Home এক্সক্লুসিভ আইয়ুব বাচ্চু এবং এলআরবি

আইয়ুব বাচ্চু এবং এলআরবি

SHARE

মোহাম্মদ তারেক
শিল্পীর ভালো থাকার কথা নয় যদি মন বিষন্ন হয়। সত্যিই ভালো থাকার কথা নয় যদি সারাক্ষণ হৃদয় জুড়ে রক্ত ক্ষরণ হয়। ভালো থাকার কথা নয় যদি শিল্পী হতে চাওয়াটা কষ্টের হয়। ভালো থাকার কথা নয় শিল্পী হয়ে বেঁচে থাঁকাটা যদি সম্মানের না হয়। আসলেই পৃথিবীতে শিল্পীরা ঝাঁকে ঝাঁকে জন্মায় না। বারবার আসে না, যারাই আসে, মানুষকে ভালোবাসে, নিজেকে উজাড় করে। সবশেষে যে কটা দিন বেঁচে থাকার বেঁচে থেকে, হঠাৎ করে চলে যায় অভিমান বুকে বেঁধে। মৃত্যুর দুদিন আগে ফেসবুকের নিজের ওয়ালে এ কথা গুলো লিখেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।
‘হাসতে দেখ, গাইতে দেখ’। তিনি আর কখনো হাসবেন না, গিটার হাতে নিয়ে গাইবেনও না। রুপালি গিটার ফেলে চলে গেছেন দূরে বহু দূরে…। হ্যাঁ কোটি কোটি ভক্ত- শ্রোতাকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলা ব্যান্ডের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ও গিটারের জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু। সুরের জাদুতে হাজারো মানুষকে আত্মীয়তার বাঁধনে বেঁধেছিলেন এই গুণী মানুষটি। বাংলা ব্যান্ডের স্বর্ণালি অধ্যায়ের নাম আইয়ুব বাচ্চু। তিনি ছিলেন এলআরবির ২৭ বছরের কান্ডারী। বাংলা ব্যান্ড যদি জাহাজ হয় তাহলে সেই ব্যান্ডের যোগ্য ক্যাপ্টেন ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। প্রায় তিন যুগের সঙ্গীত জীবনে আইয়ুব বাচ্চু গানের পাশাপাশি তাঁর গিটারের জাদুতে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। মঞ্চে তার গিটারের মূর্ছনায় উদ্দীপ্ত হননি, এমন গান পাগল মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। দেশের র্শীষস্থানীয় ব্যান্ড এলআরবির দলনেতা আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একাধারে গায়ক, গিটার বাদক, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক। খ্যাতিমান এই শিল্পী তার শ্রোতা-ভক্তদের কাছে এবি নামেও পরিচিত। তিনি মূলত রক ঘরানার কণ্ঠের অধিকারী হলেও আধুনিক গান, ক্লাসিক্যাল এবং লোকগীতি দিয়েও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন।
আইয়ুব বাচ্চুর ডাক নাম রবিন। তিনি ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট জন্ম গ্রহণ করেন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরা ইউনিয়নে। সেখানেই কেটেছে তাঁর কৈশোর আর তারুণ্যের দিন গুলো। পরিবারের তেমন কেউ গানের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি ছিল তাঁর প্রচন্ড ঝোঁক। আধুনিক, লোকগীতি, ক্লাসিক্যালের পাশাপাশি শুনতেন প্রচুর ওয়েস্টার্ন গান। গান শুনতে শুনতে নিজেও একসময় গাইতে চেষ্টা করেন। অনেকটা নিজের চেষ্টাতেই গায়ক হয়ে ওঠা তাঁর। স্কুলে পড়াকালীন চট্টগ্রামের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। আর তখন থেকেই ওয়েস্টার্ণ মিউজিক ভালো লাগতে শুরু করে। সঙ্গীতের প্রেমে পড়ে হাতে তুলে নেন গিটার। শুরু করেন গিটার চর্চা। জিমি হেন্ডরিক্স, জো স্যাটরিনি, স্টিভ মুরের মতো শিল্পীদের কাছ থেকে পেয়েছেন অনুপ্রেরণা। কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের নিয়ে আইয়ুব বাচ্চু গড়ে তোলেন একটি ব্যান্ডদল। শুরুতে ‘গোন্ডেন বয়েজ’ নাম দিলেও পরে বদলে রাখা হয় ‘আগলি বয়েজ’। এই দল নিয়ে পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে চলত তাদের গানের পরিবেশনা। পেশাদার ব্যান্ডশিল্পী হিসেবে আইয়ুব বাচ্চুর ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। যোগ দেন ব্যান্ডদল ‘ফিলিংস’-এ। এই ব্যান্ড দলের সঙ্গে সে সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন হোটেলে পারফর্ম করতেন তিনি। ১৯৮০ সালে আইয়ুব বাচ্চু যোগ দেন জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘সোলস’-এ। টানা ১০ বছর সোলস ব্যান্ডে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
দেশ বরেণ্য ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর নেতৃত্বে ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক ভাবে নতুন ব্যান্ড হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল এলআরবি। সে সময় তার সঙ্গী ছিলেন জয়, স্বপন আর এস আই টুটুল। শুরুতে এলআরবির পুরো নামটি ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’। পরে তা বদলে নাম হয় ‘লাভ রানস বøাইন্ড’। এলআরবির প্রথম কনসার্ট হয়েছিল ঢাকার একটি ক্লাবে। সেখানে ইংরেজি গানই পরিবেশন করেছিলেন তারা। কিছুদিন পর ঢাকার শিশু একাডেমিতে এক কনসার্টে প্রথমবারের মতো ক্লাব বা হোটেলের বাইরে দর্শকদের সামনে আসে এলআরবি।
শুরুর দিকে এলআরবির লাইন আপে ছিলেন ব্যান্ডটির দলনেতা, ভোকাল ও গিটারিস্ট আইয়ুব বাচ্চু, বেইজে স্বপন, ড্রামসে জয় ও কি-বোর্ডে এস আই টুটুল। এক সময় জয়ের স্থলা ভিষিও হন মিল্টন। দুই বছর পর মিল্টন পাড়ি জমান লন্ডনে। তার জায়গায় আসেন রিয়াদ। ২০০২ সালে এস আই টুটুল ব্যান্ড থেকে বেরিয়ে গেলে স্থায়ী কোনো কি-বোর্ডিস্ট ছাড়াই গান চালিয়ে যায় ব্যান্ডটি। সে বছরই এলআরবিতে গিটারিস্ট হিসেবে বাজাতে শুরু করেন মাসুদ। মাঝে অতিথি হিসেবে অনেকে বাজিয়েছেন। রিয়াদ অসুস্থ হলে তার স্থলে বাজিয়েছেন সুমন। সুস্থ হয়ে ফিরলেও কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান রিয়াদ। তার জায়গায় ২০০৬ সালে ড্রামসের হাল ধরেন রোমেল। ১৬ বছর ধরে এলাইন আপ নিয়ে চলছে এলআরবি। মাঝে মধ্যে ব্যান্ডটির সঙ্গে অতিথি হিসেবে পারফর্ম করতে দেখা গেছে আইয়ুব বাচ্চুর ছেলে আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুবকে।
১৯৯২ সালে ব্যান্ডের নামেই বাজারে আসে এলআরবি জোড়া অ্যালবাম এলআরবি-১ ও ২। এটাই দেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম। শুরুতেই এলআরবি চমক সৃষ্টি করে ডাবল ডেব্যু অ্যালবাম বের করার মধ্য দিয়ে। এই অ্যালবামের ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি, ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘হকার’ গান গুলো জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরে ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যান্ড অ্যালবাম ‘সুখ’ ও ‘তবুও’ বের হয়। এলআরবির অন্য অ্যালবাম গুলো হলোÑ ‘ঘুমন্ত শহরে’ (১৯৯৫), ‘ফেরারীমন’ (১৯৯৬), ‘স্বপ্ন’ (১৯৯৬), ‘আমাদের বিস্ময়’ (১৯৯৮), ‘মন চাইলে মন পাবে’ (২০০০), ‘অচেনা জীবন’ (২০০৩), ‘মনে আছে নাকি নেই’ (২০০৫), ‘স্পর্শ’ (২০০৮), ‘যুদ্ধ’ (২০১২)।
২৭ বছরে মোট ১৪টি একক অ্যালবাম প্রকাশ করেছে দেশের অন্যতম নন্দিত ব্যান্ড দল এলআরবি। তাদের সর্বশেষ একক অ্যালবাম ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’ প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। এই দীর্ঘ সময় ধরে এলআরবি বেশ কিছু জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছে শ্রোতাদের। তার কণ্ঠে উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে সেই তুমি, রুপালি গিটার, ফেরারী মন, এখন অনেক রাত, তাঁরা ভরা রাতে, ঘুম ভাঙা শহরে, হকার, মাধবী, কষ্ট পেতে ভালোবাসি, হাসতে দেখ গাইতে দেখ, কেউ সুখী নয়, উড়াল দেব আকাশে, শুনতে কি পাও, ভুলে যাও. আমি প্রেমে পড়িনি, মন চাইলে মন পাবে, চোখের জলের কোনো রঙ হয় না, মেয়ে, এক আকাশের তারা, তিন পুরুষ, তাজমহল, মন ভালো নাইরে, বেলা শেষে ফিরে এসে, ও দুনিয়ার মানুষও ভাই, একচালা টিনের ঘর. ভুলে যাও. অভিমান নিয়ে, সাবিত্রীরায়, ১২ মাস, নীলাঞ্জনা, দরজার ওপাশে, নীল মলাট, অপরিচিতা, ভাঙা মন নিয়ে তুমি, বাংলাদেশ এই গান গুলো এখনও শ্রোতাদের অনেক প্রিয়। দীর্ঘ এলআরবি’র ২৭ বছরের ভাঙা গড়ার খেলায় কান্ডারীর ভ‚মিকা পালন করেছেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও লিড ভোকাল ও গিটারিস্ট আইয়ুব বাচ্চু। একক ক্যারিয়ারে সফলও তিনি। অনেক জনপ্রিয় গান রয়েছে তাঁর একক কণ্ঠে। ১৯৮৬ সালে বাজারে আসে আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্ত গোলাপ’। তখনও তিনি সোলস ব্যান্ডে। প্রথম অ্যালবাম খুব একটা সাড়া না পেলেও ১৯৮৮ সালে ‘ময়না’ অ্যালবামে গায়ক হিসেবে আইয়ুব বাচ্চু ব্যাপক পরিচিতি রাভ করেন। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’। এই অ্যালবামের প্রায় সব গানই বেশ জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে কষ্ট কাকে বলে, কষ্ট পেতে ভালোবাসি, অবাক হৃদয়, আমিও মানুষ গান গুলো খুবই শ্রোতা প্রিয়। পরের বছর গুলোতে সময়, একা, প্রেম তুমি কি, দুটি মন, কাফেলা, প্রেম প্রেমের মতো, পথের গান, ভাটির টানে, মাটির গানে, জীবন, সাউন্ড অব সাইলেন্স (ইন্সট্রুমেন্টাল), রিমঝিম বৃষ্টি, বলিনি কখনো’র মতো একক অ্যালবাম নিয়ে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছেন আইয়ুব বাচ্চু।

একনজরে

রুপালি গিটার ফেলে বহুদূরে চলে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু। বাংলা ব্যান্ডের এই কিংবদন্তি তাঁর গানে গানে বলেছিলেন, ‘সেদিন চোখের অশ্রæ তুমি রেখো গোপন করে’। কিন্তু অশ্রæ গোপন রাখা সহজ নয়। দীর্ঘদিনের সংগীতজীবনে তাঁর বন্ধুর সংখ্যা ছিল অগুনতি। সেই বন্ধুদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শিকড় বিস্তৃত ছিল অনেক গভীরে। গতকাল বৃহস্পতিবার আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে প্রথম আলোর কাছে নিজেদের অনুভ‚তির কথা জানালেন শিল্পীর কয়েকজন কাছের মানুষ।

জন্ম: ১৬ আগস্ট ১৯৬২, চট্টগ্রাম
মৃত্যু: ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ঢাকা
সংগীতজীবন শুরু: ১৯৭৭
প্রথম গান: হারানো বিকেলের গল্প
ব্যান্ড: প্রথম ব্যান্ড ফিলিংস (১৯৭৮)। এরপর যোগ দেন সোলস-এ। ১৯৮০ থেকে পরবর্তী এক দশক এই ব্যান্ডে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯১ সালে নিজে গঠন করেন নতুন ব্যান্ড এলআরবি। প্রথমে এলআরবির পূর্ণ অর্থ ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড। পরে এই নাম বদলে করা হয় লাভ রানস বøাইন্ড।
প্রথম একক অ্যালবাম: রক্তগোলাপ (১৯৮৬)
এলআরবির প্রথম অ্যালবাম: এলআরবি (১৯৯২)

ব্যান্ড অ্যালবাম
এলআরবি (১৯৯২), সুখ (১৯৯৩), তবুও (১৯৯৪), ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫), ফেরারী মন (১৯৯৬), স্বপ্ন (১৯৯৬), আমাদের বিস্ময় (১৯৯৮), মন চাইলে মন পাবে (২০০০), অচেনা জীবন (২০০৩), মনে আছে নাকি নেই (২০০৫), স্পর্শ (২০০৮), যুদ্ধ (২০১২)

একক অ্যালবাম
রক্তগোলাপ (১৯৮৬), ময়না (১৯৮৮), কষ্ট (১৯৯৫), সময় (১৯৯৮), একা (১৯৯৯), প্রেম তুমি কি! (২০০২), দুটি মন (২০০২), কাফেলা (২০০২), প্রেম প্রেমের মতো (২০০৩), পথের গান (২০০৪), ভাটির টানে মাটির গানে (২০০৬), জীবন (২০০৬), সাউন্ড অব সাইলেন্স (ইন্সট্রুমেন্টাল, ২০০৭), রিমঝিম বৃষ্টি (২০০৮), বলিনি কখনো (২০০৯), জীবনের গল্প (২০১৫)

কিছু জনপ্রিয় গান
চলো বদলে যাই, রুপালি গিটার, হাসতে দেখ, ঘুমভাঙা শহরে, দরজার ওপাশে, ফেরারি এ মনটা আমার, মেয়ে, কষ্ট পেতে ভালোবাসি, কেউ সুখী নয়, বেলা শেষে ফিরে এসে, এক আকাশের তারা, তারাভরা রাতে, উড়াল দেব আকাশে, একচালা টিনের ঘর, মন চাইলে মন পাবে, আমি তো প্রেমে পড়িনি, তিন পুরুষ, তাজমহল, বারো মাস, এই রুপালি রাত ইত্যাদি।
এ ছাড়া অনেক মিশ্র অ্যালবামে তিনি কাজ করেছেন। এর মধ্যে প্রিন্স মাহমুদের সুরে করা মিশ্র অ্যালবাম গুলোতে তাঁর গান আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর সেরা গানগুলো নিয়ে একটি অ্যালবাম বের করা হয়। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রেও গেয়েছেন। যেখানে তাঁর ‘আম্মাজান’ গানটিকে বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় গানগুলোর একটি ধরা হয়।

২০১৫ সালে বাজারে আসে তাঁর একক অ্যালবাম ‘জীবনের গল্প’। অনেক জনপ্রিয় গান রয়েছে তাঁর একক কণ্ঠে। তবে কখনো একক ক্যারিয়ারকে ব্যান্ডের চেয়ে বড় করে দেখেননি এ গুণী শিল্পী। এ কারণেই তাঁর নেতৃত্বে চলা এলআরবি ব্যান্ডটি এ প্রজন্মের ব্যান্ডগুলোর জন্য আদর্শও বটে। ব্যান্ড সঙ্গীতের কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু শুধু ব্যান্ড জগতেই দাঁপিয়ে বেড়াননি। ঢাকাই চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবেও তুলেছিলেন ব্যাপক আলোড়ন। বাংলা চলচ্চিত্রের গতানুগতিক ধারার গানগুলোর মধ্যে তিনি এনে দিয়েছিলেন তারুণ্যের ছোঁয়া। সিনেমার গান তাঁর গিটারের ঝলকে দেখেছে এক নতুন দিগন্ত। ব্যান্ড গানের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রকে। লুটতারাজ ছবির ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ তাঁর বাংলা ছবির অন্যতম একটি জনপ্রিয় গান। এ গান দিয়েই প্রথম চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেন আইয়ুব বাচ্চু। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ব্যাচেলর ও টেলিভিশন ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন তিনি। ব্যাচেলর ছবিতে আইয়ুব বাচ্চু নিজের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’ গানটি গেয়েছিলেন। টেলিভিশন ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের পাশাপাশি দুটি গানের সুরের কাজও করেন বাচ্চু। প্লেব্যাক সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তাঁর সব গানই পেয়েছে দর্শকপ্রিয়তা। তাঁর গাওয়া ‘আম্মাজান’ গানটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান গুলোর একটি ধরা হয়। এছাড়া চলচ্চিত্রে গাওয়া আইয়ুব বাচ্চুর উল্লেখযোগ্য গান গুলো হলোÑ সাগরিকা ছবির ‘আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে’, ব্যাচেলর ছবির ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার ওপরে পড়েছে, আড়ালে কেউ কল কাঠি নাড়ছে’। লালবাদশা ছবির ‘আরও আগে কেন তুমি এলে না’, তেজী ছবিতে ‘এই জগৎ সংসারে তুমি এমনই একজন’, আম্মাজান ছবির ‘আম্মাজান’, স্বামী আর স্ত্রী, ‘তোমার আমার প্রেম এক জনমের নয়’, মেয়েরা মাস্তান ছবির ‘ঘড়ির কাটা থেমে থাক’, চোরাবালি ছবিতে ‘ভুলে গেছি জুতোটার ফিতেটাও বাঁধতে’ শিরোনামের গান।
AB-1-(34)সঙ্গীতজগৎকে আইয়ুব বাচ্চু যা দিয়ে গেছেন, তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শ্রোতাদের তিনি যেমন দিয়ে গেছেন অনবদ্য সব গান, তেমনি নিজের হাতে তৈরি করে গেছেন অসংখ্য গিটারিস্ট। আইয়ুব বাচ্চুকে বাংলাদেশে ব্যান্ড ও গিটারের জগতে নক্ষত্র বলে অভিহিত করা হয়। বাচ্চু শুধু কণ্ঠ দিয়েই মুগ্ধতা ছড়াননি। সমান্তরালে তিনি বাজিয়ে গেছেন গিটার। আইয়ুব বাচ্চু আর গিটার যেন একে অপরের পরিপুরক। বাচ্চুকে বাদ দিয়ে গিটার, গিটার বাদ দিয়ে বাচ্চুর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, যাবেও না।
যারা আইয়ুব বাচ্চুকে কাছ থেকে দেখেছেন, চিনেছেন তারা জানেন এই গুণী শিল্পীর সবচেয়ে ভালো লাগার জিনিস হলো তার প্রাণের গিটার। গিটারের সুর যেন তাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। সেই আচ্ছন্নতায় আবেগ নিয়ে গিটার বাজাতেন, গিটারের সুরের আবেগ তিনি ছড়িয়ে দিতেন। গিটার নিয়ে মঞ্চে মঞ্চে বাচ্চুর জাদুকরী পরিবেশনা কোনোদিন ভুলবে না এ দেশের মানুষ। নিজেই বলে বেড়াতেন গিটার নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা। গিটার নিয়ে বিখ্যাত গানও রয়েছে তার রুপালি গিটার নামে। এই উপমহাদেশে গিটার বাজানোর জন্য বিখ্যাত একজনই, তিনি আইয়ুব বাচ্চু। গিটারের সঙ্গে করেছেন প্রেম, গিটারের সঙ্গে বেঁধেছিলেন প্রাণ। নামি দামি সব ব্র্যান্ডের গিটার সংগ্রহ করার নেশা ছিল তার। হরেক রকম গিটার তার সংগ্রহেও ছিল এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঊৎহরবইধষষ গটঝওঈ গঅঘ #অঢওঝ-সধফব রহ টঝঅ, ঈঅজঠওঘ #ঔই-সধফব রহ টঝঅ, ঈঅজঠওঘ- সধফব রহ টঝঅ, ঈঐঅজঠঊখ-সধফব রহ টঝঅ # ঊৎহরবইধষষ গটঝওঈ গঅঘ #ঔচ সহ আরও অনেক গিটার।
অত্যন্ত দুঃখের কথা জীবনের শেষ দিকে এসে আক্ষেপে অভিমানে গিটার গুলো বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। গিটার নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা ছিল তার অনেক দিনের। অনেক কষ্ট সত্বেও দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অনেক নামি-দামি ব্র্যান্ডের গিটার সংগ্রহ করতেন। কিন্তু সারাদেশে গিটার শো করার উদ্যোগ নেওয়ার পরও পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায় গিটারই বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন। কারণ হিসেবে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, গিটার গুলো রক্ষণাবেক্ষণ বেশ কষ্টকর। তাই আমি ঠিক করেছি, প্রথম দিকে পাঁচটি গিটার বিক্রি করে দেব তাদের কাছে, যারা গিটার বাজায় কিংবা যারা আমার গিটার গুলো সংরক্ষণে রাখতে চায়। আর এই আয়োজন থাকবে পাঁচ দিন পর্যন্ত। সেই আয়োজন বাস্তবায়নের সুযোগ আর পাননি আইয়ুব বাচ্চু। মনের ভেতরে এই আক্ষেপটুকু নিয়েই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।