Home প্রতিবেদন গান বাজানায় জীবন কাটানো এক শিল্পী

গান বাজানায় জীবন কাটানো এক শিল্পী

SHARE
AB-SOLSE

তপন চৌধুরী
মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ঝাঁকড়া চুলের এক যুবক। পিঠে একটা গিটার। সেই গিটারে তাঁর প্রথম বাজানো শুনি চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজের একটি অনুষ্ঠানে। আইয়ুব বাচ্চু তখন স্পাইডার ব্যান্ডে। গিটার বাজিয়ে বি জিস ব্যান্ডের ‘স্টেয়িং অ্যালাইভ’ গানটি গাইছিল। শুনে আমি থমকে গিয়েছিলাম। এই ছেলের কণ্ঠে বিজিসের গান! কীভাবে সম্ভব?
একসময় আমাদের পরিচয় হলো। দেখা হলেই বলত, ‘তপনদা আমি আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই’। আমি তখন সোলস ব্যান্ডে। ১৯৭৮ সালের দিকে সোলসের প্রতিষ্ঠাতা গিটারিস্ট চলে যায়। আমরা আলোচনা শুরু করি, গিটারিস্ট হিসেবে কাকে নেওয়া যায়। রনি বড়–য়া, নকিব খান, পিলু, শাহেদ, লুলু সবাই মিলে আমরা সিদ্ধান্ত নেই, আইয়ুব বাচ্চুকে নেওয়া হোক। কেননা সে ভালো গান করে, গিটার বাজায় আর হারমোনাইজও করে। তখন তো সে ‘আইয়ুব বাচ্চু’ নয়, একজন তরুণ মিউজিশিয়ান। শুরুতে স্পাইডার ও পরে ফিলিংস ব্যান্ডে বাজাত। সে যোগ দিল আমাদের সঙ্গে সোলসে। আমরা একসঙ্গে গান শুরু করলাম।
শুরুতে আইয়ুব বাচ্চু সোলসে কেবলই গিটার বাজাত। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক কষ্ট করে ১৯৮১ সালে আমরা অ্যালবাম বের করলাম সুপার সোলস। প্রথম সেই অ্যালবাম কেমন সাড়া পেয়েছিল সেটা সবাই জানেন। সোলসের সেই সময়কার সব কাজগুলোতে তার অনেক অবদান ছিল। তখন আমরা আলাদা করে সবার নাম দিতাম না। কে কণ্ঠশিল্পী, কে গীতিকার, কে সুরকার, সংগীত পরিচালক এসব আলাদা করে দেওয়া হতো না। টানা ১০ বছর সে ছিল আমাদের সঙ্গে।
একসময় নকিব খান সিএ পড়তে ঢাকায় চলে আসে। তার ভাই চাইছিলেন না যে সে গান করুক। তার ভাই পিলু ছিলেন আমাদের সঙ্গে। আমরা একত্রে অনেক গান করলাম। ‘কলেজের করিডরে’, ‘প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্ত’, ‘ফরেস্ট হিল’-এর মতো অনেক গান। সারা বাংলাদেশে আমরা তখন পরিচিতি। ১৯৯০ সালে সোলস থেকে বের হয়ে নতুন ব্যান্ড এলআরবি করল আইয়ুব বাচ্চু। শুরুতে এটা ছিল লাভ রানস বøাইন্ড, পরে সেটা হলো লিটল রিভার ব্যান্ড। নিজের দলে গান নিয়ে নিজের চিন্তা ভাবনা গুলো বাস্তবায়ন করতে শুরু করল সে। আমি মনে করি, সেটাই ছিল তার সঠিক সিদ্ধান্ত।
১৯৮৪ বা ৮৫ সালে আমার প্রথম একক গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। নাম ছিল তপন চৌধুরী। সেখানে ‘অনাবিল আশ্বাসে’, ‘আলো ভেবে যারে আমি’, ‘মনে করো তুমি আমি’, ‘আমার গল্প শুনে’র মতো জনপ্রিয় সব গান ছিল। অনেকে বিশ্বাস করতে পারে না যে, এগুলো আইয়ুব বাচ্চুর সুর। দ্বিতীয় অ্যালবামটি সে করেনি, তৃতীয়টিতে আবার কাজ করে সে। ‘পাথর কালো রাত’, ‘ডায়েরির পাতা গুলো’ ‘কথা কওনা দেখা দাও না’ গানগুলো করেছিল সে।
মানুষ হিসেবে খুব সহজ সরল ছিল বাচ্চু। মানুষকে ভীষণ সম্মান করত। লাইভ শো বা যেকোনো জায়গায় যার সম্পর্কে যা সত্য, সেটা অবলীলায় বলে দিত। আমার সম্পর্কে কখনো কখনো এমন সব কথা বলত, আমি লজ্জা পেয়ে যেতাম। আমি তার জন্য তেমন কিছুই করিনি। কিন্তু সে সব সময় বলত, ‘আমাকে সংগীতে নিয়ে এসেছেন তপনদা। আজ আমি মিউজিশিয়ান হয়েছি, এর পেছনে অবদান তপনদার।’ আমি জানি না, আমি কী করেছি। তবে এই কথাগুলোয় আমি গর্ববোধ করি। চার বছর আগে কলকাতায় গিয়েছিলাম। সেখানকার তরুণ কয়েকজন শিল্পী আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন আমি আইয়ুব বাচ্চুকে চিনি কি না। তার সঙ্গে পরিচয় আছে কি না? তাঁদের বলতে পারিনি যে, আইয়ুব বাচ্চু আমার কেমন চেনা। বলতে পারিনি যে, একসময় আইয়ুব বাচ্চু বলত, তপনদা, আমি আপনার সঙ্গে মিউজিক করতে চাই। ওই মানুষ গুলোকে এখন আমি বলতে চাই, আমি আইয়ুব বাচ্চুকে চিনি। এ জন্য আমি গর্বিত। মানুষের কর্ম মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়, তার প্রমাণ আইয়ুব বাচ্চু। কর্মই সব। কর্মগুণে শিষ্য তার ওস্তাদকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আইয়ুব বাচ্চু অনেক অনেক ওপরে চলে গেছে। সে বাংলাদেশের প্রথম রকস্টার। অন্যদের হয়তো ব্যান্ডতারকা বলতে পারি। কিন্তু রকস্টার বলতে যা বোঝায় সেটা কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু। মঞ্চে গিটার বাজিয়ে লাখ লাখ মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত সে। আমাদের প্রজন্ম বা তার আগের প্রজন্ম কখনোই ভাবেনি যে গান করে জীবিকা নির্বাহ করা যায়। বাচ্চু, আমি, কুমার বিশ্বজিৎ সেটা করে দেখিয়েছি। এই সাহসটা ধেখাতে অথই সাগরে ঝাঁপ দিয়েছিলাম আমরা। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। আমাদের নিজস্ব গান হয়েছে, নিজস্ব পরিচয় হয়েছে। এখন লোকে বলে ওটা বাচ্চুর গান, ওটা তপন চৌধুরীর গান, ওটা কুমার বিশ্বজিতের গান। আগে ফিল্মের গান ও মান্না দে বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানই বেশি শুনত মানুষ। সেই অবস্থা ভেঙে আমরা ‘আমাদের’ গানকে প্রতিষ্ঠিত করেছি, শ্রোতা তৈরি করেছি। আমরা ছাড়া এ দলে আরও অনেকেই আছেন। সেই নামগুলো মানুষ মনে রাখবে।
আমার সংগীত জীবনের ৪০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে সম্মাননা গ্রহণ করতে এসেছিল আইয়ুব বাচ্চু। সেদিন বারবার তাগাদা দিচ্ছিল, ‘তপনদা চলেন, মঞ্চে চলেন।’ বাজানোর জন্য সব সময় উদ্গ্রীব থাকত সে। একবার ফোক ফেস্টে অর্ণবের (আমার ভাতিজা) সঙ্গে গান করে মঞ্চ থেকে নামছিলাম। নামতে না নামতে বাচ্চু এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘তপনদা, অর্ণবের সঙ্গে আপনাকে দেখে আমার কলিজা ভেঙে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল স্টেজে উঠে যাই।’ গান বাজনার জন্য এমন পাগল ছেলে আমি কখনো দেখিনি। শুধু গান বাজনা করে যে টিকে থাকা যায়, ভালোভাবে জীবন কাটানো যায়, তার জ্বলন্ত প্রমাণ আইয়ুব বাচ্চু। এ রকম মিউজিশিয়ান গিটারিস্ট সহজে আসে না।