছে ‘কত স্বপ্ন কত আশা। এই বুঝি আবার ফুটবল জেগে উঠল। এশিয়ান গেমস এর সাফল্যটা টাটকা থাকতে থাকতেই এবার বুঝি সাফ এর সেমিফাইনালটাও খেলা হয়ে যাবে। সব স্বপ্নের গালে নিষ্ঠুর চাপেটাঘাত বাংলাদেশ দলের গোল রক্ষক শহীদুল আলম সোহেলের হাস্যকর এক ভুলে। যে ম্যাচ ড্র করতেই হতো, তাতে প্রথমার্ধে ফ্রি কিক ঠেকাতে গিয়ে তাঁর পিচ্ছিল হাত, আর শেষ মুহূর্তের পাল্টা আক্রমণের গোলে নেপালের কাছে ২-০ গোলে হেরে গেল বাংলাদেশ। প্রথম দুই ম্যাচ জিতেও ওঠা হলো না ২০০৯ সালের পর সাফ এর আরেকটি সেমিতে।
‘একই ভুলে বাংলাদেশের বিদায়’ শীর্ষক রিপোর্টে কালের কণ্ঠ লিখেছে, স্বপ্ন ছড়ানো দুই ম্যাচ শেষে আবার বেজে উঠলো সেই বিদায়ের রাগিনী। শহীদুলের গোল উপহারে টানা চতুর্থবারের মতো সাফ সেমিফাইনালের চৌকাঠ থেকে বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। যে ম্যাচে বাংলাদেশের মাত্র ১ পয়েন্ট দরকার ছিল সেই ম্যাচেই বাংলাদেশের ওই গোলরক্ষকের হাস্যকর ভুল। ‘হেরে বাংলাদেশের বিদায়’ শীর্ষক রিপোর্টে মানবজমিন লিখেছে, ‘একি করলেন সোহেল। সরাসরি হাতে আসা বলকে গ্রিপে না নিয়ে নিজেদের জালে জড়িয়ে দিলেন? ম্যাচের শেষ মিনিটে তার ভুলেরই আরো এক গোল হজম করে স্বাগতিকরা।’
একথা সত্য, খেলায় কোনো পক্ষই হারার জন্য খেলে না। জেতার জন্যই খেলে। একজন হারে অন্যজন জিতে। কিন্তু সেই হার যদি কারও ভুলের কারণে হয় তাহলেই প্রশ্ন ওঠে। আবার একথাও সত্য, পছন্দের কোনো দলকে বার-বার হারতে দেখতে চায় না দর্শক। বিগত সময় গুলোতে বাংলাদেশের ফুটবল অনেকটাই শ্রীহীন চেহারা দেখিয়েছে। সে কারণে দর্শক অনেকটাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সাফ টুর্নামেন্টের শুরুতে বাংলাদেশের সাফল্যে দর্শক আবার নড়ে চড়ে বসে। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম আবার গ্যালারীপুর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যকার ফুটবল প্রতিযোগিতার দিনে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তি বর্গও বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারীতে উপস্থিত ছিলেন। দর্শকের ভীড়ে কানায় কানায় পুর্ণ হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। ঠিক যেন ’৮০-৯০ দশকের ফুটবল পরিবেশ। জেগেছে দেশের ফুটবল। কিন্তু একটি মাত্র ভুল আবার সব কিছু ওলট পালট করে দিল।
বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যকার ফুটবল প্রতিযোগিতা দেখতে সেদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ তরুণী এমনকি গৃহিনীরাও মাঠে হাজির হয়েছিলেন। তাদের কয়েকজনের বক্তব্য ছিল এরকমÑ শায়লা আনোয়ার একজন গৃহিনী। স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে এসেছিলেন। প্রসঙ্গ তুলে শায়লা বললেন, স্টেডিয়ামে এতো মানুষের ভীড় দেখে খুব খুশি লাগছিল। আমার এক বান্ধবীর সাথে বাজি ধরেছিলাম নেপালের সাথে বাংলাদেশ জিতবেই। কিন্তু একজন খেলোয়াড়ের ভুলে বাংলাদেশ হেরে গেল। খেলায় ভুল হতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশ দলের গোলকিপার যে ভুলটা করলেন তা মেনে নেওয়ার মতো না নয়। স্টেডিয়াম থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে এসেছি…
সাদী আনোয়ার নামে একজন কলেজ ছাত্রের বক্তব্যÑ অনেকদিন পর বন্ধুদের সাথে নিয়ে দল বেধে স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখতে এসেছিলাম। পরিবেশ দেখে মনে হয়েছিল, ওয়াও… কিন্তু বাংলাদেশ হেরে যাওয়ায় কষ্ট পেয়েছি। বাংলাদেশের গোলকিপার এই কষ্টের কারণ। এরকম একটা বল ধরতে পারল না। কেন পারল না তা আমার মাথায় আসছে না…
সাফ ফুটবলে এবার বাংলাদেশ যেভাবে বিদায় নিল তা মেনে নেওয়া বেশ কষ্টকর। কিন্তু এটাই বোধকরি নিয়তি? কিন্তু ফুটবল কি আদৌ নিয়তির ওপর নির্ভর করে? আধুনিক ফুটবল কিন্তু তা বলে না। সাফ টুর্নামেন্টের আগে নীলফামারীতে শ্রীলংকা ও বাংলাদেশ ফুটবল দলের মধ্যে এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ওই ম্যাচেও একটি ভুলের কারণে শ্রীলংকার কাছে হেরে ছিল বাংলাদেশ। ঢাকায়ও সেই একই ভুল। আশা করা যায়, সাফ এর ব্যর্থতা নিয়ে এবার চুল চেরা বিশ্লেষণ হবে। হয়তো আবার ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখানো হবে ফুটবলকে। জানিনা বিশ্লেষণ ভাবনায় দর্শকের কথা ভাবা হবে কি না? আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই যারা বলেন আমাদের ফুটবলের দর্শক নাই তারা ভুল বলেন। আমাদের ফুটবলে দর্শক ঠিকই আছে। কিন্তু বোধকরি আমাদের ফুটবল ভাবনার ঠিক ঠিকানা নাই। এনিয়ে জোর বিতর্ক হতে পারে। জয় হোক বাংলাদেশের ফুটবলের।