Home প্রতিবেদন অফ দ্য রেকর্ড আর্জেন্টিনার মার্সেলোর সাথে এক বিষাদ সন্ধ্যার গল্প!

আর্জেন্টিনার মার্সেলোর সাথে এক বিষাদ সন্ধ্যার গল্প!

SHARE
Nigra

তানভীর তারেক: নিউইয়র্ক টু বাফালো। রেলপথে যাচ্ছি। সু-প্রশস্ত সীট। শুয়ে বসে সময় কাটানো যায়। নায়াগ্রা ফলস দেখতে যাবো। নিউইয়র্কের গ্রান্ড রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঠিক সময়েই ট্রেন ছেড়ে গেলো। আমি বাইরের দৃশ্য দেখে প্রতিনিয়ত অভুতপূর্ব দৃশ্য গুনছি আর গিলছি। এই এক অদ্ভুত ডিলেমা। পরিচিত প্রকৃতিই আপনি ট্রেন থেকে দেখবেন অদ্ভুত অন্যরকম লাগে। নানাবাড়ি ঈশ্বরদী টু খুলনা যাবার পথে রুপসা এক্সপ্রেস ট্রেনেও দেখেছি একই রকম মুগ্ধতা।

দীর্ঘ প্রায় ৮ ঘন্টার জার্নি। তাই খানিক চোখের দৃশ্য গোনার ক্লান্তি দূর করেই ক্যান্টিনে গেলাম। কেন্টিনটাও প্রশস্ত। চার সীটের টেবিল করে আলাদা একটি বড় সড়ো হোটেল রুম। এক বয়স্ক ভদ্রলোকের উল্টোপিঠে বসে পড়লাম। আমার সাথে সুমন নামের যে সহযাত্রী এসেছে। সে তার সীটে বসে সজোড়ে নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। আমিও তার সজোর নাক ডাকার শব্দ শুনে তাকে না চিনতে পারার একটা ভান নিয়ে ক্যান্টিনে ঢুকেছি। যেন নয়তো এমন অশ্লীলভাবে কেউ ট্রেনে উঠেই নাক ডেকে ঘুমুতে পারে? যদিও কামরায় খুব বেশি প্যাসেঞ্জার নেই।

যে বুড়ো ভদ্রলোকের সামনে বসেছি, তিনি বার্গার আর বিয়ার খাচ্ছেন। ইয়া বড় পেটটাকে নিয়ে কিভাবে টেবিল সামলে তিনি চেয়ারে ঢুকে নিজেকে সামলালেন আমি তাই ভাবছিলাম কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে। একটু হাসি বিনিময় করার চেষ্টা। তার পুরো নামটি এখন মনে আসছে না। তবে প্রথম অংশের নাম ‘মার্সেলো’। আমি ভেবেই বসেছিলাম যে মার্সেলো বাফেলো বা নিউইয়র্ক শহরের স্থানীয় কোনো বাসিন্দা হবেন। কিন্তু তার ভাঙা ইংরেজী শুণে আমিও ইতস্তত হয়ে জানতে চাইলাম নিবাস কোথায় ? বললেন আর্জেন্টিনা। আমি তার ভাঙা ইংরেজী শুনে দারুন পুলকিত। কারন একেবারে বাঙালি হিসেবে আমার ইংরেজীটাও খুবই দূর্বল। এ নিয়ে কোনো দুঃখ বা উন্নয়নের প্রচেষ্টাও আমার ভেতরে নেই। আমি মার্সেলোর সাথে কিছুটা খোশগল্প করার চেষ্টা করলাম।

ম্যারাডোনার গল্পেই বেশি চললো। বলে উঠলো মেসিকে আমরা চিনি কি না। নেক্সট বিশ্বকাপ (পড়–ন ২০১৮’র বিশ্বকাপ) মেসীরই হবে, ইত্যাদি নানান গল্প করতে লাগলেন। আমি নিজে ব্রাজিল সমর্থক হলেও খোশগল্পের খাতিরে চুপ হয়ে গেলাম। কারন তার কথাবার্তায় খানিক ব্রাজিলের রাজনৈতিক অবক্ষয়, দেশটির দূর্নীতি ইত্যাদিই গুরুত্ব পাচ্ছিলো। আমি কফির পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছি আর মাথা নাড়াচ্ছি। হায় বিধাতা! এখানেও একজন শক্ত প্রতিপক্ষ তুমি জুড়িয়ে দিলে। ট্রেনটি বিরতিহীন ভাবে চলছে। মার্সেলো আর আমার ভেতরে একটা অন্তত মিল রয়েছে। মার্সেলো এই পৃথিবীর অনেক দারুণ দারুণ সব জায়গা দেখলেও নায়গ্রা জলপ্রপাত সে দেখেনি। প্রথমবারের মতো দেখতে যাচ্ছে। সে নেশাতুর পর্যটক। ফুটবল তার প্রিয় খেলা। রাশিয়া বিশ্বকাপের পুরোটা সময় সে ওখানে অধিকাংশ ম্যাচ দেখার জন্য থেকে যাবে। জীবনটা তার কাছে আনন্দ আহরণের। মোটেই বৈষয়িক নয় নন। তিনি নায়াগ্রা ফলস এলাকায় ৩  থেকে ল্যান্ড বর্ডার পেরিয়েই কানাডা যাবেন। আমি একদিনের ট্রিপে এসে আবার ফিরবো নিউইয়র্কে। সন্ধ্যায় তিনি ডিনারের অফার করলেন। রেস্টুরেন্টের নাম বললেন। আমরা অফ সীজনে গিয়েছি বলে পুরো নায়গ্রা পাড়ের শহরতলীকে একেবারেই শুনসান দেখাচ্ছিলো।

রাতের খাবারে বেশ আয়োজন করে অর্ডার দিলেন। অর্ডার দেখেই বুঝলাম, কেন তার শরীরের এই জাহাজী সাইজ। খেতে খেতে এক দূর্লভ ছবি দেখালেন। কিশোর বেলার মেসির সাথে মার্সেলো। অমি অবাক। আমার দেশের ফুটবল প্রসঙ্গে আমি কিছু বলতে পারলাম না। অনেক চেষ্টা করলাম ক্রিকেটে আমাদের অল রাউন্ডার সাকিব আল হাসানের কথা জানাতে। গুগল থেকে দেখালাম আমাদের ক্রিকেট র‌্যাংকিং। সাকিব আল হাসানের ক্যারিয়ার। ক্রিকেটে একেবারেই সে অনাগ্রহ দেখালো। সারাদিনের জার্নিতে যতরকম কথা হলো শেষ বেলার নৈশভোজে যেন হেরে গেলাম। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ইভেন্টের আসরে আমার দেশ কবে খেলবে সেদিনের নায়গ্রা জলপ্রপাতের মতো আমার অদেখা কষ্ট ঝরলো। আমাদের অনেক ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। অনেক গর্বের জায়গা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই কেন জানি এক ব্যর্থ বেদনার হাহাকারের জন্ম হয়। বিশ্বকাপের এই মৌসুমে তাই নায়গ্রার পার্শ¦বর্তী রেস্তোরার বসে থাকা বিষাদের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে আমার মার্সেলো কে। আমি সেই আর্জেন্টিনার গর্বিত নাগরিকের পাশে বসে দু লাইন ফুটবল নিয়ে দেশের কথা কথা বলতে পারিনি বলে।

লেখক: উপস্থাপক, সঙ্গীত পরিচালক ও সংবাদকর্মী